হজরত ইমাম হুসাইন (আঃ) এর পবিত্র জন্ম বার্ষিকী

হজরত ইমাম হুসাইন (আঃ) এর পবিত্র জন্ম বার্ষিকী

হজরত ইমাম হুসাইন (আঃ) এর জন্ম বার্ষিকী

ইমাম হোসেইন, উম্মে আইমান, রাসুল, হাসান, আবু হোরায়রা, জাফর সাদেক, হযরত আলী
বেহেশতী সব ফুলের সুবাস
ভরিয়ে দিল আকাশ-বাতাস
বললাম আমি, এআবার কিসের আভাস?
গায়েবি এক আওয়াজ এলো
বলল আমায় ডেকে
জানিয়ে দে,ধরার বুকে এই দিবসে
হোসেইন এসেছে।
রাসুলের কাছে খবর এলো,উম্মে আইমান রাত-দিন শুধুই কাঁদছেন আর কাঁদছেন। তাই রাসুল (সা:), উম্মে আইমানকে তার কাছে আনতে বললেন। মহানবী জিজ্ঞেস করলেন, উম্মে আইমান, তোমার কি হয়েছে, কাঁদছ কেন? উম্মে আইমান বলল, আমি একটি দু:স্বপ্ন দেখেছি। রাসুলে করিম (সা:) উম্মে আইমানকে তার স্বপ্নের ঘটনা বর্ণনা করতে বললেন। উম্মে আইমান বলল, হে রাসুলে খোদা! রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি আপনার দেহের একটা অংশ আমার ঘরে পড়ে রয়েছে। এ কথা শুনেই রাসুল মনজুড়ানো হাসি হেসে বললেন, শান্ত হও উম্মে আইমান, আমার মেয়ে ফাতিমার এক পুত্র সন্তান হবে, যার দেখাশোনা করবে তুমি অর্থাৎ আমার দেহের একটা অংশ তোমার ঘরে অবস্থান করবে।
এরপর চতুর্থ হিজরীর তেশরা শাবান ইমাম হোসেইন (আ:)-র জন্ম হলো। জন্মের পর শিশুকে রাসুলের কাছে নিয়ে আসা হলো। মহানবী প্রথমেই শিশুর কানে কালেমায়ে শাহাদাৎ পড়ে শুনালেন। রাসুল (সা:) এর মাধ্যমে শিশুর মনে একত্ববাদের বীজ বপন করলেন এবং শিশুটির নাম রাখলেন হোসেইন। এরপর রাসুল হোসেইন (আ:)-কে চুম্বন করলেন এবং তার দাইমার কাছে তুলে দিলেন। জন্মের সপ্তম দিন দাইমা উম্মে আইমান, হোসেইন (আ:)-কে রাসুলের কাছে নিয়ে এলেন। মহানবী এদিন উম্মে আইমানকে বললেন, স্বপ্নে তোমাকে হোসেইনের আগমনের কথাই বলা হয়েছিল। এরপর সেদিন মহানবী নিঃস্ব ও অসহায়দের মাঝে খাবার বিতরণ করলেন এবং মানুষের মাঝে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিলেন। সেদিন তিনি হোসেইন (আ:)-র হৃদয়কে একত্ববাদ ও জ্ঞানের আলোতে পরিপূর্ণ করেন।
হোসেইন (আ:) পৃথিবীর পবিত্রতম পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাকে যারা কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন, তাদের সবাই ছিলেন নৈতিকতা ও মানবতার দিশারী। যারা গোটা মানব জাতিকে সৎ পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের তত্ত্বাবধানেই বেড়ে উঠেন হোসেইন (আ:)। পিতা আমিরুল মোমেনিন আলী (আ:) ও মাতা নবীকন্যা ফাতিমা (সা:আ:)-র পাশপাশি রাসুলে আকরামের শিক্ষা ও সাহচর্যে হোসেইন (আ:) অনন্য গুণাবলীসমৃদ্ধ এক আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেন।
আরব সংস্কৃতিতে মেয়ের পক্ষের নাতি-নাতনিকে ছেলের পক্ষের নাতি-নাতনিদের মতো অতটা আপন বলে মনে করা হতো না এবং নিজ বংশের সন্তান বলে গণ্য করা হতো না। তাই মহানবী (সা:) এই ভ্রান্ত সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনেন। তিনি তার কন্যা ফাতিমার সন্তান হোসেইন (আ:)-কে নিজের দেহের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেন। রাসুল, ফাতিমা (সা: আ:)-র সন্তান হাসান ও হোসেইনকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। একদিন এক ব্যক্তি দেখলেন, রাসুলে খোদা নিজের দুই কাধে দুই নাতিকে বসিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছেন এবং একবার হোসেইনকে ও আরেকবার হাসানকে চুমো দিচ্ছেন। এ অবস্থায় ঐ ব্যক্তি রাসুলকে প্রশ্ন করলেন, হে রাসুলে খোদা আপনি কি এই দুই শিশুকে খুব ভালোবাসেন? রাসুল এর জবাবে বলেছিলেন, যারা এই দুই জনকে ভালোবাসবে তারা যেন আমাকেই ভালোবাসল এবং যারা তাদের সাথে শত্রুতা করবে তারা যেন আমার সাথেই শত্রুতা করল।
হযরত আবু হোরায়রা বলেছেন, আমি স্বচক্ষে দেখেছি, হোসেইন, রাসুলে খোদার দুই হাত ধরে রাসুলের পা থেকে শরীর বেয়ে উপরের দিকে উঠছে এবং উঠতে উঠতে হোসেইনের পা দুটি যখন রাসুলের বুকের উপর তখন রাসুল তাকে চুম্বন করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলছেন, হে আল্লাহ, আমি হোসেইনকে ভালোবাসি,আপনিও তাকে ভালোবাসুন।
আল্লাহর অপার মহিমা এই যে তিনি নিষ্প্রাণ উপাদান থেকে মানুষ সৃষ্টি করেন এবং তার মাঝে পরম পূর্ণতা অর্জনের ক্ষমতা দিয়ে দেন। পৃথিবীতে যারা উৎকর্ষতার সর্বোচ্চ চূড়া জয় করতে পেরেছেন, তাদেরই একজন হলেন ইমাম হোসেইন (আ:)। তিনি আল্লাহ প্রেমে আত্মহারা এক মহামানব। আল্লাহপ্রেম তাকে বস্তুগত সকল স্বার্থের বেড়াজাল ভেদ করতে সহায়তা করেছে। নবী বংশের ষষ্ঠ ইমাম হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আ:), ইমাম হোসেইন(আ:)-কে পরিতৃপ্ত ও নিরাপদ আত্মার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা ফাজরে এ ধরনের আত্মার কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা তার প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনি নিজেও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। ইমাম হোসেইন (আ:) জীবনের কোন পর্যায়েই ধর্ম ও ন্যায় বিচারের ব্যাপারে আপস করেন নি। ইমাম হোসেইন, মহানবী হযরত মোহাম্মদ(সা:) ও পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের পথ অনুসরণ ও তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। এ কারণে আমরা জুমার নামাজের খোতবায় নবী-রাসুলদের পাশাপাশি ইমাম হোসেইন (আ:)-র প্রতি সালাম পেশ করে থাকি।
রাসুলের ওফাতের দীর্ঘ ২৫ বছর পর হযরত আলী (আ:) যখন খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ইমাম হোসেইন (আ:) স্বনামধন্য টগবগে আদর্শ এক যুবক এবং জ্ঞান,ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার কারণে সবার কাছে পরিচিত এক নাম। যেমন যুদ্ধের ময়দানে তাকে দেখা যেতো তলোয়ার হাতে, তেমনি সামাজিক নানা কর্মকান্ডেও ইমাম হোসেইনের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। মুসলিম বিশ্বের নানা সংকটে মানুষ তাকে কাছে পেয়েছেন। নীতি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি সহায়তা করেছেন। তার জ্ঞান ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন সমাজের সকল বিশিষ্ট ব্যক্তিই ইমাম হোসেইনকে সম্মান করতেন। দানশীলদের কথা উঠলেই ইমাম হোসেইন (আ:)-র নাম উচ্চারিত হতো সবার মুখে। একদিন এক মরুবাসী মদিনায় প্রবেশ করে শহরবাসীর কাছে জিজ্ঞেস করল, এ শহরের সবচেয়ে দানশীল ব্যক্তি কে? উত্তরে সবাই ইমাম হোসেইন (আ:)-র নাম বলল। মরুবাসী ঐ ব্যক্তিটি ইমাম হোসেইনের কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি নামাজ পড়ছেন। নামাজ শেষ হবার পর ঐ ব্যক্তি ইমামের কাছে সাহায্যের আবেদন জানালেন। ইমাম হোসেইন(আ:) তাকে একটি কাপড়ে মুড়িয়ে চার হাজার দিনার দিলেন। সাহায্য প্রার্থী ঐ ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য পেয়ে বললেন, দানশীলদের মৃত্যু হয় না ও তারা হারিয়েও যায় না, তাদের স্থান উর্ধ্বাকাশে এবং তারা সব সময় সূর্য্যের ন্যায় জ্বাজ্জল্যমান।
ইমাম হোসেইন ছিলেন সর্বোত্তম গুণাবলীর অধিকারী । সৎ পথ নির্ধারণে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তৎকালীন সমাজের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সর্বোপরি সকল মানুষ ইমাম হোসেইন (আ:) ও তার বড় ভাই ইমাম হাসান (আ:)-কে সম্মান করতেন ও ভালোবাসতেন। এই সমাজের মানুষরাই একদিন ইমাম হোসেইনকে শহীদ করবে, এ কথা বললে সেদিন কেউই বিশ্বাস করতো না।
আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (আ:)-র শাহাদাতের পর ইমাম হোসেইন (আ:)-র জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ভাই ইমাম হাসানের পাশে জনকল্যাণমুলক কাজে ইমাম হোসেইন সর্বদা তৎপর ছিলেন। যখনই কেউ কোন সাহায্য চেয়েছেন, তিনি তার প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এভাবে তিনি গণমানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ইসলামের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেন। ইমাম হোসেইন (আ:)-র নাম এলেই তার রক্তাক্ত আশুরা বিপ্লবের ইতিহাস স্মৃতিপটে ভেসে উঠে। তিনি অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন এবং নিজের জীবন দিয়ে সত্য ও মিথ্যাকে পার্থক্য করার উপায় বাতলে দিয়েছেন। রাসুলে খোদা (সা:) ইমাম হোসেইন (আ:) সম্পর্কে বলেছেন, মুমিনদের মনে হোসেইনের স্থান অতিউচ্চে, বেহেশতের দরজাগুলোর একটি হচ্ছে হোসেইন ; আল্লাহর কসম জমিনের চেয়ে আসমানে হোসেইনের মহত্ত্বের গুণকীর্তন হবে বেশী এবং তিনি জমিন ও আসমানের অলংকার।
রাসুলে আকরাম (সা:)-র ওফাতের ৫০ বছর পর যখন ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে মানুষ সরে যেতে শুরু করেছিল এবং স্বার্থপরতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছিল, ঠিক সে সময় ইমাম হোসেইন (আ:) সত্যের পথে আত্মত্যাগের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি কারবালার ময়দানে জীবন দিয়ে ভন্ডদের মুখোশ উন্মোচন করেন এবং তার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ইসলাম পুণরুজ্জীবন লাভ করে। ইমাম হোসেইন (আ:) অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। তিনি বলেছেন, উত্তম জীবনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো, স্বাধীনতা, সম্মান-মর্যাদা, ন্যায়পরায়তা ও উৎকর্ষতা ; এসব গুণাবলীই মানুষকে চিরঞ্জীবী করে তোলে।
পাঠক ! অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে আমরাও সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করব, ইমাম হোসেইন (আ:)-র শুভ জন্মবার্ষিকীতে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
সূত্রঃ ইন্টারনেট
 

নতুন কমেন্ট যুক্ত করুন