ইসলামে কবর জিয়ারতের হুকুম কি?

ইসলামে কবর জিয়ারতের হুকুম কি?

ইসলামে কবর জিয়ারতের হুকুম কি?
কিছু জ্ঞানশূন্য বিকৃত মসি-ষ্কসম্পন্ন ব্যক্তি ইমাম (আঃ) গণের কবর জিয়ারতকারীদের উপর শিরকের ন্যায় মিথ্যে অপবাদ, বদনাম ছুঁড়ে দিতে অত্যন- পটু। কিন' তারা যদি সত্যিকারার্থে জিয়ারতের অন-র্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারত তবে এহেন আচরণের জন্য লজ্জাবোধ করত।
জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো পয়গাম্বর (সাঃ) ও ইমামগনের উপাসনা তো করেনই না বরং এ ধরনের ঘৃণ্য কল্পনাকেও তিনি নিজের মধ্যে স'ান দেন না। একজন মোমিন ব্যক্তি প্রধানত মাসুমগণের কাছে নিজের শাফায়েত পাবার বাসনায় (সুপারিশ) ও তাদের প্রতি যথাযথ বিনীত সম্মান প্রদর্শনের জন্য মাযারসমূহ জিয়ারত করে থাকেন।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিয়ারতনামা পাঠ করার পূর্বে একশতবার আল্লাহ আকবার, আল্লাহর একাত্মতা ঘোষণা এবং অংশীদারিত্বের সমস- সংশয়কে মন থেকে পরিহার করা হয়। আমরা সাধারণত মাসুমগণের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে অতি প্রসিদ্ধ জিয়ারতনামা ‘আমিন আল্লাহ’ পাঠ করার সময় বলি “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাহে সংগ্রাম করেছেন এবং সংগ্রামের যথার্থ হক আদায় করেছেন। আপনি আল্লাহর কিতাবের উপর আমল করেছেন এবং আমরন মহানবী (সাঃ) এর সুন্নাতের অনুস্মরণ করেছেন।” প্রিয় বিবেকবান ভাইয়েরা! আপনারাই বলুন, এর চেয়ে আর তাওহীদের উচ্ছসিত গুণগান কিসে হতে পারে? আমরা জিয়ারতে জামে কাবীরে পাঠ করি যে, “আপনারা আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করেছেন এবং তার দিকেই পথনির্দেশনা দান করেছেন। আপনারা আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখেছেন এবং জনতাকে আল্লাহর রাহে হেদায়েত করেছেন।”
উপরোক্ত জিয়ারতনামায় প্রতিটি স'ানে আল্লাহতায়ালার ও তাওহীদের কথা পুনঃপুন ব্যক্ত হয়েছে। সুতরাং, এটাকে কি শিরক বলব নাকি ঈমান? উক্ত দোয়ায় অন্যত্র বলা হয়েছে যে, “আমি আপনার উসিলায় আল্লাহর বারগাহে শাফায়েত কামনা করছি।
শাফায়েত কামনা করা কি তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক?
ওয়াহাবীদের একটি ভ্রান- ধারণা হচ্ছে, আওলিয়া আল্লাহর উসিলায় আল্লাহ তায়ালার দরবারে শাফায়েত তলব করার অর্থ হচ্ছে দেব-দেবীর কাছে শাফায়েত চাওয়ার ন্যায়। যা তাদের হীনমন্যতার ফসল ছাড়া অন্য কিছু নয়। অথচ পবিত্র কোরআন পাক নেক ওলি আওলিয়াগণ যে আল্লাহর দরগাহে পাপীবান্দাদের শাফায়েতের জন্য আকুতি জানিয়েছেন সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সে সকল বিষয়ের কয়েকটি দৃষ্টান- তুলে ধরছি,
১) হযরত ইউসুফ (আঃ) এর ভ্রাতাগণ হযরত ইউসুফের উচ্চমর্তবা এবং স্বীয় অপরাধ বুঝতে পেরে হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর কাছে তাদের শাফায়েতের অনুরোধ জানায় ইয়াকুব নবী তাদেরকে ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি দেন। “তারা বলল, হে আমাদের পিতা আমরা অপরাধ করেছি আপনি আমাদের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, সত্যিই আমরা বড়ই গুনাহগার। তিনি বললেন, অচিরেই আমি তোমাদের গুনাহ মার্জনার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবো অবশ্যই আমার মালিক ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সুরা ইউসুফ ঃ ৯৭-৯৮)  আল্লাহ  মাফ করুন, কেউ কি দুঃসাহস রাখে যে সে বলবে হযরত ইয়াকুব নবী মুশরিক নবী ছিলেন? নাউযুবিল্লাহ।
২) পবিত্র কোরআন গুনাহগারদের তওবা এবং পয়গাম্বর (সাঃ) এর কাছে শাফায়েত তলব করার প্রতি উৎসাহিত করেছে। বলা হয়েছে যে, “যখনি তারা নিজেদের উপর জুলুম করে তখনি তারা তেমার কাছে ছুটে আসবে এবং নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে আল্লাহ তায়ালার রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইবে-এমতাবস'ায় তারা অবশ্যই আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল ও অতীব দয়ালু হিসেবে দেখতে পাবে।” (সুরা নিসা ঃ ৬৪)
এখন আপনারাই বলুন, পবিত্র কোরআনের এই আয়াত কি লোকদেরকে শিরকের দিকে ধাবিত করছে?
৩) পবিত্র কোরআন মুনাফিকদের ঘৃণিত স্বভাবের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “এদের যখন বলা হয় যে, তোমরা আস ইসলামের পথে তাহলে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন তখন তারা মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং তুমি দেখতে পাবে যে, তারা অহংকারের সাথে তোমাকে এড়িয়ে চলে।” (সুরা মুনাফিকুন ঃ ৫)
এটা কি বলা সম্ভব যে, পবিত্র কোরআন মুনাফিকদের শিরকের প্রতি আহবান জানাচ্ছে ?
৪) আমরা জানি যে,  হযরত লুতের কওম অত্যন- নিকৃষ্ট জাতি হিসেবে স্বীকৃত। তারপরও হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের শাফায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। কিন' যেহেতু এ জাতি অবাধ্যতার চরম সীমানা ছাড়িয়ে পাপাচারে সদা লিপ্ত ছিল তাই আল্লাহ ইবরাহীমকে তাদের থেকে মুখ ফিরানোর নির্দেশ দেন। যেমন আল্লাহপাক বলেন, “অতঃপর যখন ইবরাহীমের ভীতি দূরীভূত হয়ে গেল এবং ইতিমধ্যে তার কাছে সন-ানের ব্যাপারেও সুসংবাদ পৌঁছে গেল তখন সে লুতের সমপ্রদায়ের কাছে আযাব না পাঠানোর ব্যাপারে আমার সাথে যুক্তি-তর্ক করল। ইবরাহীম ছির একজন সহনশীল, কোমল হৃদয় ও আল্লাহর প্রতি নিবেদিত। আমি তাকে বললাম, হে ইবরাহীম এ যুক্তিতর্ক থেকে তুমি বিরত হও এদের ব্যাপারে তোমার মালিকের সিদ্ধান- এসে গেছে। এদের উপর এমন এক ভয়ানক আযাব আসবে যেটাকে রোধ করা সম্ভব হবে না।” (সুরা হুদ ঃ ৭৪-৭৬) আশ্চার্য ব্যাপার হল আল্লাহপাক শাফায়েতের কারণে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর উচ্চ প্রসংশা জ্ঞাপন করেছেন পাশাপাশি তার দৃষ্টি আকর্ষনার্থে বলেছেন, বাঁধ ভেঙ্গে পানি দুরন- গতিতে ছুটেছে তাদের আর শাফায়েতের পথ খোলা নেই।
আল্লাহর আওলিয়াদের শাফায়েত করার বিষয়টি শুধু তাদের বাহ্যিক জীবনের সাথেই সম্পৃক্ত নয় ঃ
বাহানাকারদের চরিত্র হচ্ছে যখন তারা শাফায়েতের স্বপক্ষে কোরানিক সনদ প্রত্যক্ষ করে তখন বলে, এসব আয়াত আম্বিয়াদের জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর তাদের মৃত্যুর পর শাফায়েতের স্বপক্ষে দলিল দেখানোর কোন উপায় নেই। অর্থাৎ, এভাবে তারা একের পর এক অজুহাত খাড়া করার প্রয়াস চালায়। তবে এখানে একটি প্রশ্ন জাগ্রত হওয়াই স্বাভাবিক যে, পয়গাম্বর (সাঃ) এর মৃত্যু হওয়ার মানে কি তিনি নিশ্চি‎হ্ন হয়ে গেছেন? নাকি মৃত্যু পরবর্তী জীবন (কবরের বারযাখী জীবন) তাঁর বেলাতেও বিদ্যমান রয়েছে? (যেভাবে কিছু ওয়াহাবী ওলামা উক্ত বিষয়টি স্বীকার করেছেন)
যদি তিনি (সাঃ) মৃত্যু পরবর্তী জীবনের (বারযাখী জীবন) অধিকারী না হয়ে থাকেন তাহলে বিষয়টি আরো জটিলতার দিকে মোড় নেয় এবং বেশকিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়। যেমন, (ক) পয়গাম্বর (সাঃ) এর মর্তবা কি কোন শহীদের চেয়ে কোন অংশে কম? যেখানে শহীদদের সম্পর্কে কোরআন ইরশাদ করেছে, “বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে রুজি লাভ করে থাকেন।” (সুরা আলে ইমরান ঃ ১৬৯)
(খ) দুনিয়ার সমস- মুসলিম নামাজে তাশাহুদ পাঠ করার সময় পয়গাম্বর (সাঃ) এর উপর দুরুদ পাঠান এবং বলেন, আস্‌সালামু আলাইকা আয়্যুহান নাবিয়ু.............. যদি পয়গাম্বরের অসি-ত্বই না থাকে তাহলে এ ছালাম কাকে লক্ষ্য করে পাঠানো হয়ে থাকে?
(গ) আপনার কি জানা নেই যে, মসজিদে নববীতে পয়গাম্বরের মাযারের নিকটে আসে- ধীরে কথাবার্তা বলা জরুরী। কারণ পবিত্র কোরআন নির্দেশ দিয়েছে যে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের আওয়াজকে নবীর আওয়াজের উপর উচুঁ করোনা।” (সুরা হুজরাত ঃ ২)
(ঘ) মৃত্যু হচ্ছে একটি নবজীবনের সূচনা। যেমন বলা হয়েছে যে, “জনগণ উদাসীনতায় নিমজ্জিত যখন মারা যাবে তখন আবার পূনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে।” ( সুত্রঃ আওয়ালিল লা’আলি, খঃ,৪ পৃঃ,৭৩)
(ঙ) আহলে সুন্নাতের প্রসিদ্ধতম  গ্রনে' আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাসূলুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করে তার জন্যে আমার পক্ষ থেকে শাফায়েত নিশ্চিত।” (সুত্রঃ দার কাতানী তার সুনান গ্রনে'র ২য় খন্ডের ২৭৮ পৃষ্ঠায় উক্ত হাদীসটি লিপিবদ্ধ করেছেন)
উক্ত হাদিস বর্ণনাকারী মহানবী থেকে আরেকটি হাদিস উল্লেখ করেন যে, তিনি বলেন, “ যিনি আমার মৃত্যুর পর আমার মাযার জিয়ারত করেন প্রকৃতপক্ষে তিনি আমার জীবদ্দশায় আমাকে জিয়ারত করেছে।” (সূত্রঃ সাবেকায়ে মুদরাক)
সুতরাং হায়াত ও মাওতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা অলিক কল্পনা মাত্র। উক্ত হাদিসের বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয় যে, কেউ যদি মহানবী ও আয়েম্মাদের কবর জিয়ারত করার অভিপ্রায়ে ভ্রমণ শুরু করেন এতে দোষের কিছূ নেই।
কবরের জিয়ারত ও নারী ঃ
নারীরা অধিকতর সহানুভূতিশীল ও কোমল হৃদয় হওয়ার কারণে নিজ আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারতের প্রয়োজনীয়তা বেশী অনুভব করে থাকেন যার মাধ্যমে তারা ধৈর্য ও সান্তান লাভ করেন এবং বাস্তবতার নিরিখেও এ বিষয়টি প্রমাণিত যে, আউলিয়া কেরামের কবর জিয়ারতের ক্ষেত্রেও তারা বেশী উৎসাহ ও আগ্রহ দেখান। কিন' দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই ওহাবী গোষ্ঠী একটি সন্দেহপূর্ণ হাদিসের কারণে নারীদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করে। এমনকি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ওহাবী জনগণের মুখে মুখে একটি বাক্য খুবই প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ যে, যদি কোন মহিলা কোন কবর জিয়ারতে যায় তখন সমাধিস' ব্যক্তি ঐ মহিলাকে বিবস্ত্র অবস'ায় দেখতে পায়।
জনৈক আলেম বলেন, “আমি ওহাবীদেরকে বললাম যে, নবী করিম (সাঃ) এবং প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফার কবর হযরত আয়েশার ঘরে ছিল এবং তিনি দীর্ঘকাল উক্ত গৃহে বাস করেছেন অথবা অন্ততঃপক্ষে উক্ত কক্ষে তিনি যাতায়াত করতেন।”
যাইহোক, কবর জিয়ারতে নারীদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের স্বপক্ষে দলিল হিসেবে একটি প্রসিদ্ধ হাদিসের কথা তারা উল্লেখ করে থাকেন যে হাদিসটিকে আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) প্রতি সম্বন্ধ দিয়ে থাকেন। তিনি (সাঃ) ইরশাদ করেছেন যে, “লায়ানাল্লাহ জায়েরাতিল কবুর” অর্থাৎ কবর জিয়ারতকারী নারীদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক।
কোন কোন কেতাবে “জায়েরাত” শব্দের পরিবর্তে “জাওয়ারাতুল কুবর” উল্লিখিত হয়েছে যা অতিরঞ্জিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে।
আহলে সুন্নাতের কোন কোন ওলামা যেমন তিরমিযি প্রমূখ বর্ণনা করেন যে, উক্ত হাদিসটি সে যুগের সাথে সুনির্দিষ্ট যখন হুজুর পাক (সাঃ) এ ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। কিন' পরবর্তীতে নির্দেশ রহিত হয় এবং তিনি অনুমতি প্রদান করেছিলেন.....। (সুনানে তিরমিযি, খঃ ৩, পৃঃ ৩৭১, যে অধ্যায়ে কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে)
অন্যান্য ওলামা বলেন যে, এ হাদিসটি সেই নারীর প্রতি সুনির্দিষ্ট যে নারী তার অধিকাংশ সময় কবর জিয়ারতে ব্যয় করত যার ফলে স্বামীর অধিকার খর্ব হত। পূর্বে উল্লিখিত “জাওয়ারাত” শব্দের বিষয়টি যা অতিশয়োক্তি বা অতিরঞ্জন শব্দেরই একরূপ এ কথার প্রমাণবহন করে।
ওহাবী ভাইয়েরা ইচ্ছে করলে সবকিছু অস্বীকার করতে পারেন কিন' হযরত আয়শার কোন কাজকে তো অস্বীকার করতে পারেন না। কেননা, হুজুর (সাঃ) এবং প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফার কবর তার গৃহে ছিল আর বরাবরই তিনি উক্ত কবরসমূহের খুবই কাছাকাছি অবস'ান করতেন।
কেবলমাত্র তিনটি মসজিদের জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরের প্রস'তি নেয়া জায়েয ঃ
ইসলামের ইতিহাসে শতাব্দীকাল ধরে মুসলমানগণ হুজুর পাক (সাঃ) এবং জান্নাতুল বাকীতে সামাধিস' বুজুর্গানে দ্বীনের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরের প্রস'তি নিতেন এবং সফরে বের হতেন। এতে কেউ আপত্তি তোলেন নি। অতঃপর সপ্তম শতাব্দীতে ইবনে তাইম্মা তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্যান্য মসজিদ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফরের প্রস'তি নিতে তার অনুসারীদেরকে নিষেধ করলেন এবং তা হারাম বলে আখ্যায়িত করেন। এ ক্ষেত্রে দলিল হিসেবে আবু হোরায়রা কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করেন যে, হুজুর পাক (সাঃ) এরশাদ করেন ঃ “কেবলমাত্র তিনটি মসজিদের জিয়ারতের উদ্দেশে সফরের জন্য প্রস'তি নেয়া যাবে, এক. আমার মসজিদ, দুই. মসজিদুল হারাম এবং তিন. মসজিদুল আক্‌সা।” (সহীহ মুসলিম, খঃ ৪, পৃঃ ১২৬)
যদিও প্রথমতঃ উল্লিখিত হাদিসের বিষয়বস' মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য স'ানের জিয়ারতের সাথে নয়। সুতরাং হাদিসের অন্তর্নিহিত মর্ম এ হবে যে, তিনটি মসজিদ ছাড়া অপরাপর মসজিদের জন্য সফরের প্রস'তি নেয়া যায় না।
দ্বিতীয়তঃ এ হাদিসটি অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে আর সে বর্ণনা মোতাবেক সত্যিকারার্থে তাঁর ইপ্সিত বস'র উপর দলিল বা প্রমাণ বহন করে না। আর সেটি হচ্ছে যে, “তিনটি মসজিদের ক্ষেত্রে প্রস'তি নেয়া হয়।” আর প্রকৃত অর্থে হাদিসটি এ কর্মকে উৎসাহ দেয়। তবে উৎসাহ প্রদানের অর্থ এ নয় যে, অন্যান্য স'ানের জিয়ারত করা যাবে না অথবা অন্যান্য স'ানের জিয়ারতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। কেননা, একটি বিষয় প্রমাণিত হলে দ্বিতীয় বিষয়টি অস্বীকৃত হয় না। আর যেহেতু জানা নেই মূল হাদিসের ভাষা প্রথম হাদিসের মত ছিল নাকি দ্বিতীয়টির মত। এ কারণে হাদিসটির অস্পষ্টতা প্রমাণ হয় এবং অস্পষ্ট হাদিসের ভিত্তিতে কোন প্রমাণ দাঁড় করানো যায় না এবং তা বিশ্বাসযোগ্যও হয় না।
কবরের উপরে কোন কিছু নির্মাণ করা কি নিষিদ্ধ?
শতাব্দীকাল ধরে ইসলাম ধর্মের বুজুর্গ ব্যক্তিগণের কবরের উপর ঐতিহাসিক অথবা সাধারণ ইমারত নির্মাণ করার প্রচলন ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে এবং তাদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মুসলমানরা আগমন করতেন। এক্ষেত্রে কেউ আপত্তিও করতেন না। প্রকৃতপক্ষে এ আমলের ক্ষেত্রে মুসলমানদের মধ্যে ঐকমত্য ছিল, কোন প্রকার মতভেদ ছিল না।
ঐতিহাসিকগণ যেমন মাস্‌উদি (চতুর্থ শতাব্দীতে) স্বীয় গ্রন' ‘মুরাওয়াদ আল জাহাব’ গ্রনে' এবং অন্যান্য পর্যটকবৃন্দ যেমন ইবনে যুবাইর ও ইবনে বতুতা যথাক্রমে সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে তাদের সফরনামায় এ ধরনের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সমাধি সৌধের কথা উল্লেখ করেছেন। অথচ সপ্তম শতাব্দীতে ইবনে তাইম্মা এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে তারই শিষ্য মোহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব জন্মগ্রহণ করেন এবং তারা কবরের উপর নির্মিত ইমারতসমূহকে বিদাআত, শিরক ও হারাম আখ্যায়িত করেন। ওহাবীদের কাছে যেহেতু ধর্মীয় বিষয়সমূহ বিশ্লেষণ করার জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা ছিল, বিশেষ করে তাওহীদ এবং শিরক সম্পর্কিত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে তারা সন্দেহ এবং ওয়াসওয়াসার শিকার হয়ে পড়েন। তারা যখনই কোন দলিল বা সনদ পেয়েছেন তা যেখান থেকেই হোক না কেন তার বিরোধিতায় উঠে পড়ে লেগেছেন। একারণেই জিয়ারত, শাফায়াত, কবরের উপর সৌধ নির্মাণ এবং অন্যান্য মাসআলাসমূহকে শরীয়ত পরিপন'ী গণ্য করে শিরক ও বিদাআত বলে আখ্যায়িত করেন। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গের কবরের উপর সৌধ নির্মাণের বিষয়টি। আজও কেবলমাত্র হেজাজ ব্যতিত পৃথিবীর সকল স'ানে আম্বিয়া কেরাম এবং দ্বীনের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বুজুর্গ ব্যক্তিগণের কবরের উপর ঐতিহাসিক সৌন্দর্যমন্ডিত সৌধের অস্তিত্ব বিরাজমান যা অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও স্মৃতিকে পুনঃজীবিত করে। মিশর থেকে ভারত এবং আলজিরিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত সকল মানুষ নিজ নিজ দেশে অবসি'ত ইসলামী পুরাকীর্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। বিশেষ করে বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গের কবরের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শনে বিশ্বাস করেন। কিন' হেজাজে এমন কিছু পরিলক্ষিত হয় না। এর কারণ হলো, তারা ইসলামী এ সকল বিষয়ের অন্তর্নিহিত মর্মকে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন অথবা সক্ষম হননি।
ওহাবীদের হাতে ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ধ্বংসসাধন ঃ
বিগত শতাব্দীতে ওহী নাযিলের সেই পূণ্যভূমি হেজাজে একটি তিক্ত ঘটনা ঘটে যায় যে ঘটনা মুসলমানদেরকে ইসলামী ঐতিহ্য ও নিদর্শনসমূহ থেকে চিরতরের জন্য বঞ্চিত করে। আর সে দুর্ঘটনাটি ছিল ওহাবীগণকর্তৃক হেজাজের ক্ষমতা গ্রহণ। আনুমানিক আশি বছর পূর্বে (১৩৪৪ হিঃ) যখন ওহাবীরা হেজাজের ক্ষমতা দখল করে তারা তখন এক ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ইসলামের ইতিহাসের সকল ঐতিহ্যবাহী ইমারতসমূহকে শিরক অথবা বিদআতের অজুহাতে বিধ্বস্ত করে ধুলির সাথে মিশিয়ে দেয়। নবী করিম (সাঃ) এর পবিত্র রওজা মুবারক ধ্বংস করার দুঃসাহস অবশ্য তারা দেখায়নি। কেননা তাদের ভয় ছিল পৃথিবীর সকল মুসলমান তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে না ওঠে।
বেশ কয়েকবার পবিত্র মক্কা নগরী সফর করার মুহূর্তে আমি বন্ধুসুলভ পরিবেশে ওহাবী বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গের কাছে জানতে চেয়ে ছিলাম যে, আপনারা রাসুল (সাঃ) এর রওজা ছাড়া সকল সমাধি সৌধের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বিরান করে দিয়েছেন। এ কবর অবশিষ্ট রাখার পেছনে কী রহস্য কাজ করছে? আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তাদের কাছে কোন ওজর ও বাহানা ছিল না।
যাই হোক, জাতিসমূহের অস্তিত্ব তাদের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও দ্বীনি ও ইলমী নিদর্শনসমূহের হেফাজত। অথচ অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার সাথে বলতে হয় যে, ওহী নাযিলের সেই পূণ্যভূমি বিশেষ করে মক্কা ও মদীনায় মুসলমানদের ভুল বিচার বিবেচনার ফলে এক পশ্চাৎপদ মনমানসিকতার ধারক ও বাহক এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ একটি গোষ্ঠী ইসলাম ধর্মের অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে ফালতু অজুহাতের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়। এমন উত্তরাধিকার যার এক একটি ইমারত ইসলাম ধর্মের গৌরবময় ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দিত।
পবিত্র ইমামগণের (আঃ) এবং জান্নাতুল বাক্বীতে সমাধিস' অন্যান্য বুজুর্গানে দ্বীনের কবরসমূহকেই ধ্বংস করা হয়নি বরং এ গোষ্ঠী যেকোন স'ানেই ইসলামী ইতিহাসের কোন নিদর্শন পেয়েছে তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে যার ফলে মুসলমানরা অবর্ণনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং হচ্ছে।
ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহের আকৃষ্ট করার এক অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল এবং মানুষকে ইসলামী ইতিহাসের গভীরতর বিষয়সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দিত। জান্নাতুল বাক্বী সমাধি ক্ষেত্রটি একসময় অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স'ান হিসেবে পরিচিত ছিল এবং এর প্রতিটি প্রান্ত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দুর্ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিত যা আজ এক নির্জন বিজন ভূমিতে পরিণত হয়েছে যা দেখে সত্যিই অদ্ভূত লাগে আর তাও বড় বড় মনোরম অট্টালিকা ও হোটেলের মাঝে এর অবস'ান বড়ই বিস্ময়কর মনে হয়। লৌহ নির্মিত দরজা সারাদিনে কেবল বড় জোর এক-দু’ঘন্টার জন্য উন্মুক্ত করা হয় তাও শুধুমাত্র পুরুষ জিয়ারতকারীদের জন্য।

অজুহাত :
১। কবরসমূহকে মসজিদ বানানো উচিৎ নয়।
তারা কখনো বলেন যে, কবরের উপর সৌধ নির্মাণ কবর পুজার কারণ সৃষ্টি করে এবং নবী করিম (সাঃ) এর এই হাদিসটি সৌধ নির্মাণ জায়েজ না হওয়ার স্বপক্ষে একটি দলিল। হাদিসটির বাংলা অর্থ হলো, “আল্লাহ তাআলা ইহুদীদের উপর লানত বর্ষণ করেছেন কেননা, তারা তাদের আম্বিয়াদের (আঃ) কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছিল। (সহীহ বুখারী, খঃ ১, পৃঃ ১১০, একই হাদীস কিছু শাব্দিক পরিবর্তন সাপেক্ষে সহীহ মুসলিমেও উল্লেখিত হয়েছে, খঃ ২, পৃঃ ৬৭)
সকল মুসলমান ভাল করে জানেন যে, তারা কেউ আল্লাহর ওলীদের কবরের পুজা করেন না এবং জিয়ারত ও ইবাদাতের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য আছে। আমরা যেভাবে জীবিত লোকের জিয়ারত ও সাক্ষাতের জন্য যাই, বুজুর্গ ব্যক্তিদের প্রতি যেভাবে সম্মান জানাই ও দোয়া করার জন্য অনুরোধ করে থাকি; ঠিক একইভাবে মৃত ব্যক্তিদের জিয়ারতের উদ্দেশ্যে জিয়ারতকারীরা গিয়ে থাকেন এবং বুজুর্গানে দ্বীন এবং আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণকারী শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং দোয়ার জন্য নিবেদন করে থাকেন।
পয়গম্বর (সাঃ) কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে জান্নাতুল বাক্বীতে যেতেন এবং আহলে সুন্নাতের অনেক গ্রনে'ও হুজুর পাক (সাঃ) কর্তৃক কবর জিয়ারতের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। যদি আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের উপর লানত করেছিলেন তার কারণ ছিল যে, তারা আম্বিয়ার (আঃ) কবরসমূহকে সেজদার স'ান বলে বিশ্বাস করত। অথচ কোন মুসলমান কোন কবরকে নিজের সেজদার স'ান বলে মনে করেন না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও মনোযোগ আকর্ষণকারী বিষয় হচ্ছে, আজও ইসলাম ধর্মের মহান নবী (সাঃ) এর পবিত্র রওজা মসজিদে নববীর সাথে অবসি'ত এবং সকল মুসলমান এমনকি ওহাবীরাও এ পবিত্র রওজার (মসজিদে নববীর ঐ অংশ যা হুজুর পাক (সাঃ) এর পবিত্র রওজা সংলগ্ন) পাশে পাঁচ ওয়াক্ত ওয়াজিব নামাজ আদায় করে থাকেন এবং এ ছাড়াও মুস্তাহাব নামাজও পড়ে থাকেন এবং নামাজ শেষে পয়গাম্বর (সাঃ) এর কবরের জিয়ারত করে থাকেন। এ কাজগুলো কী তাহলে কবর পুজা হিসেবে গণ্য হবে আর হারাম বলে বিবেচিত হবে? অথবা হুজুর (সাঃ) এর পবিত্র রওজা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম? গায়রুল্লাহ পুজার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে নিষিদ্ধ হওয়ার দলীলসমূহও কী ব্যতিক্রমী হওয়ার যোগ্য? নিশ্চয়ই কবরের জিয়ারত ইবাদত বলে গণ্য হয় না এবং হুজুর পাক (সাঃ) এর পবিত্র রওজার সাথে অথবা অন্যান্য আউলিয়া কেরামের কবরের কাছাকাছি নামাজ আদায় করায় কোন অসুবিধা নেই এবং উপরোল্লিখিত হাদিসটি ঐ সকল মানুষের সাথে সুনির্দিষ্ট যারা প্রকৃতই কবরের পুজা ও উপাসনা করত। যে সকল ব্যক্তি শিয়াদের পবিত্র ইমাম (আঃ)গণের কবর জিয়ারতের সাথে পরিচিত তারা জানেন যে, ওয়াজিব নামাজের ওয়াক্তে মুয়াজ্জিন যখন আযান দেন তখন সকলে কেবলামুখী হয়ে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেন এবং জিয়ারত করার সময় সর্বপ্রথম একশ’ বার তাকবির উচ্চারণ করেন এবং জিয়ারতের পরে দু’রাকাত নামাজে জিয়ারত কেবলামূখী হয়ে আদায় করেন যাতে সূচনা ও সমাপ্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, উপাসনা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সাথে নির্দিষ্ট। কিন' দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বিশেষ কিছু উদ্দেশ্যের কারণে এ ধরনের মিথ্যা অপবাদ ও অপপ্রচারের দরজা খুলে দেয়া হয়েছে এবং ওহাবীরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি নানা ধরনের অপবাদ আরোপ করে থাকে। তাদের কথাবার্তা সম্পর্কে সর্বোত্তম ধারণা আমরা এটাই করতে পারি যে, তারা জ্ঞানগত স্বল্পতার কারণে সমস্যার সঠিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারছেন না এবং তাওহীদ ও শিরক এর যথার্থতা ও বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে পারেননি এবং জিয়ারত ও ইবাদতের মধ্যেকার স্পষ্ট পার্থক্য বুঝতে তারা সক্ষম হননি।

২। আরো একটি ওজুহাত ঃ
সহীহ মুসলিম থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করছি যে, আবুল হাইয়াজ হুজুর পাক (সাঃ) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করছেন, অর্থাৎ, “হযরত আলী আমাকে বললেন, তোমাকে কি ঐ দায়িত্ব অর্পন করব যা রাসুল (সাঃ) আমাকে অর্পন করেছিলেন ঃ যেখানে জীবন্ত প্রাণির ছবি দেখবে তা মুছে ফেলতে এবং যে কোন স'ানে উচুঁ অবস'ায় যদি কবর দেখ তাকে সমান করে দাও।”
এ হাদীস থেকে ভুল অর্থ নেয়ার কারণে কোন কোন লোক বেলচা হাতে তুলে নেয় এবং সকল বুজুর্গানে দ্বীনের কবর ধ্বংস করে দেয় কেবলমাত্র হুজুর পাক (সাঃ) এর পবিত্র রওজা এবং পূর্ববর্তী দুই খলিফার কবর এমন এক ব্যতিক্রমী ধারণার ভিত্তিতে রক্ষা পেল যার কোন দলিল ও প্রমাণ পাওয়া যায় না।
প্রথমত ঃ এ হাদীসের সনদে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন যারা আহলে সুন্নাতের রিজাল অনুযায়ীও বিশ্বস্ত বলে বিবেচিত নন এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ ধোকাবাজ ও প্রতারক হিসেবে গণ্য হয়ে থাকেন বিশেষ করে “সুফিয়ান সূরী” ও “ইবনে আবি ছাবিত”।
দ্বিতীয়ত ঃ আমরা যদি ধরেও নি যে, এ হাদিসটি সঠিক তাহলে এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, কবরের পৃষ্ঠদেশ পরিস্কার থাকা উচিত (মাছের পৃষ্ঠদেশের ন্যায় উঁচু হবে না যেমন, কাফিরদের এখানে প্রচলন ছিল) এবং আহলে সুন্নাতের অনেক ফকীহগণ ফতোয়া দিয়েছেন যে, কবরের পৃষ্ঠদেশ পরিস্কার এবং সমন্তরাল হওয়া উচিত আর এ বিষয়টি উল্লিখিত বাহাসের সাথে সম্পৃক্ত নয়।
তৃতীয়ত ঃ আমরা ধরে নিচ্ছি হাদিসের ভাবার্থ হচ্ছে এ রকম যে, কবর মাটির সাথে সমান্তরাল থাকবে এবং মোটেই উত্থিত অবস'ায় থাকবে না। কিন' এ বিষয়টির সাথে কবরের উপরে সৌধ নির্মাণের সম্পর্ক কি?
সকল মুসলমান ভাল করে জানেন যে, তারা কেউ আল্লাহর ওলীদের কবরের পুজা করেন না এবং জিয়ারত ও ইবাদাতের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য আছে। আমরা যেভাবে জীবিত লোকের জিয়ারত ও সাক্ষাতের জন্য যাই, বুজুর্গ ব্যক্তিদের প্রতি যেভাবে সম্মান জানাই ও দোয়া করার জন্য অনুরোধ করে থাকি; ঠিক একইভাবে মৃত ব্যক্তিদের জিয়ারতের উদ্দেশ্যে জিয়ারতকারীরা গিয়ে থাকেন এবং বুজুর্গানে দ্বীন এবং আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণকারী শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং দোয়ার জন্য নিবেদন করে থাকেন।
পয়গম্বর (সাঃ) কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে জান্নাতুল বাক্বীতে যেতেন এবং আহলে সুন্নাতের অনেক গ্রনে'ও হুজুর পাক (সাঃ) কর্তৃক কবর জিয়ারতের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। যদি আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের উপর লানত করেছিলেন তার কারণ ছিল যে, তারা আম্বিয়ার (আঃ) কবরসমূহকে সেজদার স'ান বলে বিশ্বাস করত। অথচ কোন মুসলমান কোন কবরকে নিজের সেজদার স'ান বলে মনে করেন না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও মনোযোগ আকর্ষণকারী বিষয় হচ্ছে, আজও ইসলাম ধর্মের মহান নবী (সাঃ) এর পবিত্র রওজা মসজিদে নববীর সাথে অবসি'ত এবং সকল মুসলমান এমনকি ওহাবীরাও এ পবিত্র রওজার (মসজিদে নববীর ঐ অংশ যা হুজুর পাক (সাঃ) এর পবিত্র রওজা সংলগ্ন) পাশে পাঁচ ওয়াক্ত ওয়াজিব নামাজ আদায় করে থাকেন এবং এ ছাড়াও মুস্তাহাব নামাজও পড়ে থাকেন এবং নামাজ শেষে পয়গাম্বর (সাঃ) এর কবরের জিয়ারত করে থাকেন। এ কাজগুলো কি তাহলে কবর পুজা হিসেবে গণ্য হবে আর হারাম বলে বিবেচিত হবে? অথবা হুজুর (সাঃ) এর পবিত্র রওজা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম? গায়রুল্লাহ পুজার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে নিষিদ্ধ হওয়ার দলীলসমূহও কী ব্যতিক্রমী হওয়ার যোগ্য? নিশ্চয়ই কবরের জিয়ারত ইবাদত বলে গণ্য হয় না এবং হুজুর পাক (সাঃ) এর পবিত্র রওজার সাথে অথবা অন্যান্য আউলিয়া কেরামের কবরের কাছাকাছি নামাজ আদায় করায় কোন অসুবিধা নেই এবং উপরোল্লিখিত হাদিসটি ঐ সকল মানুষের সাথে সুনির্দিষ্ট যারা প্রকৃতই কবরের পুজা ও উপাসনা করত। যে সকল ব্যক্তি শিয়াদের পবিত্র ইমাম (আঃ)গণের কবর জিয়ারতের সাথে পরিচিত তারা জানেন যে, ওয়াজিব নামাজের ওয়াক্তে মুয়াজ্জিন যখন আযান দেন তখন সকলে কেবলামুখী হয়ে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেন এবং জিয়ারত করার সময় সর্বপ্রথম একশ’ বার তাকবির উচ্চারণ করেন এবং জিয়ারতের পরে দু’রাকাত নামাজে জিয়ারত কেবলামূখী হয়ে আদায় করেন যাতে সূচনা ও সমাপ্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, উপাসনা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সাথে নির্দিষ্ট। কিন' দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বিশেষ কিছু উদ্দেশ্যের কারণে এ ধরনের মিথ্যা অপবাদ ও অপপ্রচারের দরজা খুলে দেয়া হয়েছে এবং ওহাবীরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি নানা ধরনের অপবাদ আরোপ করে থাকে। তাদের কথাবার্তা সম্পর্কে সর্বোত্তম ধারণা আমরা এটাই করতে পারি যে, তারা জ্ঞানগত স্বল্পতার কারণে সমস্যার সঠিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারছে না এবং তাওহীদ ও শিরক এর যথার্থতা ও বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে পারেনি এবং জিয়ারত ও ইবাদতের মধ্যকার স্পষ্ট পার্থক্য বুঝতে তারা সক্ষম হয়নি।

ধরুন হুজুর পাক (সাঃ) এর পবিত্র কবরের পাথর ভূমির সাথে সমান্তরাল এবং এর সাথে সাথে কবরের উপর সৌধ বা গম্বুজ যা আজও অবশিষ্ট আছে এ দু’য়ের মধ্যে বৈপরীত্য কোথায়? আমরা পবিত্র কোরআনে যেভাবে পাঠ করে থাকি যে, যখন আসহাবে কাহাফের (গুহাবাসী মুমিন) ঘটনাটি প্রকাশিত হয়ে গেল তখন লোকেরা বললো যে এঁদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করব। পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে, “...............যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিল, তখন তারা বললো ঃ তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর। তাঁদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভাল জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বললো, আমরা অবশ্যই তাদের স'ানে মসজিদ নির্মাণ করব।” (সুরা কাহাফ ঃ ২১)
পবিত্র কোরআন এ ঘটনাটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বর্ণনা করেছে এবং কোন আপত্তি করেনি। এর অর্থ হল যে, বুজুর্গ ব্যক্তিদের কবরের সাথে সৌধ নির্মাণে কোন অসুবিধা নেই।
বুজুর্গানে দ্বীনের কবর জিয়ারতের ইতিবাচক প্রভাব ঃ
যদি মানুষকে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে সকল ধরনের  উগ্রতা ও কঠোরতা পরিহার এ সকল বুজুর্গ ব্যক্তিদের মাজারের পাশে বসে আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিবিষ্ট করে কৃত গোনাহর জন্য তাওবাহ করা হয় এবং আল্লাহর ওলীদের চিন্তাধারা থেকে ইলহাম লাভ করেন তাহলে নিশ্চিতরূপে এ সকল মাজার শিক্ষা-দীক্ষা ও আল্লাহ তাআলার প্রতি তাওবাহ ও অন্তঃকরণ পরিশুদ্ধির একটি কেন্দ্রে পরিণত হবে।
এ বিষয়টি আমাদের কাছে পরিক্ষিত যে, প্রতিবছর পবিত্র ইমাম (আঃ)গণ ও আল্লাহর রাহে শাহাদাতবরণকারী ব্যক্তিবর্গের কবর জিয়ারতে গমণকরী লক্ষ লক্ষ জায়েরীন, প্রবল জযবা ও অনুভূতি এবং স্বচ্ছ ও পবিত্র মন নিয়ে ফিরে আসেন। হৃদয়ের এ নুরানী অনুভতি দীর্ঘ দিন ধরে তাঁদের আমল ও চরিত্রে প্রতিভাত হয়। আর এ জায়েরীনরা যখন আল্লাহর দরবারে তাদের শাফায়েতের জন্য এ বুজুর্গানে দ্বীনকে আর্তস্বরে ডাকেন এবং আল্লাহর নিকট স্বীয় গোনাহর তাওবাহ ও ইহলৌকিক ও পারলৌকিক প্রয়োজন অন্বেষণ করে থাকেন তখন রূহানী ও মানবীয় যোগাযোগ অব্যাহত রাখার জন্য তাদের জন্য গোনাহ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা এবং কল্যাণকর পথে পরিচালিত হওয়া খুবই জরুরী হয়ে পড়ে। এভাবে এ উসিলা তাঁদের কল্যাণের কারণ হয়ে থাকে।
এছাড়া বুজুর্গানে দ্বীনের প্রতি এ ধরনের শ্রদ্ধা পোষণ ও তাঁদের উসিলার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে তাঁদের শাফায়েত কামনা মানুষকে প্রতিকূল ও বৈরী পরিসি'তির মোকাবিলায় সাহসী করে তোলে এবং হতাশা ও আশাহীনতার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ও তার আত্মিক ও দৈহিক ব্যথা বেদনার প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া আরো অনেক সৌভাগ্য ও প্রাচুর্যের কারণ সৃষ্টি করে। আমরা জিয়ারত, শাফায়াত ও উসিলা (তাওয়াস্‌সুল) সম্পর্কে সংকীর্ণতা ও বক্রচিন্তার কারণে কেন মানুষগুলোকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করব? কোন সুস' জ্ঞানসম্পন্ন বিবেক কি এর অনুমতি দেয়? এ রূহানী ও মানবীয় স্তর অতিক্রম করতে বাধা সৃষ্টি এক চরম ক্ষতির কারণ হবে। কিন' কি করার আছে? দুঃখ হলো, কিছু কিছু মানুষের তাওহীদ ও শীরক এর বিষয়ে অহেতুক সন্দেহ প্রবণতা ও কু-মন্ত্রণা অনেক মানুষকে আল্লাহর অপার দয়া থেকে বঞ্চিত করেছে।
৩। পবিত্র বস'র প্রতি ভালবাসা ও অন্বেষণণ করা নিষিদ্ধ ঃ
যারা বুজুর্গ ব্যক্তিদের কবরের জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যান এবং এ জিয়ারত থেকে উপকৃত হোন এবং তারা কখনো কবর বা যারীহ চুম্বন করেন-এতে আবার অনেকে শীরক এর গন্ধ পান। হাজী সাহেবরা তাই দেখে থাকবেন যে, হুজুর পাক (সাঃ) এর পবিত্র রওজার নিকটে চারিদিকে কঠোর নিরাপত্তা কর্মীরা দণ্ডায়মান থাকেন এবং নবীর (সাঃ) প্রেমিক জিয়ারতকারীদেরকে পবিত্র যারীহ ও কবরের দিকে অগ্রসর হতে বাধা প্রদান করেন। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিকে কখনো “ইবনে তাইম্মা” ও “মোহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওহাব” এর প্রতি সম্বন্ধ দিয়ে থাকেন। আমি বিশ্বাস করি যে, এ দু’ব্যক্তি যারা ওহাবী ধারণার প্রতিষ্ঠাতা তারা যদি রাসুল (সাঃ) এর যুগে থাকতেন এবং হোদায়বিয়া সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের মুহূর্তে স্বচক্ষে দেখতেন যে, যখন হুজুর (সাঃ) ওযু করতেন তখন সাহাবায়ে কেরামগণ একে ওপরের থেকে এগিয়ে গিয়ে ওযুর পানি নেয়ার চেষ্টা করতেন যাতে এক ফোটা পানিও যেন মাটিতে না পড়ে। এ ঘটনাটি হুজুর পাক (সাঃ) এর জীবদ্দশায় কয়েকবার সংঘটিত হয়েছে। (সহীহ মুসলিম, খঃ ৪, পৃঃ ১৯৪৩ ও কানজুল উম্মাল, খঃ ১৬, পৃঃ ২৪৯ দ্রষ্টব্য)
অথবা এ ব্যক্তিরা নবী করিম (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর মদীনায় থাকতেন তাহলে স্বচক্ষে দেখতে পেতেন যে, নবী করিম (সাঃ) এর প্রথম মেযবান হযরত আবু আইউব আনসারী (রাঃ) পবিত্র রওজার উপর মুখমন্ডল রেখে পবিত্রতা লাভ করছেন। (মুসতাদরক সহীহায়ন, খঃ ৪, পৃঃ ৫৬০)
অথবা হযরত বেলাল (রাঃ) হযরত নবী করিম (সাঃ) এর কবরের নিকটে বসে অঝোরে ক্রন্দন করতেন এবং গভীর দুঃখ ভারাক্রান্ত হওয়ার কারণে স্বীয় মুখমন্ডল পবিত্র রওজার উপর ঘষতেন। (তারিখে ইবনে আসাকার, খঃ ৭, পৃঃ ১৩৭)

দ্বীনের আলেমগণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ঃ
সাধারণ মানুষের কিছু কিছু কর্মকান্ডের ফলে বিরুদ্ধবাদীরা সুযোগ পেয়ে যায় সে কারণে সকল আলেম ওলামা ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের উপর দায়িত্ব বর্তায় যে তাঁরা জনগণকে হুজুরে পাক (সাঃ), জান্নাতুল বাক্বীতে এবং অন্যত্র সমাহিত পবিত্র ইমাম ও শোহাদার পবিত্র সমাধিগুলোর নিকটে অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকান্ডে বাধাদান করেন এবং তাদেরকে জিয়ারত, তাওয়াস্‌সুল, তাবারক বা পবিত্র বস' ও শাফায়াত সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা দেন। যদি আমরা পয়গম্বর (সাঃ) ও পবিত্র ইমামগণের (আঃ) উসিলা কামনা করি সেক্ষেত্রে এ পবিত্র সত্ত্বাসমূহ আল্লাহর অনুমতি ও সাহায্যের মাধ্যমেই প্রত্যেক কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন এবং আমাদের শাফায়াত ও প্রয়োজন পুরণের জন্য আল্লাহর নিকট দাবী পেশ করেন।
সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু লোক তাঁদের পবিত্র কবরের সামনে সেজদা করা অথবা এমন বাক্য উচ্চারণ করা যার মধ্যে ঈশ্বরত্বের গন্ধ পাওয়া যায় অথবা যারীহর কোন কিছুর সাথে সূতার গেরো দেয়া ইত্যাদি, এগুলো অশিষ্ট আচরণের মধ্যে গণ্য হয় এবং এর থেকে নানা রকম জটিলতার সৃষ্টি হয়। ফলে জিয়ারতের ন্যায় ইতিবাচক ও গঠনমূলক একটি কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বিরুদ্ধবাদীরা সমালোচনার সুযোগ পায়। যার কারণে সকল মানুষ জিয়ারতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়।  সূত্রঃ ইন্টারনেট