হানবী (সাঃ) এবং ইমাম জাফর সাদেকের (আ) জন্মদিন ’

হানবী (সাঃ) এবং ইমাম জাফর সাদেকের (আ) জন্মদিন ’

মহানবী (সাঃ) এবং ইমাম জাফর সাদেকের (আ) জন্মদিন ’
পাঠক ! দিন-তারিখের মতানৈক্য পেরিয়ে যে সত্যটি বিশ্বজনীন তা হলো রাসূলের (সা) জন্মদিন একটি পবিত্র দিন। শুভ দিন। আনন্দের দিন। দিনটি রবিউল আউয়ালের বারো হোক কিংবা সতেরো-বিশ্ব মানবতার অনন্য দিশারী হযরত রাসূলে কারীম (সা) মানব মুক্তির শুভ বার্তা নিয়ে পূত পদভার রেখেছিলেন পাপ-পঙ্কিলতায় পূর্ণ এই পৃথিবীর বুকে। গভীর অমানিশায় ক্ষুদ্র তারাটিকেও যেমন সুদূর পৃথিবী থেকে জ্বলজ্বলে দেখায় , তারচেয়েও গভীর উজ্জ্বলতা নিয়ে তিনি এসেছিলেন পৃথিবীতে। তাঁর শুভ আগমনে তাই আঁধার পৃথিবীর সর্বত্র সাড়া পড়ে যায়। চারদিক যেন আনন্দ-উল্লাস আর প্রশান্তির আমজে ভরে ওঠে। পাখি ডাকে , বায়ু বয় , নানা ফুল ফুটে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি হয় বিশ্বময়। তাঁর আগমনে সুষুপ্ত মৃত জনপদ জেগে ওঠে। জেগে ওঠে শতাব্দী ঘুমের পাড়া। আহা ! কী সুন্দর , কী চমৎকার আলোর ঐশ্বর্য নিয়ে ঐ তো ছন্দে ছন্দে দোলে মা আমেনার কোল জুড়ে। দোলে , যেন মধুপূর্ণিমার এক শুভ্র চাঁদ।

তুমি এলে......................
বিশ্ব পেল এক অপূর্ব শৃঙ্খলা
কবিতায় তার কতোটা যায় বলা
যেখানে যা ছিল কালো অনিয়ম-জঞ্জাল
যেন আঁধার পেরিয়ে এলো শুভ্র সকাল
তুমি এলে...................
কালের যতো ক্ষত , যতো ক্লেদ , যতো পীড়ন
ধুয়ে মুছে যেন নীলাকাশে মেঘমুক্ত সূর্যের কিরণ
মরুভূর বুকে ক্লান্ত পথিক পেল শীতল ছায়ার মেঘ
শোষিতের মুখে হাঁসি,বিশ্বজুড়ে আনন্দের অভিষেক
তুমি এলে...................
আমরা পেলাম জন্মের স্বার্থকতা খুঁজে
আপন ঠিকানায় এখন যেতে পারি চোখ বুঁজে
এতোদিন ছিল অজানা , ছিল না পথের কোনো দেখা
তুমি এলে , বুকের ভেতরে এখন পথের চিত্র লেখা।*

ফুল ফোটে , গন্ধ বিলায় , একটা সময় ঝরে যায়। মানুষ ঝরা ফুলের স্মৃতি ধরে রাখে সারাজীবন আতর-গোলাবে। রাসুল (সা)ও তেমনি পৃথিবীর বুকে সুগন্ধি ছড়িয়ে দিয়ে চলে গেছেন পরপারে। রেখে গেছেন তাঁর জীবনস্মৃতি , রেখে গেছেন আদর্শের সৌরভ জ্বলজ্বলে। এ যেন অনন্ত প্রেসক্রিপশন বা প্রতিকারপত্র। মানবতার সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে এতে। যখনি মানুষ উপনীত হয় কোনো অসঙ্গতির মুখে , তখনি তার প্রয়োজন পড়ে। আর এই প্রতিকারপত্র সঠিকভাবে দিতে পারেন যাঁরা , তাঁরা হলেন রাসূলেরই আহলে বাইত বা নবীবংশের নিষ্পাপ ইমামগণ। সুখের বিষয় আজ তেমনি এক ইমাম হযরত জাফর সাদেক (আ) এর শুভ জন্মবার্ষিকী। চলুন এই শুভ দিনে তাঁরি পবিত্র জীবনকথার প্রতি খানিকটা মনোযোগী হওয়া যাক।
ইমাম সাদেক (আ) তিরাশি হিজরীর সতেরোই রবিউল আউয়ালের সকালে পৃথিবীকে আলোকিত করে জন্মলাভ করেন। ইমাম পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তিনি ইমাম সাজ্জাদ (আ) এবং ইমাম বাকের (আ) এর অশ্রুসিক্ত চোখকে আপন আলোয় আলোকিত করেন। তিনি তাঁর মায়ের পবিত্র সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন। মায়ের সাহচর্যেই তাঁর শারীরিক এবং আত্মিক বিকাশ ঘটে। ছোটবেলায় শিশুরা সার্বিক ব্যাপারেই যদি উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না পায় , তাহলে তারা বেপথু হয়ে যেতে পারে। আমাদের ইমাম সাদেক (আ) ছোটবেলায় প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন নবীবংশেরই আরো দু'জন মহান ইমামের কাছে। এঁদের একজন হলেন পিতা ইমাম বাকের (আ) এবং অপরজন হলেন দাদা ইমাম যেয়নুল আবেদীন (আ)। সাদেক (আ) তাঁর দাদার ইমামতির দশটি বছর দেখার সুযোগ পান। তাঁর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা থেকে ইমাম সাদেক অনেক কিছু অর্জন করেন। তাঁর পিতা যখন ইমামতির দায়িত্ব পান তখন তাঁর বয়স বারো বৎসর। ফলে পিতার কাছ থেকেও তিনি সার্বিক জ্ঞান লাভের সুযোগ পান। ১১৪ হিজরীতে ইমামতের গুরুদায়িত্ব বাকের (আ) এর কাঁধে আরোপিত হয়।
অনন্য চরিত্র ও নৈতিকতার অধিকারী ইমাম সাদেক (আ) ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী , বিচক্ষণ ও মহাজ্ঞানী। তাঁর সমকালীন বিশ্বে তিনি ছিলেন জ্ঞানের দিক থেকে শীর্ষস্থানীয়। কায়েমী স্বার্থবাদীদের পক্ষ থেকে বিচিত্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ইমামতির দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করেন। তাঁর জ্ঞান যেমন মুসলমানদের জন্যে এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে আছে , তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বহু ঘটনাবলীও অনুরাগীদের প্রেরণা জোগায়। তাঁর জীবনের ছোট্ট একটি ঘটনা আপনাদের জন্যে উপস্থাপন করছি।
ইমাম জাফর সাদেক (আ) আল্লাহ প্রদত্ত সকল দায়-দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে কর্মপ্রচেষ্টাতেও কোনোরকম অবহেলা করতেন না। শিবানীর একটি ভাষ্য এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন , একদিন কাজের খোঁজে মদীনার বাইরে গিয়ে দেখি ইমাম সাদেক (আ) ক্ষেতে কাজ করছেন। এ দৃশ্য দেখে আমার অন্তর কেঁদে উঠলো। আমি হযরতের কাছে গিয়ে বললাম-হুজুর ! বেলচাটা আমার কাছে দিন , আমি আপনাকে সাহায্য করি ! ইমাম মাথা নেড়ে আমার আবেদন নাকচ করে দিয়ে বললেন-জীবনযাপন তথা রুটিরুজির প্রয়োজনে খররৌদ্র উপেক্ষা করে কাজ করাকে পছন্দ করি। অন্য এক ব্যক্তি ইমাম সাদেক (আ) কে কাজ করতে দেখে আপত্তি করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্যে ইমাম বললেন-আমি রিযিকের সন্ধানে ঘর থেকে বাইরে এসে কাজ করছি যাতে তোমাদের কাছে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির উদাহরণে পরিণত হতে না হয়।
ইমাম সাদেক (আ) এর এক সঙ্গীর নাম হলো মুয়াল্লি এবনে খুনাইস। তিনি বলেন-একরাতে ইমাম তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে বনী সায়দার দিকে যাচ্ছিলেন। আমিও ইমামের পেছনে পেছনে গেলাম। মাঝপথে ইমামের হাত থেকে কী যেন মাটিতে পড়লো। আমি তাঁর কাছে গিয়ে সালাম দিলাম এবং মাটি হাতড়ে বুঝতে পারলাম যে মাটিতে সামান্য রুটি পড়েছিল। রুটিগুলো তুলে ইমামের পিঠে ঝোলানো ব্যাগে রেখে দিলাম। এরপর ব্যাগটা আমার পিঠে নেওয়ার জন্যে ইমামের অনুমতি চাইলাম , তিনি রাজী হলেন না। তবে তিনি যেখানে যাচ্ছিলেন , সেখানে তাঁর সাথে যাবার অনুমতি দিলেন। যখন আমরা বনী সায়দায় গিয়ে পৌঁছলাম , দেখলাম বেশ কিছু অভাবগ্রস্ত লোক সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছে। ইমাম তাদের পোশাকের ভেতর টুকরো টুকরো রুটি রেখে দিয়ে অন্যত্র গেলেন। আমি ইমামের কাছে জানতে চাইলাম-হে রাসূলের সন্তান ! এরা কি আপনার অনুসারী ! জবাবে ইমাম বললেন-যদি তাই হতো তাহলে তাদেরকে আমাদের সম্পদেরও অংশীদার করতাম।
পাঠক ! তাঁর এই ঔদার্য , তাঁর এই কর্মতৎপরতা আর দানশীলতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। শিক্ষা নিতে হবে তাঁর প্রদর্শিত নীতিমালা থেকেও। তাঁর কর্মময় দীর্ঘ জীবন পর্যালোচনা করে বের করতে হবে বিচিত্র সমাধান,তবেই সার্থক হবে তাঁর জন্মবার্ষিকী উদযাপন। বিদায় নেবার আগে ইমামের জ্ঞান-দীপ্ত কটি বাণী শোনাচ্ছি। ইমাম বলেছেন-
*দুনিয়াপ্রীতি দুঃখ-বেদনার উৎস,আর পরহেজগারী শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তির উৎস।
*বিশ বছরের বন্ধুত্ব আত্মীয়তার পর্যায়ভুক্ত।
*আমার সবচে প্রিয় বন্ধু এবং ভাই হলো সে-ই , যে আমার ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়।
*হারাম বস্তু খাওয়ার ফলে আয়-রোজগার কমে যায় এবং জীবনকে অভাব-দারিদ্র্য আর বদমেজাজ উপহার দেয়।
সূত্রঃ ইন্টারনেট