নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক আসর

ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক আসর মালঞ্চে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। এ আসরে আমরা আপনাদের নিয়ে যাবো নাহজুল বালাগার সুগন্ধি উদ্যানে। সেখানে বিচিত্র ফুলের ঘ্রাণে ভরে যাবে আপনার হৃদয়মন। মুগ

নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক আসর
মালঞ্চ-১
ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক আসর মালঞ্চে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। এ আসরে আমরা আপনাদের নিয়ে যাবো নাহজুল বালাগার সুগন্ধি উদ্যানে। সেখানে বিচিত্র ফুলের ঘ্রাণে ভরে যাবে আপনার হৃদয়মন। মুগ্ধ হয়ে উঠবেন বক্তব্যের গভীরতায় আর ভাষাভঙ্গির ওজস্বিতায়। কারণ এই বক্তব্য,এই চিন্তা-চেতনা এমন একজন মহান নজির বিহীন ও পূত-পবিত্র ব্যক্তিত্বের,যাঁর অন্তর ছিল সবসময় খোদায়ী প্রেম তথা মারেফাতের আলোয় আলোকিত।তাই চৌদ্দটি শতাব্দি পেরিয়ে যাবার পর আজো নাহজুল বালাগার চমৎকৃতি আর অনিন্দ্য সৌন্দর্যে বর্তমান পৃথিবীর মানুষ মুগ্ধ।
মিশরের সাবেক মুফতি শায়খ মোঃ আবদুহ স্বদেশের বাইরে গিয়ে নাহজুল বালাগার সাথে পরিচিত হন। নাহজুল বালাগায় বিষয়গত যে বৈচিত্র্য রয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই গ্রন্থটি পড়ে যেভাবে পরিতৃপ্তি লাভ করেন,তা দেখে তিনি কেবলই বিস্মিত হন। এই বিস্ময় তাঁর ভেতর একটা বোধ ও উপলব্ধি জাগিয়ে দেয়,তাহলো তিনি অত্যন্ত মূল্যবান একটি সম্পদ বা রতœভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছেন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ নাহজুল বালাগার একটি সংস্করণ ছাপার উদ্যোগ নেন যাতে বিখ্যাত এই গ্রন্থটির সাথে বিশ্ববাসীর পরিচয় ঘটে। তিনি বলেন-আরবি ভাষী জনগোষ্ঠির মাঝে এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি মনে করেন না যে, কোরআন এবং হাদিসের পর সবচে অভিজাত,অলংকার সমৃদ্ধ,অর্থবহ এবং পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য হলো হযরত আলী (আঃ) এর বক্তব্য।
কায়রো ইউনিভার্সিটির স্টাডিজ (উলুম) অনুষদের প্রধান আলী আল জানদি কবিতা ও আলী (আঃ) এর মণীষা নামক গ্রন্থে লিখেছেন,অনেকেই আছেন স্বল্পভাষণে বেশ প্রাজ্ঞ। আবার কেউ কেউ দীর্ঘ বক্তব্য প্রদানে অভ্যস্থ। আলী (আঃ) উভয় ক্ষেত্রেই ছিলেন ভীষণ পারদর্শী ও অগ্রবর্তী। যেমনটি সর্বপ্রকার ফযিলতের ক্ষেত্রেও সবার উপরে। হাজার বছর আগে আলী (আঃ) এর কথামালার বাইরেও তাঁর খুতবা বা ভাষণগুলো, চিঠিগুলো, দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি গুলোকে যিনি একত্রিত করে নাহজুল বালাগা নামে সংকলিত করেছেন,সেই মহান সংকলক সাইয়্যেদ রাজি বলেন-আলী (আঃ) এর ব্যাপারে বিস্ময় হলো পরহেজগারী,জাগৃতি ও সচেতন হবার জন্যে তিনি যেসব বক্তব্য রেখেছেন, মানুষ সেসব শুনে গভীরভাবে চিন্তা করতো যে যিনি এই ধরনের বক্তব্য রাখেন তিনি পার্থিব সম্পদ চিন্তা থেকে দূরে থাকা এবং পরহেজগারীর বাইরে আর কিছুই চেনেন না।
ইমাম আলী (আঃ) এর বক্তব্য ছিল অবিশ্বাস্যরকম প্রভাব বিস্তারকারী। সমাজে তিনি ছিলেন এক মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। আবার যুদ্ধের ময়দানেও তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর আন্তরিক সাহস ও প্রেরণা সৃষ্টিকারী। অকুতোভয় বীরত্বের সাথে তিনি শত্র"দের ভুপাতিত করতেন। আবার তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ একজন পরহেজগার এবং শ্রেষ্ঠ একজন আবেদ বা প্রার্থনাকারী। নিঃসন্দেহে হযরত আলী (আঃ) এর বক্তব্যগুলো ছিল তাঁর অগাধ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত। রাসূলে খোদা (সা) সবসময় তাঁর বক্তব্যে ইমাম আলী (আঃ) এর এই বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির কথা উল্লেখ করতেন। সেইসাথে নবীজী বলতেন জনগণ যেন আলী (আঃ) এর এই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ঝর্ণাধারাকে নিজেদের কাজে লাগিয়ে উপকৃত হয়। নবীজী বলেছেন- انا مدينه العلم و علي بابها অর্থাৎ আমি হলাম জ্ঞানের নগরী আর আলী হলো সেই নগরীর দরোজা।
আমরা বরং আলী (আঃ) এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে জানতে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য শোনার চেষ্টা করি। একদিন আলী (আঃ) এর একজন সঙ্গী চেয়েছিল কিছু বলতে। পারলোনা, বরং সে তোতলাতে শুরু করলো। হযরত আলী (আঃ) তখন বললেন-জবান হলো মানুষের একটা অঙ্গ এবং তা তার ধী-শক্তি,স্মরণশক্তির অন্তর্গত। এগুলো যদি কাজ না করে তাহলে বাকশক্তি কোনো কাজই করতে পারে না। তবে স্মৃতিশক্তি যদি খুলে যায় তাহলে বাক-প্রত্যঙ্গও উন্মোচিত হয়। এরপর আলী (আঃ) বলেন,আমরা হলাম কথার সৈনিকদের কমান্ডার। আমাদের মাঝে কথার বৃক্ষ শেকড় গজায় আর মাথার ওপরে ঝোলে তার শাখা-প্রশাখা,পত্র-পল্লব।
পাঠক! আগামী আসরে আমরা ইবাদাত বিষয়ে নাহজুল বালাগায় বর্ণিত বিভিন্ন বক্তব্য ও কথামালা নিয়ে খানিকটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো। তো আজকের আসর থেকে বিদায় নেবো ইমাম আলী (আঃ) এর একটি বাণী শুনিয়ে। তিনি বলেছেন-কারো গোলামি করো না,কেননা আল্লাহ তোমাকে স্বাধীনতা ও আযাদি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।

মালঞ্চ-২
অলি-আউলিয়াগণ আল্লাহর সাথে ব্যাপক সম্পর্কের দৃঢ়তায় এতোদূর অগ্রসর হয়ে যান যে সাধারণ মানুষ তাঁদের অস্তিত্বের ফযিলতের গভীরতায় পৌঁছুতে পারেন না। ইমাম আলী (আঃ) আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী তেমনি একজন মহান অলি। গত আসরে আমরা এ সম্পর্কে খানিকটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি আপনাদের। এ-ও বলেছি যে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যগুলোর একটি সংকলন করা হয়েছে নাহজুল বালাগা নামে। এটি একটি স্বচ্ছ-নির্মল ঝর্ণাধারার মতো যার সাহায্যে তাঁকে যেমন ভালোভাবে চেনা যাবে তেমনি আল্লাহকে চেনার উপায়গুলো সম্পর্কে জানা যাবে। তো চলুন,আমরা বরং সরাসরি আলোচনা শুরু করি।
নাহজুল বালাগায় চিত্তাকর্ষক যেসব বিষয় রয়েছে, ইবাদাত এবং আল্লাহর জিকির তার মধ্যে অন্যতম। ইবাদাত সম্পর্কে মানুষের মাঝে যেসব দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায় তা অভিন্ন নয়। কেউ কেউ ইবাদাত সম্পর্কে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন এবং কেবল এক ধরনের দায়িত্ব হিসেবে পালন করেন। আবার অনেকেই ইবাদাতকে দেখেন আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই নাহজুল বালাগায় লক্ষ্য করা যাবে। ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে ইবাদাত হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তির সিঁড়ি এবং আল্লাহকে সাধ্যমতো চেনার আন্তরিক প্রয়াস।অন্যভাবে বলা যেতে পারে,বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহর প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো ইবাদাত। আলী (আঃ) ইবাদাতের আত্মা বলতে আল্লাহকে স্মরণ করাকেই বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন- আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর জিকিরকে অন্তরের মরীচা দূর করার উৎসের সাথে তুলনা দিয়ে বলেছেন এর মাধ্যমে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং আনুগত্য লাভ করে। এরকম সবসময়ই ছিল এবং আছে যে,আল্লাহ কালের সর্বযুগেই এমনকি যেসময় নভী-রাসূলগণ ছিলেন না তখনো এমন কিছু বান্দার অস্তিত্ব রেখে দিয়েছেন এবং এখনো রক্ষা করছেন যাঁদের সাথে তিনি তাঁর অনেক রহস্য নিয়ে কথা বলেন এবং তাদের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী আল্লাহ তাঁদের সাথে কথা বলেন। আলী (আঃ) এ ধরনের ইবাদাতকারীদের অবস্থান সম্পর্কে বলেন-ফেরেশতারা তাঁদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের ওপর শান্তির ছায়া নেমে এসেছে। তাঁদের জন্যে আকাশের দ্বারগুলো উন্মুক্ত হয়ে গেছে। তাঁদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের শেষ নেই। আল্লাহর বন্দেগি করার মাধ্যমে তাঁরা আল্লাহর দরবারে অনেক উচ্চ মর্যাদা ও অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। তাঁদের কর্মকাণ্ড তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আল্লাহর পছন্দনীয় বলেই প্রশংসনীয় হয়েছে। যাঁরা এভাবে আল্লাহকে ডাকেন,তাঁরা আল্লাহর ক্ষমা ও মাগফেরাতের সুগন্ধি অনুভব করেন এবং গুনাহের কৃষ্ণ পর্দা অপসারণকে অনুভব করেন।

ইসলামে ইবাদাত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সমান্তরাল। আর ইবাদাত বিষয়টাই ইসলামে সমষ্টিগত, ব্যক্তিগত নয়। অর্থাৎ সবাই মিলে একত্রিত হয়ে এই ইবাদাত পালনের বিধান রয়েছে ইসলামে। এতে ব্যাপক সামাজিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে পালনীয় ইবাদাত যে নেই তা নয়। তবে সেগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা পালনের মাধ্যমে ব্যক্তি তাঁর জীবনের করণীয় কর্মের অংশের সাথে পরিচিত হয়। যেমন নামায। নামায হলো ইবাদাতের পরিপূর্ণ বাহ্যিক প্রকাশ। নামায আদায়ের মাধ্যমে নৈতিক এবং সামাজিক বহু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ব্যাপারে ইবাদাতকারী সচেতন হয়। সেইসাথে মানুষ পবিত্রতা,অন্যদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন,সময় জ্ঞান,দিক নির্ণয়,আল্লাহর যথার্থ বান্দাদের সাথে বন্ধুত্ব সৃষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন হয়। ইসলামের সবচেয়ে বড়ো দিকটি হলো,অন্যদের ভালো ও উত্তম কাজগুলোকেও ইসলাম ইবাদাত বলে গণ্য করে।

আলী (আঃ) ইবাদাতকে খুবই উপভোগ্য বলে মনে করেন। দুনিয়াবি মজার সাথে যার তুলনা হয় না। ইবাদাতটা উৎসাহ ও উদ্দীপনাময়। তাঁর দৃষ্টিতে তিনিই সৌভাগ্যবান ইবাদাতের প্রাণবায়ু যাঁকে স্নেহের পরশ বুলিয়ে যায়। যিনি তাঁর সকল প্রকার অভাব-অভিযোগ,চাওয়া-পাওয়ায় আল্লাহর শরণাপন্ন হন। তিনিই সৌভাগ্যবান যিনি আলোকিত ভুবনে প্রবেশ করেন এবং সকলপ্রকার দুৎখ-বেদনা থেকে যিনি মুক্ত,সেইসাথে যিনি পরিপূর্ণ স্বচ্ছ,নির্মল ও আন্তরিক। এ ব্যাপারে নাহজুল বালাগা থেকেই বরং সরাসরি আলী (আঃ) এর বক্তব্য শোনা যাক।
কী সৌভাগ্যবান তিনি, যিনি আল্লাহ প্রদত্ত কর্তব্যগুলো পালন করেন। আল্লাহ তাঁর সাহায্যকারী। আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ফলে তাঁর কষ্ট ও অশান্তিগুলো যাঁতাকলের মতো পিষে গুঁড়ো হয়ে যায়। তিনি রাতের বেলা নিদ্রা থেকে দূরে থাকেন এবং রাত জাগেন। এঁরা হলো সেই দলভুক্ত যাঁরা প্রত্যাবর্তন দিবসের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন এবং যাঁদের চোখ থেকে ঘুম অপহৃত হয়েছে,যাঁরা নিজেদের ঘুমের ঘর থেকে উঠে আল্লাহর জিকিরে মশগুল হয়ে পড়েন। এঁরা আল্লাহর দলভুক্ত এবং পরিত্রাণপ্রাপ্ত। #
মালঞ্চ-৩
পাঠক! ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আলী (আঃ)এর বাণী কোরআনের পর সবচেয়ে অলংকারপূর্ণ ভাষার নিদর্শন। মানব সভ্যতা ও ঐতিহ্যে আলী (আঃ) এর সাহিত্য যুগ যুগ ধরে ছিল,আছে এবং থাকবে। আলী (আঃ) যে কতোটা জ্ঞানী ছিলেন,কতোটা ওজস্বী ভাষার অধিকারী ছিলেন,কতো দূরদর্শী এবং সূক্ষ্মদর্শী মনীষী ছিলেন-বর্তমান সংঘাতবহুল বিশ্বে তাঁর বক্তব্যগুলোর যথার্থতা চিন্তা করে বিশ্বের সকল জ্ঞানী-গুণীই তাঁকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে।
এই কথাগুলো জর্জ জারদাক নামক একজন খ্রিষ্টান লেখকের। তিনি আলী (আঃ) এর জীবনী,তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর বাণী বা বক্তব্যগুলো ভালো করে পড়ে বলেছেন-বর্তমান বিশ্বের মানুষের সকল সংকট থেকে মুক্তি পাবার উপায় হলো তাঁর সাহিত্যগুলো অধ্যয়ন করা। আজকের আসরে আমরা আলী (আঃ) এর তেমনি কিছু বাণী নিয়ে কথা বলবো।
মানুষ এবং তার সৃষ্টি কৌশলকে আলী (আঃ) গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে নিয়েছেন। তিনি ৮৩ নম্বর বক্তৃতার একাংশে মানব সৃষ্টির পর্যায়গুলোকে বর্ণনা করেছেন। মানুষের যেসব বিষয়ে অবশ্যই জানা দরকার সেসব সম্পর্কে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জটিল পর্দাময় অন্ধকার জরায়ুতে। সে ছিলো বীর্যের মধ্যে,তারপর হলো তরল বস্তুর পিণ্ড। তারপর ভ্রুণ বা জীবনের সূত্রপাত। এরপর পেটের ভেতর তৈরী হলো শিশু। তারপর দুগ্ধপায়ী শিশু এবং অবশেষে দেওয়া হলো হৃদয়,দেখার জন্যে চোখ,বলার জন্যে জিহ্বা। এসব দেওয়া হয়েছে এজন্যে যে যাতে ঐ শিশু নবীন যুবকের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে বুঝতে শেখে,জানতে শেখে এবং খোদার নাফরমানির পথে পা না বাড়ায়।
এগুলো হচ্ছে মানব জীবনের প্রাথমিক পর্যায়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত। মানুষের আভ্যন্তরীণ দিকগুলো সম্পর্কে জ্ঞানী হযরত আলী (আঃ) একথাগুলো বলে অপরাপর প্রাণীকূলের সাথে মানুষের পার্থক্যটা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে,আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে শেখার মতো একটি অন্তর দিয়ে সৃষ্টি করেছেন,তাকে বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন,চৈতন্য দান করেছেন। কারণটা হলো সে যেন বিচ্যুতির পথে না যায়। আলী (আঃ) মানুষের জীবনের অতি স্পর্শকাতর সময় যৌবনকালের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন,এই সময়টা এমন যে মানুষের ভেতরে যদি সচেতনতা না থাকে তাহলে মারাত্মক ভুলের সম্মুখীন হবে।
এটা খুবই স্বাভাবিক যে একজন যুবক এই বয়সে তার মনের ইচ্ছাগুলোকে মেটানোর পেছনে লেগে থাকে,আমোদ-ফূর্তি করে বেড়ায় এবং এই বয়সে সে বহু কাজ করার ক্ষমতাও রাখে। কিন্তু যথেষ্ট জ্ঞান নেই। সেজন্যে জীবনটাকে নিরর্থকভাবে হেলায় কাটিয়ে দেয়। এ সম্পর্কে ইমাম আলী (আঃ) বলেছেন,সে বিশ্বাস করতে চায় না যে ব্যর্থ হবে। গুনাহ করার ক্ষেত্রে তার মাঝে কোনোরকম ভয়ভীতি কাজ করে না। এভাবে ত্রুটি-বিচ্যুতির মাঝে সে কিছু সময় কাটায়। আল্লাহ যেসব নিয়ামত তাকে দিয়েছে সেগুলোকে কোনো কাজে লাগায় না।
তারপর আলী (আঃ) যৌবনকাল সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তুলে বলেন-যৌবন আল্লাহ দান করেছেন এবং মানুষ বার্ধক্যের দুর্বলতার মুখোমুখি হয়। তখন সে বহু কিছু বুঝতে শেখে। যৌবন কী জিনিস ছিল তা সে বার্ধক্যে গিয়ে উপলব্ধি করে। কিন্তু তখন তো তার সক্ষমতা বা শক্তি হ্রাস পায়। হযরত আলী (আঃ) বলেন-যৌবনের সর্বশেষ পর্যায়ে এবং সাফল্যের সর্বশেষ স্তরে মৃত্যুর যন্ত্রণা এসে তাকে গ্রাস করে। এই যন্ত্রণার ফলে সে দিনগুলোকে কাটায় দিশেহারা অবস্থায় আর রাতগুলোকে কাটায় নিদ্রাহীন উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। প্রতিটা দিনই তার ভীষণ কষ্টে কাটে আর রাত কাটে দুশ্চিন্তা এবং রোগ-ব্যাধিতে। মৃত্যু ভয় এবং যন্ত্রণা তখন তাকে কাঁদতে বাধ্য করে। ইমাম আলী (আঃ) এরপর মানুষকে তার পরবর্তী জীবনের কথা ইঙ্গিতে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন-মানুষ যখন তার ইচ্ছার বাইরে অন্যদের মাধ্যমে কবরে শায়িত হয় এবং তারপর কেউ যখন তাকে আর দেখতে না পায়,তখন জীবনটাকে অন্যায় বা অবৈধভাবে কাটানোর কারণে জাহান্নামের আগুণে তাকে তো পুড়তে হয়-সেই আগুণে পোড়ার কষ্টের চেয়ে অধিক কষ্টকর আর কি কিছু আছে ?
এভাবে আলী (আঃ) সবার অভিন্ন পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু সবার মৃত্যু কেন একরকম নয় সে ব্যাপারে তিনি বলেন-যারা তাদের জীবনটাকে পশুর মতো কেবল ভোগ-বিলাসেই কাটিয়েছে,নিজের চিন্তাশক্তি বা বিবেককে যথার্থপথে কাজে লাগায় নি। তার মৃত্যু কষ্টকর তো হবেই। আবার যিনি তাঁর ছোট্ট জীবনটাকে সচেতনভাবে সৎ পথে ব্যয় করেছে, মৃত্যু তার জন্যে সৌভাগ্য বয়ে আনে। আলী (আঃ) তাঁর বক্তব্যের সমাপ্তিতে সকল জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ
হে আল্লাহর বান্দাগণ! কোথায় তারা! যারা দীর্ঘ জীবন যাপন করেছে এবং হাসি-উল্লাসে জীবন কাটিয়েছে ? যাদেরকে আল্লাহ দীর্ঘ জীবন দিয়েছেন অথচ তারা জীবনটাকে অর্থহীনভাবে কাটিয়েছে। কোথায় তারা যাদেরকে কঠিন শাস্তির ব্যাপারে জানানো হয়েছে এবং আল্লাহর নিয়ামতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ? হে আল্লাহর বান্দাগণ! যতোক্ষণ তোমার দেহে প্রাণ আছে ততোক্ষণ এই সুযোগকে গণীমত বলে মনে করো। যেসব অন্যায় তোমাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় সেগুলো থেকে দূরে থাকো এবং যে সমস্ত নোংরামির ফলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সেগুলো থেকে পালিয়ে বাঁচো!
মালঞ্চ-৪
ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। বিশিষ্ট মুসলিম চিন্তাবিদ আল্লামা শামসুদ্দিন হানাফি বলেছেন,আলীর বক্তব্য পূত-পবিত্র এবং সততাপূর্ণ। তিনি প্রজ্ঞাময় কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের জন্যে আল্লাহ তাঁকে সম্মান এবং মর্যাদা দান করেছেন। আলীর বক্তব্য যারই কানে পৌঁছে সে-ই বিস্মিত হয় এবং প্রত্যেক বক্তাকেই আলীর প্রতি বিনয়ী ও বিনম্র করে তোলে। আলীর বক্তব্যের কাছে নিজেদের অগ্রগামিতা যেন অপহৃত হয়ে যায়।
পাঠক ! আজকের আসরে আমরা ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে এই বিশ্ব নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
সুন্দর এই বিশ্বজগত আল্লাহর বিচিত্র নিয়ামতে পূর্ণ। মানুষ এইসব নিয়ামত থেকে উপকৃত হয়। আমরা যদি একটু মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে,এই বিশ্বকে ঘিরে মানুষের রয়েছে বিচিত্র আশা-আকাঙ্ক্ষা,চাওয়া-পাওয়া এককথায় ব্যাপক আকর্ষণ। মানুষের ব্যাপক গবেষণার ফলে বিশ্বের সূক্ষ্ম অণূ-পরমাণু আবি®কৃত হয়েছে। এইসব গবেষণায় পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিতে যে অবিশ্বাস্যরকম শৃঙ্খলা লক্ষ্য করা গেছে তা থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে বিশ্ব নিরর্থক সৃষ্টি করা হয় নি। আর মানুষকেও খামোখাই পৃথিবীতে পাঠানো হয় নি।
আলী (আঃ) বিশ্ব এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আল্লাহর নিদর্শন বলে মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করেন,পৃথিবীর সকল কিছুই মানুষের উপকারে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং মানুষের উচিত প্রকৃতির যথার্থ ব্যবহার করা। আল্লাহর অলি-আউলিয়া বা ধর্মীয় মনীষীগণও প্রাকৃতিক সম্পত তথা আল্লাহর নিয়ামতগুলোকে সৎ ও সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। হযরত আলী (আঃ) চেষ্টা করেছেন পুকুর থেকে পানি তুলে খেজুর বাগান তৈরি করতে যাতে মানুষ সেগুলো থেকে উপকৃত হতে পারে। পৃথিবীর সাথে মানুষের সম্পর্ককে আলী (আঃ) তুলনা করেছেন একজন ব্যবসায়ীর সাথে বাজারের সম্পর্ক কিংবা একজন কৃষক এবং কৃষিক্ষেতের সম্পর্কের সাথে। একইভাবে যে ব্যক্তি এই পৃথিবীতে কাজ করবে আখেরাতে তার ফল সে পাবে। আলী (আঃ) এ বিষয়টি পুনরাবৃত্তি করে বলেন, পৃথিবী মানুষের সামনে দুটি বিপরীতমুখি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। প্রথমত এই পৃথিবী মানুষকে পরিত্রাণ দেয়। দ্বিতীয়ত পৃথিবী মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তেও নিয়ে যায়।
আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে পৃথিবীটা ঈমানদারদের জন্যে একটি উত্তম স্থান। তিনি মনে করেন দুনিয়া মানুষের জন্যে স্থায়ী কোনো বাসস্থান নয় বরং এটা মানুষের জন্যে একটা ক্রসিং-পয়েন্ট এবং পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে লাফ দেওয়ার মঞ্চ। তিনি বলেন-পৃথিবী তার জন্যে সরল-সত্য যে তাঁর বক্তব্যের ব্যাপারে বিশ্বস্ত। পৃথিবী তার জন্যে উপযুক্ত বাসস্থান যে এখান থেকে পারাপারের কড়ি সঞ্চয় করে। পৃথিবী হলো আল্লাহর বন্ধুদের জন্যে ইবাদাতের স্থান,ওহী নাযিলের স্থান এবং অনন্ত বেহেশত প্রত্যাশী বা আল্লাহর রহমত প্রার্থীদের জন্যে বিনিময় বা লেন-দেনের স্থান। তো,দুনিয়াকে তাহলে কে খারাপ বলতে পারে?
নাহজুল বালাগায় আলী (আঃ) এর এই দৃষ্টিভঙ্গি কথোপকথনের ভঙ্গিতে এসেছে। সেখানে এক ব্যক্তি দুনিয়াকে ধিক্কার দেয় আর আলী (আঃ) তাকে তার ভুল ধরিয়ে দেয়। কবি আত্তার এই বিষয়টিকে মুসিবাৎ নমেহ-তে কবিতার মতো করে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবেঃ
آن يكي در پيش شير دادگر
ذم دنيا كرد بسياري مگر
حيدرش گفتا كه دنيا نيست بد
بد تويي-زيرا كه دوري از خرد
ন্যায়পরায়ন সিংহ আলীর সামনে সে
পৃথিবীকে দিয়েছে ধিক্কার প্রচুর,তবে
তার হায়দার বলেন পৃথিবী নয় মন্দ
মন্দ তো তুমি, জ্ঞান থেকে দূরে অন্ধ

হযরত আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে যে ব্যক্তির ঈমান নেই তার জন্যে এই পৃথিবী ভয়াবহ এক নরক যা কেবল তার জন্যে ধ্বংসেরই দ্বার খুলে দেয়। এই সমস্যা এমন সময় দেখা দেয় যখন মানুষ পার্থিব এই জগতের মোহে পড়ে যায়। মানুষ যদি নিজের ব্যাপারে সতর্ক না হয় এবং এই বিশ্বজগত সম্পর্কে সচেতন না হয়,তাহলে পৃথিবীর সাথে তার সম্পর্ক ভিন্ন রূপ নেবে এবং ক্ষণিকের পথ চলার অঙ্গন এই বিশ্ব তার সামনে ভিন্ন লক্ষ্য তৈরি করবে। এরকম অবস্থায় একজন মানুষ পৃথিবীর মোহজালে আটকা পড়ে যায়। এই মোহ মানব উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। একেই বলে দুনিয়াপূজা,যার বিরুদ্ধে ইসলাম সংগ্রাম করতে বলে। আলী (আঃ) ও মানুষকে এ ব্যাপারে হুশিয়ার করে দিচ্ছেন। এ বিষয়ে পরবর্তী আসরে আরো কথা বলার চেষ্টা করবো।
মালঞ্চ-৫
পাঠক ! ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। নাহজুল বালাগা একটি সমুদ্রের মতো। সেখান থেকে যতোই নেওয়া হোক না কেন,কমবে না। আমরা বিশাল এই সমুদ্র থেকে বিন্দুর মতো খানিকটা আহরণের চেষ্টা করবো। গত আসরে পৃথিবীকে হযরত আলী (আঃ) কোন দৃষ্টিতে দেখেন সে সম্পর্কে কিছুটা কথা বলার চেষ্টা করেছি,আজকের আসরে আমরা ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে পৃথিবীর নেতিবাচক দিকটি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।
আলী (আঃ) পৃথিবীকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, উপরে ওঠার সিঁড়ি হলো পবিত্রতা,সততা ইত্যাদি গুণাবলি। কিন্তু যখনি তিনি পৃথিবীর অসুন্দর রূপ নিয়ে কথা বলেছেন তখনি মনে হয়েছে তিনি যেন এমন কোনো ঘৃণিত শত্র" সম্পর্কে কথা বলছেন যে কিনা মানুষকে সবসময় ধোকা দেয়। তিনি পৃথিবীকে এমন এক সাপের সাথে তুলনা দেন,যে সাপ দেখতে বেশ সুন্দর এবং নাদুস নুদুস অথচ তার দাঁতের নিচে আছে মারাত্মক বিষ। অন্যত্র তিনি বলেছেন-পৃথিবী তাঁর কাছে এমন একটা পাতার মতো অর্থহীন যার মুখে বসে আছে আস্ত এক ফড়িং কিংবা ছাগলের নাকের পানির মতোই তুচ্ছ। ঘৃণিত এই পৃথিবী এমন এক জগত,যে আল্লাহর কাছ থেকে মানুষেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং মানবিকতাকে ধ্বংস করে দেয়।
আলী (আঃ) এরকম পৃথিবীকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন-হে পৃথিবী! তোর ঘাড়ের লাগাম খুলে দিয়ে তোকে মুক্ত করে দিয়ে আমি তোর শক্ত বাঁধন থেকে মুক্ত হয়েছি। তোর বিচ্যুতির স্থান থেকে দূরত্ব খুঁজেছি। কোথায় তারা যাদেরকে নিয়ে তুই খেল-তামাশা করেছিস,কোথায় সেসব জাতি যাদেরকে তোর চাকচিক্যের চমক দিয়ে প্রতারিত করেছিস? আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাও! খোদার কসম!আমি তোর কাছে মাথানত করবো না যাতে আমাকে তুই লাঞ্ছিত করতে না পারিস,তোর বশীভূত আমি হবো না যাতে আমাকে তুই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারিস।
আলী (আঃ) এর মতে মানুষ যদি পৃথিবীর মোহে পড়ে যায় তাহলে সে তার উন্নত সকল মূল্যবোধকে হারাতে বসে। এ কারণেই তিনি পৃথিবীর নশ্বরতা নিয়ে বারবার কথা বলেছেন। হযরত আলী (আঃ) পৃথিবীকে কঠিন ঝড়ের সাথে তুলনা করেন,যেই ঝড় সমুদ্রের বুকের নৌকায় বসবাসকারীদেরকে মুহূর্তের মধ্যে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়,আবার কাউকে কাউকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে মারে, কেউবা ঢেউয়ের বুকে ডুবতে ডুবতে বেঁচে যায় এবং ভবঘুরে বানিয়ে ছেড়ে দেয়। আলী (আঃ) এরকম পৃথিবীর পূজা করা থেকে লোকজনকে বিরত রাখঅর জন্যে বলেন-হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করো।কেননা এই পৃথিবী তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে। তুমি তো সেই পথিকের মতো যে পথিক একটু পথ গিয়েই ভাবে পথের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। তারপরও তোমার চেষ্টার ক্ষান্তি নেই। অথচ এরিমাঝে হঠাৎ মৃত্যু এসে কড়া নাড়ে তোমার দরোজায়।
পৃথিবী সম্পর্কে মানুষকে এভাবে ভীতি প্রদর্শন করানোর পর ইমাম আলী (আঃ) আল্লাহর সকল বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দেন,তারা যেন সুস্বাস্থ্য এবং সময়-সুযোগকে গণীমৎ ভাবে এবং মৃত্যুর বাস্তবতাকে যথার্থভাবে মেনে নিয়ে অতীতের ভুল শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি বলেন-হে আল্লাহর বান্দাগণ! সাবধান হও! তোমার মুখে ভাষা থাকতে থাকতে,তোমার শরীর সুস্থ থাকতে থাকতে , শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো খেদমতের জন্যে প্রস্তুত থাকতে থাকতে এবং ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত থাকতে থাকতে সাবধান হও! সুযোগ এবং সামর্থ হারাবার আগেভাগেই হুশিয়ার হও! অনিবার্য মৃত্যুর দূত তোমার দরোজায় টোকা দেওয়ার আগে ভাগেই হুশিয়ার হও!
ইমাম আলী (আঃ) বোঝাতে চেয়েছেন যে শারিরীক সামর্থ থাকতে থাকতেই আল্লাহর ইবাদাত বন্দেগি বেশি বেশি করে নাও! যে-কোনো সময় মৃত্যু এসে যেতে পারে কিংবা বার্ধক্যের সময় ইচ্ছা থাকলেও ইবাদাত বন্দেগি যৌবনকালের মতো করা সম্ভব হয় না।
দুনিয়ার চাকচিক্য এমন যে এই মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্যে একটা শক্তির প্রয়োজন হয় যে শক্তি মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি করে। সেইসাথে এই শক্তি পৃথিবীকে নশ্বর হিসেবে সবসময় সামনে তুলে ধরে আর অবিনশ্বর পারলৌকিক জীবনের দিকে নিয়ে যায় এবং এভাবে নিজের সত্যিকারের সৌভাগ্য নিশ্চিত করে। ইমাম আলী (আঃ) পরহেজগারী এবং খোদাভীতিকেই এই শক্তি তথা মানুষের ভাগ্য নিয়ন্তা বলে বোঝাতে চেয়েছেন। যারা নিজেদেরকে আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে রজ্জুবদ্ধ করেছে এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টিজগতের বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হয়েছে তাদের ব্যাপারে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে-আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পরকালের শেষ বিচারের দিন কঠিন মুসবতের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সহযোগী হবেন। #
মালঞ্চ-৬
পাঠক ! ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা পৃথিবীর নেতিবাচক দিক সম্পর্কে আলী (আঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলাম। আশা করি আপনাদের মনে আছে। আজকের আসরে আমরা মানুষের জীবন শৃঙ্খলা সম্পর্কে ইমাম আলী (আঃ) এর উপদেশ বা দিক-নির্দেশনা তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
পৃথিবীতে মানুষের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো অব্যাহত কর্মচাঞ্চল্য, এটা মানুষের ব্যক্তিজীবনের অবশ্যম্ভাবী একটি প্রয়োজনীয়তা। ইমাম আলী (আঃ) মানুষের অস্তিত্বের স্বরূপ সম্পর্কে গভীরভাবে দৃষ্টি রাখেন। এক্ষেত্রে তিনি আরেকটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে মনে করেন। সেটা হলো মানুষের জীবনটাকে যথার্থ ও সঠিকভাবে যাপন করার জন্যে প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলা। যেই শৃঙ্খলা তাকে উন্নতি ও সৌভাগ্যের পথে নিয়ে যায়। হযরত আলী (আঃ) এর মতে মানুষের উচিত তার সময়ের একটা অংশ জীবনের কল্যাণমূলক বিষয়গুলোর জন্যে ব্যয় করা এবং আরেকটি অংশ ব্যয় করা উচিত মানসিক স্বস্তি ও আত্মিক প্রশান্তির জন্যে। ইমাম আলী (আঃ) এর মতে মানুষের উচিত তার জীবনের একটা সময় জীবনের কল্যাণমূলক বিষয়গুলো নিশ্চিত করার জন্যে ব্যয় করা এবং অপর একটা সময় ব্যয় করা উচিত আত্মিক শান্তি এবং মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করার জন্যে। আর এ প্রশান্তির ব্যাপারটি একমাত্র ইবাদাত-বন্দেগী বা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই কেবল অর্জিত হয়।
মানুষের সময়ের তৃতীয় অংশটি তার শারীরিক এবং মানসিক শক্তি লালনের জন্যে ব্যয় করা উচিত যাতে তার জীবনের জন্যে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সম্পাদনের শক্তি লাভ করতে পারে। হযরত আলী (আঃ) এ সম্পর্কে বলেন,মুমিন জীবনের কর্মপরিকল্পনায় তিনটি সময় সুনির্দিষ্ট আছে। একটা হলো তার স্রষ্টার ইবাদাত-বন্দেগির সময়। দ্বিতীয় সময়টা হলো যখন সে তার জীবনযাপন ব্যয় নিশ্চিত করার জন্যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালায় আর তৃতীয় সময়টা হলো তার সৎ আনন্দগুলো আস্বাদনের সময়। আজকের আলোচনায় আমরা ইমাম আলী (আঃ) এর বক্তব্যের তৃতীয় অংশটার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেবো-যেখানে তিনি জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও সুস্থ বিনোদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দুঃখজনকভাবে বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ দৈনন্দিন জীবন সমস্যায় এতো বেশি জর্জরিত যে,নিজের দিকে তাকাবার সময় খুব কমই মেলে। যার ফলে আমরা লক্ষ্য করবো যে মানুষ তার নিজের সম্পর্কে মানুষ উদাসীনতায় ভোগে।
আমরা লক্ষ্য করবো যে, এই উদাসীনতার পরিণতিতে ব্যক্তির মাঝে অশান্তি-হতাশা-বিষাদগ্রস্ততা-মানসিক অবসাদ এমনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, এগুলো থেকে মুক্তির জন্যে সে ভুল চিত্তবিনোদনের পথ বেছে নিচ্ছে-যা তার চিন্তা-চেতনায় ডেকে আনছে নিরন্তর অবক্ষয়। আলী (আঃ) মানুষের এই চিন্তা-চেতনাগত অবক্ষয় রোধকল্পে আভ্যন্তরীণ বা আত্মিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে সুস্থ বিনোদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন সুস্থ বিনোদনের জন্যে বই পড়া যেতে পারে যে বই মানুষের মনের খোরাক দেয়,আত্মিক এবং চিন্তাগত উৎকর্ষ সাধন করে। তিনি বলেছেন,জ্ঞান ও প্রজ্ঞাময় এবং নতুন অভিনতুন বিষয়বস্তুর মাধ্যমে নিজেদের অন্তরগুলোকে বিনোদিত করো,কেননা মনও শরীরের মতো ক্লান্ত হয়ে যায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিমত হলো,মানুষের জন্যে একঘেঁয়ে কাজ বা একঘেঁয়ে জীবন বিরক্তিকর এবং তা মানুষের শরীরকে অক্ষম করে তোলে। সেজন্যেই মানুষের উচিত হলো স্বাভাবিক ও একঘেঁয়ে জীবনের ছন্দে মাঝে মাঝে কিছুটা পরিবর্তন বা বৈচিত্র্য আনা। যেমন মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলো দেখার জন্যে ভ্রমণ করা বা এসবের ওপর পড়ালেখা করা। এগুলো অন্তরকে প্রশান্ত করে,সতেজ করে। খেলাধুলাও চমৎকার একটি বিনোদন-মাধ্যম। ইসলামে খেলাধুলার ব্যাপারে বলা হয়েছে খেলাধুলা শারীরিক শক্তি-সামর্থ বৃদ্ধি করা ছাড়াও মানসিক আনন্দেরও একটি মাধ্যম।
ইসলামে মানুষের সুস্থতা রক্ষার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই লক্ষ্য করা যাবে ঐশী শিক্ষা মানুষের জন্যে প্রাণদায়ী। যেমন রোযা অসুস্থ ব্যক্তির ওপর হারাম। একইভাবে মাদক যেহেতু মানুষের শরীর মনের জন্যে খুবই ক্ষতিকর এবং জীবন চলার পথকে স্থবির কিংবা একবারে বন্ধই করে দেয় সেজন্যে ইসলাম মাদকদ্রব্যের ব্যাপারে তিরষ্কৃত এমনকি ভর্ৎসনা করা হয়েছে। মানুষের মনোদৈহিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ইমাম আলী (আঃ) ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, বিমর্ষ বা মাতাল ব্যক্তিদের ওপর আস্থা রেখো না। তিনি মুমিনদেরকে সুস্থ-সবল দেহের অধিকারী হবার জন্যে অনুপ্রাণিত করেছেন! আলী (আঃ) নিজেও ছিলেন আধ্যাত্মিক শক্তির বাইরেও সুস্থ-সবল দেহের অধিকারী। নবীজীর যে-কোনো আদেশ পালনের জন্যে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে সক্ষম।
মুমিনদের জীবন-বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন,উপযুক্ত নয় যে এই তিনটি কাজের বাইরে বিচক্ষণেরা আরো কোনো কাজ করবে। জীবনের শৃঙ্খলা বিধানের জন্যে অর্থনৈতিক কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়া , ধর্মীয় কর্মকাণ্ড তথা আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগি করা এবং পাপহীন চিত্তবিনোদন করা।
 
মালঞ্চ-৭
পাঠক ! ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। নাহজুল বালাগায় নিরাপত্তা বিষয়ে হযরত আলী (আঃ) এর গুরুত্বপূর্ণ বহু বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি সংকলিত হয়েছে। আজকের আসরে আমরা অলঙ্কারপূর্ণ ও গভীর অর্থবহ সেইসব বক্তব্যের খানিকটা আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
সমাজের জ্ঞানী-গুণী মনীষীদের দৃষ্টিতে যুগ যুগ ধরে সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায়-বিচার এবং স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে নিরাপত্তা জীবনের মৌলিক দিকগুলোর একটি এবং সামজিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আর মানব উন্নয়ন ও বিকাশের অনিবার্য ক্ষেত্র সৃষ্টিকারী। এ কারণেই মানুষের একটি পবিত্রতম প্রত্যাশা হলো এই নিরাপত্তা। আল্লাহর পক্ষ থেকে পূণ্যবানদের সমাজের জন্যে সুসংবাদ হিসেবে নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা নূরের ৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ "তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে আল্লাহ তাদের এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে,পৃথিবীতে তিনি তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব বা খেলাফত দান করবেনই যেমন তিনি তাদের পূর্ববর্তীদের প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন। তিনি তাদের জন্যে তাঁর মনোনীত দ্বীনকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দেবেন এবং তাদের ভয়-ভীতির অবস্থাকে শান্তি আর নিরাপত্তামূলক অবস্থায় পরিবর্তিত করে দেবেন।"
মানুষের এই প্রাচীন আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ নিরাপত্তা তার অস্তিত্বের সাথেই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। জীবন যাপনের প্রয়োজনে মানুষ পরস্পরের সাথে বিভিন্ন ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে এবং এভাবেই একটি সমাজ বিনির্মাণ করে। তাদের এই সমাজ গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যটি হলো ন্যায় ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। হযরত আলী (আঃ) নাহজুল বালাগা'য় বলেছেন ইতিহাসের কাল-পরিক্রমায় রাষ্ট্র গঠন কিংবা সরকার গঠনের একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সার্বিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। একথা সর্বজন বিদিত যে ইমাম আলী (আঃ) ক্ষমতার মসনদ বা আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে শাসনকার্য পরিচালনা করেন নি, বরং তিনি এমন একটি সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন যার ছত্রছায়ায় মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়,অপরের অধিকার নষ্ট করার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়,জনগণ নিজেদের সীমান্ত রক্ষা করে শত্রুদের মোকাবেলার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালায়।
হযরত আলী (আঃ) অবশ্য এই বক্তব্যটি রেখেছিলেন খারজিদের কথা মাথায় রেখে-যারা হযরত আলী (আঃ) এর হুকুমাতকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। নাহজুল বালাগায় তিনি বলেছেন-"তারা বলে হুকুমাত,বিচার বা শাসন-কর্তৃত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ। এ কথা সত্য। আরো সত্য যে মানুষ-চাই শাসক ভালো হোক কিংবা মন্দ-শাসকের মুখাপেক্ষী। মুমিন ব্যক্তিগণ হুকুমাতের ছায়ায় নিজেদের কাজে মশহুল হয় আর অমুসলিমরা তা থেকে উপকৃত হয়। হুকুমাতের কল্যাণে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়। একইভাবে হুকুমাতের মাধ্যমেই বায়তুল মাল আদায় হয়,শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই হয়,রাস্তাঘাট সুরক্ষিত হয়,সবলের হাত থেকে দুর্বল তার অধিকার রক্ষা করতে পারে। আর এগুলো সম্ভব হয় তখন যখন পুণ্যবানরা শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করতে পারে এবং বাজে লোকদের হাত থেকে নিরাপদ থাকে।"
হযরত আলী (আঃ) এ কারণেই নিরাপত্ত প্রতিষ্ঠা করাকে সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করতেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাকে একটি নিয়ামত হিসেবে গণ্য করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মৌলিক শক্তি হলো আল্লাহ এবং ইসলামের প্রতি ঈমান। নাহজুল বালাগায় এসেছে-সকল প্রশংসা আল্লাহর,যিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সহজ পথের নির্দেশনা দিয়েছেন ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হবার জন্যে। তিনি ইসলামের স্তম্ভ করেছেন সুদৃঢ় যাতে কেউ একে ধ্বংস করতে না পারে। যারা ইসলামকে অবলম্বন করেছে তাদের জন্যে মহান আল্লাহ ইসলামকে করেছেন শান্তির উৎস। যারা বিশ্বাস স্থাপন করতে চায় তাদের অন্তরে দিয়েছেন বিশ্বস্ততা,যারা ইসলামের ওপর নির্ভর করতে চায় তাদের জন্যে দিয়েছেন আনন্দ। যে বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে চায় ইসলামকে তার জন্যে করেছেন ঢালস্বরূপ।
আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে একটি দেশে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করা উচিত যেখানে কোনো মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘিœত না হয়।তার মানে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি দেশের সরকারের মৌলিক একটি দায়িত্ব। এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে হযরত আলী (আঃ) বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। এখানে আমরা নাহজুল বালাগা থেকে একটি ছোট্ট উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ইমাম বলেছেন-চেষ্টা করো সততা ও মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার। প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে বিশ্বস্ত থেকো। সৎ পথ অনুসরণ করো। অহমিকা থেকে দূরে থেকো। আগ্রাসন বা সীমালঙ্ঘন করা থেকে বিরত থেকো ইত্যাদি।
মুসলমানদের এই মহান নেতা মানুষের জান-মালের হেফাজত করা এবং সম্মান রক্ষা করাকেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অংশ বলে মনে করেন। সেজন্যে তিনি তাঁর বক্তব্যে কিংবা উপদেশে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আলী (আঃ) তাঁর শাসনকালে যখন শুনতে পেলেন যে একদল লোক মানুষের নিরাপত্তা বিঘিœত করছে এবং তাঁরই শাসিত এলাকার ভেতর ইহুদি এক মহিলা লাঞ্ছিত হয়েছে,তিনি ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললেন-এই ঘটনায় শোকে-দুঃখে কেউ যদি মরেও যায়,তাহলে তাকে তিরষ্কৃত করা হবে না।
মালঞ্চ-৮
পাঠক ! ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। নাহজুল বালাগায় নিরাপত্তা বিষয়ে হযরত আলী (আঃ) এর গুরুত্বপূর্ণ বহু বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে গত আসরে আমরা খানিকটা আলোচনা করেছিলাম। আজকের আসরে ন্যায়কামী ও সত্যান্বেষী এই মহান মনীষীর অলঙ্কারপূর্ণ ও গভীর অর্থবহ বক্তব্যের আরো কিছু দিক আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
মানুষের অধিকার জাগরণের ক্ষেত্রে আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) এর মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ইসলামী শিক্ষার আলোকে আলোকিত। জুলুম-অত্যাচার,নিরাপত্তাহীনতা বা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়েছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিগুলো। আলী (আঃ) কে যে-ই চিনতে পারবে সে অবশ্যই ভালোভাবে উপলব্ধি করবে যে,অত্যাচারের মোকাবেলায় তিনি কখনোই শান্তভাবে চুপ করে বসে থাকতে পারতেন না, চেষ্টা করতেন সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করার জন্যে তাঁর এই চেষ্টা-প্রচেষ্টার বিষয়টি তাঁর চিন্তা-ভাবনা, বক্তৃতা-বিবৃতি তাঁর শাসনকার্য এবং তাঁর অনুসৃত নীতি-আদর্শের মধ্যেই সুস্পষ্ট। শ্রেণী-বৈষম্য দূরীকরণের জন্যে,দারিদ্র্য বিমোচন করার লক্ষ্যে এবং শোষণ-বঞ্ছনা ও অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে তিনি ব্যাপক সংগ্রাম করেছেন। তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে মানুষকে ন্যায়-নীতির স্বাদ আস্বাদন করিয়েছেন।
গত আসরে আমরা নাহজুল বালাগায় বিধৃত নিরাপত্তা বিষয়ক কিছু বক্তব্য আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আজকের আসরে সে বিষয়টির খানিকটা নজর বুলানোর চেষ্টা করা যাক। যারা শাসক তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য হলো ব্যক্তিগত এবং সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের জন্যে রাজনৈতিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে এমন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যাতে সকল শ্রেণীর মানুষই তার সুফল ভোগ করতে পারে। আসলে রাজনৈতিক নিরাপত্তার মানেই হলো এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে আপামর জনগণ নির্দ্বধায়-নিঃসঙ্কোচে,নির্ভয়ে তাদের আশা-আকাঙ্খার কথা বলতে পারে। আলী (আঃ) তাঁর হুকুমাতকালে রাজনীতি বা হুকুমাতের বিকৃত অর্থটিকে দূরীভূত করার চেষ্টা করেছেন। বিকৃত অর্থ মানে হুকুমাত বলতে মানুষ বুঝতো একধরনের স্বৈরশাসন বা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জগদ্দল পাথর। আলী (আঃ) এই ধারণাটি পাল্টে দিলেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে,হুকুমাত আসলে পরিচালনা,অংশঅদারিত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের সেবা করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আজারবাইজানের স্বল্পকালীন গভর্নর ছিলেন আস্আস ইবনে কায়েস। ইমাম আলী (আঃ) এই আস্আসকে একটি চিঠিতে লিখেছেন-গভর্নরের পদ তোমার জন্যে মজাদার কিছু নয় বরং এটা তোমার ঘাড়ে চাপানো একটা আমানত,তাই তোমার উচিত হলো তোমার কমান্ডার এবং তোমার ইমামের আনগত্য করা। মানুষের ওপর স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড করা কিংবা আদেশ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করার অধিকার তোমার নেই। তোমার হাতে মহান আল্লাহর দেওয়া বহু সম্পদ রয়েছে। তুমি হচ্ছো সেইসব সম্পদের কোষাধ্যক্ষ,তোমার দায়িত্ব হলো সেইসব সম্পদ আমার কাছে সোপর্দ করা।
ইমাম মনে করতেন সমাজে রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড়ো কারণটি হলো স্বৈরশাসন যা মানুষের অসৎ গুণাবলির মূল। সে জন্যেই ইমাম আলী (আঃ) তাঁর কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে যখন চিঠিপত্র লিখতেন সেখানে বলতেন তারা যেন অহমিকা না করে,শ্রেষ্ঠত্বকামী না হয়।
তিনি আরো তাকিদ দিতেন যে শাসক এবং জনগণের মাঝে পারস্পরিক অধিকার রয়েছে। এই অধিকারের বিষয়টির প্রতি গভীরভাবে মনোযোগ দেওয়া যায় তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা,শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেই সমাজের লোকজনের মাঝে পারস্পরিক সহানুভূতিশীল সম্পর্ক স্থাপিত হবে। এ কারণেই ইমাম আলী (আঃ) তাঁর শাসনকালের শুরু থেকেই জনগণের ওপর তাঁর কোনোরকম কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন নি যাতে মানুষের ব্যক্তি-স্বাধীনতা বিঘিœত হয়। এমনকি তাঁর বিরোধী ছিল যারা,তাদের কারো ওপরেও কোনোরকম চাপ সৃষ্টি করা হয় নি বা তাদের নিরাপত্তা কখনোই হুমকির মুখে পড়ে নি। আলী (আঃ) জনগণকে ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে নির্বাচনের অধিকার দিতেন।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টিও ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তিনি মনে করতেন অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাই দারিদ্র্যের কারণ আর দারিদ্র্য ঈমানের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঞ্চিত জনগোষ্ঠির সমস্যা সমাধানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে তিনি মনে করেন। জনকল্যাণে তাঁর ছিল গভীর মনোযোগ। তিনি মনে করতেন তাঁর হুকুমাতের একটি লক্ষ্য হলো সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। তিনি চেষ্টা করেছেন আভ্যন্তরীণ এবং বাইরের বিভিন্ন বিষয়ে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে। তিনি কেবল তখনই বিরোধীদের মোকাবেলা করতেন যখন একেবারেই নিরুপায় হয়ে যেতেন অর্থাৎ যখন শান্তিপূর্ণ সমাধানের আর কোনো পথ খোলা না থাকতো। তিনি একটি চিঠিতে মালেক আশতারকে লিখেছিলেন, "শান্তি প্রস্তাব হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ,তাই শান্তিপ্রস্তাবকে কখনোই প্রত্যাখ্যান করো না। শত্রুরা যেটুকুই পেশ করুক না কেন। যোদ্ধাদের জন্যে প্রশান্তি,নিজেদের এবং দেশের জন্যে শান্তি নিশ্চিত হয় শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। তবে শান্তিচুক্তির পর শত্রুদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করবে। কেননা অনেক সময় শত্রুরা তোমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করার জন্যে তোমার সমীপে হাজির হবে। তাই সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে ত্র"টি করবে না। এভাবে হযরত আলী (আঃ) নিরাপত্তা বিষয়টিকে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক করণীয় বলে গুরুত্ব দিতেন। সত্যি বলতে কি ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে যে সমাজে নিরাপত্তা নেই সে সমাজে সার্বিক ন্যায়মূলক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়।
মালঞ্চ-৯
পাঠক ! ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। নাহজুল বালাগায় হযরত আলী (আঃ) এর স্বরূপটা এমন একজন ইনসানে কামেলের মতো ফুটে ওঠে যিনি সত্ত্বার বিস্ময় ও রহস্যের গূঢ়ার্থ সচেতন এবং যিনি দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যের সকল রহস্যকে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর গুণাবলী এমন এক বিষয় যা নাহজুল বালাগায় বারবার বর্ণিত হয়েছে। আলী (আঃ) আল্লাহর বর্ণনা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহ্যভাবে দিয়ে মানুষের চিন্তা-আবেগ-অনুভূতিকে এমন এক অনন্ত সত্যের সাথে পরিচিত করিয়ে তোলেন যে সত্য সম্পর্কে আমরা সবাই নিজেদের উপলব্ধি অনুযায়ী তাঁকে চিনতে পারি এবং যাঁর অপার দয়া ও রহমতের ছায়ায় আমরা জীবন যাপন করি।
হযরত আলী (আঃ) ৪৯ নম্বর খোৎবায় লিখেছেন,সকল প্রশংসা আল্লাহর। যিনি সকল গোপন বস্তু সম্পর্কে অবহিত এবং সত্ত্বার সকল প্রকাশ্য বস্তুই তাঁর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। কখনোই কারো চোখের সামনে তিনি প্রকাশিত হন না। যে চোখ দিয়ে তাকে দেখে না, সেও তাঁকে অস্বীকার করতে পারে না। যে হৃদয় তাঁকে চিনেছে সেও তাকে দেখতে পায় না। তিনি এতো মহান, মর্যাদাবান এবং উন্নত যে তাঁর সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। আবার তিনি সৃষ্টিকূলের এতো কাছে যে, কোনো কিছুই তাঁর চেয়ে বেশি কাছের হতে পারে না।
আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে আল্লাহ হলেন সকল সত্ত্বার উৎস এবং সৃষ্টির সবকিছু তাঁর কাছ থেকেই উৎসারিত। আকাশ এবং যমিনে যা কিছু আছে সবকিছুই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে সৃষ্টি করেছেন। আর সৃষ্টিকূল যেহেতু তাঁর সাথেই সম্পর্কিত,সেহেতু সকল বস্তুই তাঁর মর্যাদা এবং তাঁর একত্বের লেশপ্রাপ্ত। আল্লাহর বান্দাগণ তাঁর সক্ষমতা,তাঁর কৌশল এবং তাঁর দয়অ-দিাক্ষিণ্যের কাছে অনুগত ও আত্মসমর্পিত। যদিও বান্দাদের আনুগত্যের কোনো প্রয়োজনীয়তা আল্লাহর কাছে নেই। বরং আনুগত্য বান্দার নিজের মর্যাদা বা সৌভাগ্যের জন্যেই প্রয়োজন।
আলী (আঃ) জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন তারা যেন আল্লাহকে সময় এবং স্থানের সীমিত গণ্ডির মাঝে অবরুদ্ধ বলে মনে না করে কিংবা তাঁকে কেউ যেন নিজের সাথে তুলনা না করে। আল্লাহকে চেনার জন্যে তাঁর সৃষ্টির বিস্ময়ের প্রতি মনোনিবেশ করলেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব,বিশালত্ব এবং মহান মর্যাদার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে। নাহজুল বালাগায় তিনি মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন- হে যথার্থ কাঠামোযুক্ত সৃষ্টি!হে মায়ের পেটের অন্ধকারে লালিত সত্তা! সৃষ্টির শুরুতে তুমি ছিলে কাদার তলানি। তারপর তুমি নির্দিষ্ট একটা সময় আরামের একটি জায়গায় সুরক্ষিত ছিলে। সেই মায়ের পেট থেকে তোমাকে বের করে এমন এক পৃথিবীতে আনা হয়েছে যেই পৃথিবীকে তুমি ইতোপূর্বে দেখো নি এবং লাভের পথ কোন্টা-তাও জানতে না। তাহলে চুষে চুষে মায়ের দুধ খাওয়া কে শেখালো? দরকারের সময় ডাকা বা চাওয়ার পন্থাটি তোমাকে কে শেখালো?
তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি তার নিজের বর্ণনায় ভারসাম্য রক্ষা করতে অক্ষম সে নিঃসন্দেহে তার প্রতিপালকের প্রশংসার ক্ষেত্রে আরো বেশি অক্ষম। আলী (আঃ) অপর এক বর্ণনায় বলেছেন মানুষের সুখ-শান্তি আর সুস্থিতির মূল উৎস হলেন আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহকে খোঁজার জন্যে তাই মানুষ তার আধ্যাত্মিক শক্তি,তার জ্ঞান-বুদ্ধি,বিচার-বিবেচনাকে কাজে লাগায় যাতে খোদার প্রেমের রেকাবিতে পা রাখা যায় এবং তাঁর নিকটবর্তী হয়ে অমোঘ শক্তি লাভ করা যায়। তিনি নিজে আল্লাহর প্রেমের রশ্মিতে মহান স্রষ্টার সান্নিধ্যে এতো উর্ধ্বে পৌঁছেন যে,এই পৃথিবী এই জীবন তাঁর কাছে খুবই তুচ্ছ বিষয় ছিল এবং সবসময় আল্লাহর প্রশংসা বাণী তাঁর মুখে হৃদয়গ্রাহী শব্দে গুঞ্জরিত হতো। বলা হয় যে,রাত ঘনিয়ে আসলে কিংবা আঁধারের পর্দা নেমে আসলে প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর বিশেষ প্রশংসার মুহূর্ত।
আসলে আলী (আঃ) আল্লাহকে এতো গভীরভাবে চিনতেন যে স্বয়ং রাসূলে খোদা (সা) তাঁর প্রশংসা করতেন। সেইসাথে রাসূল চাইতেন জনগণ যেন তাঁর ওপর কথা না বলে কেননা আলী (আঃ) হলেন আল্লাহর প্রেমে বিমোহিত।মালঞ্চ-১০
ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা নাহজুল বালাগায় বিধৃত আলী (আঃ) এর মূল্যবান কিছু বক্তব্য শুনে আল্লাহর মহান কিছু বৈশিষ্ট্যের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছি। আসলে নাহজুল বালাগা হচ্ছে বিশ্বের প্রতিপালক সম্পর্কে বা তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে জানার জন্যে সমৃদ্ধ একটি ভাণ্ডার। যাই হোক আজকের আসরেও আমরা তারি ধারাবাহিকতায় খানিকটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
আলী (আঃ) তাঁর বক্তব্যে আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে মূল্যবান অনেক কথাই বলেছেন। আলী (আঃ) যে খোদার কথা বলেছেন তিনি শুষ্ক ও নি®প্রাণ কিংবা মানুষের সাথে অপরিচিত কেউ নন। তিনি জীবিত এবং সচেতন। মানুষের সাথে তাঁর কথাবার্তা বিনিময় হয়। তিনি মানুষকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করেন এবং তিনি তাদের আন্তরিক প্রশান্তি ও সন্তুষ্টির উৎস। সকল সৃষ্টিই নিজের অস্তিত্বের গভীরে তার সাথে গোপন রহস্যের সূতোয় বাঁধা। তাদের সবাই আল্লাহর প্রশংসায় লিপ্ত। অন্যভাবে বলা যায়,নাহজুল বালাগায় আল্লাহ খুবই প্রিয় সত্ত্বা-মানুষের ভালোবাসার মূল উৎস। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ীঃ তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।
এ কারণেই হযরত আলী (আঃ) আল্লাহকে চেনার উপায়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। আল্লাহর নিদর্শনগুলো নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা করা,অন্তরের সকল কালিমা দূর করে স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা আনা,সত্ত্বার গভীরে ডুবে যাওয়া,আল্লাহর জিকির করা ইত্যাদিকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির ভিত্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইমাম আলী (আঃ) সত্ত্বাকে আল্লাহর সৃষ্টি বলে মনে করেন এ অর্থে যে বিশ্ব হলো সৃষ্ট বস্তু আর আল্লাহই তাকে তাঁর নিজস্ব কৌশলে সৃষ্টি করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো যে আল্লাহ যা সৃষ্টি করার কথা ভাবেন তা-ই সৃষ্টি হয়ে যায়। তিনি সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞানী মহান স্রষ্টা।
যে ব্যক্তি আল্লাহকে খুঁজে বেড়ায় তাকে ইমাম আলী (আঃ) বলেন সে যেন কোরআনে কারিমের প্রতি মনোনিবেশ করে। কেননা মানুষের চিন্তাশক্তি সীমিত। সে তার নিজের অপূর্ণ চিন্তা দিয়ে একাকী আল্লাহর মতো মহান সত্ত্বাকে খোঁজার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারবে না। আলী (আঃ) বলেন-হে প্রশ্নকারী! যথার্থ দৃষ্টি দাও! কোরআন আল্লাহর যেসব গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করছে তার প্রতি আস্থাশীল হও! তাঁর হেদায়েতের আলো থেকে উপকৃত হও! যা কিছু আল্লাহর কিতাব,নবীজীর সুন্নাত এবং অলী-আউলিয়াদের হেদায়েতের পথ থেকে দূরে রাখে এবং শয়তানের প্ররোচনা যাদের নিত্যসঙ্গী তাদের ত্যাগ করো। ঐশী আদর্শের শিক্ষকগণ জ্ঞানের পথে সদা অটল-অবিচল ছিলেন।
আলী (আঃ) আল্লাহর একত্বের ব্যাপারে বহু প্রমাণ অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন এবং তারপর তাঁর আনুগত্য করা আমাদের জন্যে ফরয বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরো স্মরণ করিয়ে দেন যে,মানুষ খুবই দুর্বল এবং অক্ষম সৃষ্টি এবং তাই মানুষের উচিত সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা, তার নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকা এবং তার সন্তুষ্টির জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করা। এ প্রসঙ্গে ইমাম আলী (আঃ) তাঁর ছেলে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর উদ্দেশ্যে বলেছেন-জেনে রোখো হে আমার সন্তান! আল্লাহর যদি কোনো অংশীদার বা শরিক থাকতো তাহলে তাঁর নবীরাও তোমার কাছে আসতো। তুমি তাদের শক্তির নিদর্শন দেখতে এবং তাদের কর্মনৈপুন্য ও গুণাবলী সম্পর্কে জানতে। কিন্তু খোদা তায়ালা এক এবং একক সত্ত্বা। যেমনটি তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন-তাঁর নিরঙ্কুশ একাধিপত্যে কারো কোনো রকম অংশিদারিত্ব নেই এবং তাঁর শক্তি নিঃশেষ হবার নয়।

তাঁর অস্তিত্ব সবসময় ছিল এবং তিনি সকল কিছুর শুরু তবে তাঁর জন্যে শুরু বলে কিছু নেই। সবকিছুরই সমাপ্তি আছে কিন্তু তাঁর কোনো সমাপ্তি নেই। মানুষ তাঁর শক্তি সম্পর্কে যতোটুকু চিন্তা করতে পারে প্রকৃতপক্ষে তিনি তার চেয়েও অনেক উর্ধ্বে। এখন যেহেতু এই উপলব্ধি বা বোধ তোমার হয়েছে তাই আল্লাহর প্রতি অনুগত হও। তাঁর শাস্তিকে ভয় করো এবং তাঁর রাগের কারণগুলোকে পরিত্যাগ করো। কেননা খোদা তায়ালা তোমাকে পুণ্যকাজ ছাড়া আর কোনো কিছুর আদেশ দেন নি এবং মন্দকাজ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ব্যাপারে নিষেধ করেন নি।
আলী (আঃ) আল্লাহকে গভীর প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার সাথে চিনতেন এবং তাঁর ভালোবাসা পোষণের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত একটি বক্তব্য হলো-হে খোদা! তোমার বেহেশতের লোভে কিংবা তোমার জাহান্নামের ভয়ে আমি তোমার ইবাদাত করি নি,বরং তোমাকে ইবাদাতের উপযুক্ত এবং প্রশংসার যোগ্য জেনেই তোমার ইবাদাত করেছি। তিনি বিনীতভাবে এবং যথার্থ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর সান্নিধ্যের জন্যে বেদনাহতের মতো মোনাজাত করতেন। রাতের অন্ধকারে যখন সবাই গভীর নিদ্রায় ডুবে যেতো তখন তিনি আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে গুঞ্জন করতে করতে বলতেন-হে খোদা! তুমি তো তোমার সকল প্রিয় বান্দার দুঃসময়ের সঙ্গী এবং যারা তোমার ওপর নির্ভর করে তাদের অভাব-অভিযোগের ব্যাপারে তুমি তো সবই জানো। হে খোদা! আমার জন্যে তুমি যা কিছু যথার্থ মনে করো তার নির্দেশনা দাও! আমার অন্তরকে উন্নতি-অগ্রগতির দিকে এবং পূর্ণতার দিকে ধাবিত করো-কেননা;এই অনুগ্রহ তোমার হেদায়াতের বাইরে নয়।
মালঞ্চ-১১
আমরা যখন নাহজুল বালাগা অধ্যয়ন করি তখন যে বিষয়টি আমাদেরকে খুব আকৃষ্ট করে তাহলো নৈতিক ব্যধিগুলোর ব্যাপারে পরিকল্পনা। যাদের এই ব্যধি আছে তাদের ব্যাপারে আলী (আঃ) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে,এই রোগগুলো এমন যে যা প্রত্যেক যুগের মানুষকেই শঙ্কিত করে তোলে। ইমাম যেহেতু বিপর্যয়কর এই রোগের মূল কারণগুলো সম্পর্কে জানতেন তাই তিনি এই রোগ থেকে মুক্তি লাভ বা আরোগ্য লাভের উপায়গুলো সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করেছেন। কেননা নৈতিকতা রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করা বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও জাতির জন্যেই সার্বজনীন এবং সর্বকালীন গুরুত্ববহ একটি বিষয়।
প্রবৃত্তির অনুসরণ করা এবং দুনিয়াবী চাকচিক্যের মোহে পড়ার ব্যাপারটি কোনো একটি যুগ বা কালের মধ্যেই সীমিত ছিল না বরং সর্বযুগ বা সর্বকালের মানুষই জীবন ও জগতের এই দূষণ ও ফেৎনার বিপদে নিপতিত হয়। ইমাম আলী (আঃ) নাহজুল বালাগাতে এমন ধরনের মুমিন ব্যক্তিদের চিত্র বা স্বরূপকে উজ্জীবিত করেছেন যাঁরা পার্থিব জগতের মোহে আবদ্ধ ছিলেন না। যেমন আবু জর,সালমান,আসহাবে সুফ্ফা। এঁরা ইসলামী উম্মাহর মধ্যে এমন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ববর্গের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাঁরা পার্থিব জগতের মোহ বা দুনিয়াবী প্রতারক ঐশ্বর্যের ব্যাপারে ছিলেন একেবারেই নির্মোহ ও উদাসীন। কিন্তু এই মহান ব্যক্তিত্বদেরই কেউ কেউ রাসূলে খোদার (সা) রেহলাতের দুনিয়াবী শান-শওকতের মোহে এমনভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন যে,মুসলিম সমাজকেই বিচ্যুতির দিকে ধাবিত করলেন। তখন ইমাম আলী (আঃ) মানুষকে সবচেয়ে গঠনমূলক ও প্রভাবশালী অস্ত্র তাকওয়া ও পরহেজগারীর ব্যাপারে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তাকওয়া সম্পর্কে তিনি বলেনঃ তাকওয়ার ব্যাপারে পরিপূর্ণ মনোযোগ দাও ! যা কিছু পরহেজগারীর ব্যাপারে প্রতিবন্ধক-সেসব থেকে দূরত্ব বজায় রাখো! পরহেজগারীর ব্যাপারে নিজেকে সবসময় সতর্ক রেখো ! তোমার দিনকে পরহেজগারী দিয়ে শুরু করো। অন্তরকে পরহেজগারীর চাদরে সজ্জিত করো ! অন্তরের গুনাহগুলোকে পরহেজগারী দিয়ে পরিষ্কার করে সেগুলোকে মন থেকে বিতাড়িত করো। মনে রেখো-যারা তাকওয়ার মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছে তাদেরকে খাটো করে দেখো না,আবার পার্থিব জগত যাদেরকে আপাত দৃষ্টিতে বড়ো করেছে তাদেরকে উচ্চ মর্যাদাবান বলে ভেবো না।

মানুষ যদি তার নিজের অন্তরাত্মার ব্যাপারে যতœশীল হয় এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে,তাহলে সে এমন এক পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয় যে সে কেবল গুনাহের পথেই যাবে না,বরং তার মনে গুনাহের চিন্তাই কাজ করবে না। পরহেজগারী অন্তরাত্মাকে শক্তিশালী করে এবং অবাধ্য বা উদ্ধত অনুভূতিগুলোকে বশীভূত করে।ইমাম আলী (আঃ) নাহজুল বালাগায় বলেছেনঃ হে আল্লাহর বান্দারা! তোমাদেরকে আল্লাহর পথে,তাকওয়ার পথে আহ্বান জানাচ্ছি যা কিনা কিয়ামতের পথের পাথেয়। পরহেজগারী এমন এক পাথেয় যা ব্যক্তিকে তার লক্ষ্যপানে বা মঞ্জিলে নিয়ে যায়। পরহেজগারী এমন এক পাথেয় যা বান্দাকে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ আশ্রয় দেয়। হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহর স্মরণ তাঁর বন্ধুদেরকে অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত রাখে এবং তাদের অন্তরগুলোকে আল্লাহর ভয়ে পরিপূর্ণ রাখে। আল্লাহর ভয়ে তারা তাদের রাতগুলো বিনিদ্র অবস্থায় কাটায় আর তাদের দিনগুলো কাটে রোযার কৃচ্ছতার মধ্য দিয়ে।
নিজের ব্যাপারে যতœশীলতাকে আলী (আঃ) সর্বপ্রকার নৈতিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। ব্যক্তি যদি পবিত্রতা এবং তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপন করে তাহলে সে প্রখর ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিমান হবে। কেননা আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হলে অন্তরের সকল বক্রতা-পঙ্কিলতা মনের সকল কালিমা দূর হয়ে যায় এবং মনের গহীনে এক ধরনের পবিত্রতা এসে মনকে নিষ্কলুষ করে তোলে। অন্যভাবে বলা যায়,তাকওয়া মানুষের বিবেক বা প্রজ্ঞায় স্বাধীনভাবে কাজকর্ম করবার শক্তি দান করে। এ কারণে এটি প্রতিটি মানুষের জীবনেরই অবশ্যম্ভাবী এবং পছন্দনীয় একটি বৈশিষ্ট্য। কেননা সবাই চায় স্বাধীনভাবে চলতে এবং বিবেক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ জীবনযাপন করতে।
তাকওয়া হচ্ছে সততার চাবিকাঠি এবং পরকালীন জীবনের পাথেয়। তাকওয়া হচ্ছে সর্বপ্রকার গোলামি থেকে মুক্তির মূল চালিকাশক্তি এবং সর্বপ্রকার ধ্বংস থেকে মুক্তির উপায়। তাকওয়ার মাধ্যমে মানুষের চেষ্টা-প্রচেষ্টাগুলো সফলতা পায় এবং তাকওয়াবান মানুষ শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি লাভ করে। তাকওয়াবানদের আশা-আকাক্সক্ষাগুলো পূর্ণ হয়।
আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে পরহেজগারীর মর্যাদা এতো উচ্চে যে,তাকওয়াবান ব্যক্তি তাঁর শ্রোতাদেরকে একাধারে এই উপদেশ দেয় যে,জামা-কাপড় যেভাবে মানুষের শরীরকে শীত এবং গরম থেকে রক্ষা করে, সেভাবে পরহেজগারীর মাধ্যমে মানুষ যেন নিজের ব্যাপারে যতœশীল হয়ে আত্মনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে আত্মসম্মান-মর্যাদা ও ভালোবাসা অর্জন করে। তিনি বলেনঃ মনে রেখো! তাকওয়া হলো আনুগত্য ও আল্লাহভীতির এমন এক বাহন যার আরোহীর হাতে রয়েছে লাগাম এবং আরোহী নিজেকে প্রশান্তচিত্তে বেহেশতের দিকে নিয়ে যায়।
মালঞ্চ- (১২)
আলী (আঃ) এর অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি ছিলেন অসীম জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। রাসূলে খোদা (সা) বলেছেন,আমি হলাম জ্ঞানের শহর আর আলী হলো সেই শহরের দরোজা। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ঝর্ণাধারায় সিক্ত হয়ে আছে নাহজুল বালাগা। নাহজুল বালাগা তাই পরিণত হয়েছে জ্ঞানের বিস্ময়কর এক সম্ভারে। এ বিষয়টি নিয়ে মালঞ্চের আজকের আসরে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।
আমিরুল মুমেনিন আলী (আঃ) এর বক্তব্য-চিঠিপত্র এবং তাঁর বিভিন্ন বাণীতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো ইসলাম হলো একটি জীবন বিধান এবং ইসলাম আমাদেরকে মর্যাদাময় ও সম্মানজনক একটি জীবনের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। আলী (আঃ) তাই সবসময়ই এ বিষয়টিকে জনগণের সামনে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টা করেছেন মানুষের মনন থেকে অজ্ঞতার পর্দাগুলোকে সরিয়ে দিতে এবং মানুষের দৃষ্টিকে আলোর একটি উৎস হিসেবে,হেদায়েতের উপাদান হিসেবে জ্ঞানের প্রতি নিবদ্ধ করতে। কুমাইল নামে তাঁর একজন সঙ্গীকে তিনি বলেছেনঃ হে কুমাইল! জ্ঞান হলো ধন-সম্পদের চেয়ে উত্তম। কারণ জ্ঞান হলো তোমার পাহারাদার,আর তোমার উচিত মালের পাহারাদার হওয়া। মাল থেকে দান করার ফলে মালামাল হ্রাস পায় কিন্তু জ্ঞান দান করার ফলে জ্ঞান আরো বৃদ্ধি পায়। তাই যে সম্মান বা মর্যাদা মালের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে,মাল চলে গেলে সেই সম্মান ও মর্যাদাও হারিয়ে যাবে।
ইসলাম হলো একটা মৌলিক ও বাস্তববাদী ধর্ম। সেজন্যেই ইসলামের আবির্ভাবের ফলে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞানরাজ্যে নতুন এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অযৌক্তিক রীতি-আচার ও সংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে মানুষের মন ও চিন্তা স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছে। এটা ইসলামের অবদান। ইসলাম মানুষকে সত্য আবিষ্কারের দিকে আহ্বান জানিয়েছে। ইমাম আলী (আঃ)ও অন্ধ অনুসরণ, নাফরমানী, একগুঁয়েমিকে সত্যান্বেষী মনের পরিপন্থী বলে মনে করতেন এবং তাকে নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বরং জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও চিন্তাশীলতার দিকে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন।
আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে প্রকৃত মুসলমান জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে কখনোই অসহিষ্ণু হয় না। তিনি আরো মনে করেন জ্ঞান অর্জনের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই কিংবা নেই কোনো স্থানিক পরিসীমা। তিনি বলেনঃ জ্ঞান হলো মুমিনের হারানো সম্পদ, সুতরাং কোনো কপট লোকের কাছ থেকে হলেও জ্ঞান আহরণ করো। সমৃদ্ধ ইসলামী সভ্যতা ও মুসলমানদের জ্ঞানের বিকাশ কেবল কোরআনের আলোকিত শিক্ষা এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর অনুপ্রেরণা থেকেই উৎসারিত। কেননা ইসলাম প্রতিটি মুসলিম নরনারীর ওপর জ্ঞানার্জন করাকে ফরয বলে ঘোষণা করেছে। আলী (আঃ) এরই ভিত্তিতে বহুবার বলেছেন যে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা নির্ভর করছে তার জ্ঞানের পরিমান বা পরিধির ওপর।
ইমাম আলী (আঃ) নিজেকে এমন একজনের প্রতি বিনয়ী বলে মনে করেন যিনি তাঁকে অন্তত একটি শব্দও শিখিয়েছেন। তিনি নিজেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জাগৃতির জন্যে এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্যে জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে ভীষণ তাকিদ দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়ঃ যে-কোনো পাত্রেই কিছু ঢাললে তা পূর্ণ হয়ে যায় কেবল জ্ঞানের পাত্র ছাড়া,কেননা তাতে যতোই ঢালা হয়,তার পরিধি ততোই বেড়ে যায়। অবশ্য সেই জ্ঞান তখনি আলো ছড়ায় যখন তা মানুষকে নিজস্ব কামনা-বাসনা চরিতার্থ করা এবং স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্তি দেয়।
বহু জ্ঞানী লোক আছে যারা আত্ম-অহংকারের বেড়িতে আবদ্ধ হয়ে আছে এবং ধন-সম্পদ আর শক্তি-সামর্থ অর্জনের খেলায় মেতে রয়েছে। এ কারণেই মানুষের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন এবং জ্ঞানকে কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া সবসময়ই ছিল দ্বন্দ্বমুখর। আলী (আঃ) এর নাহজুল বালাগা জ্ঞানের জগতে আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি মানুষকে শিক্ষার যথার্থ পথ দেখিয়েছে এবং সত্যিকারের জ্ঞানী যারা তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ইমাম আলী (আঃ) নবীজির আহলে বাইতকে জ্ঞানের প্রোজ্জল বাতি বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়ঃ তাদের অর্থাৎ আহলে বাইতের কাছ থেকেই পরিত্রাণের উপায় সন্ধান করো,নবীজীর আহলে বাইতের কাছেই রয়েছে জ্ঞানের আসল রহস্য এবং অজ্ঞতার আঁধার দূর করার গোপন চাবিকাঠি।
মালঞ্চ-১৩
গত আসরে আপনারা জ্ঞান সম্পর্কে ইমাম আলী (আঃ) এর হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য শুনেছেন। জ্ঞানকে তিনি কতোটা মর্যাদার সাথে উচ্চাসনে স্থান দিয়েছেন সে সম্পর্কেও খানিকটা অবহিত হয়েছেন। আজকের আসরে জ্ঞান-ঈমান এবং আমল সম্পর্কে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
ইমাম আলী (আঃ) এর বক্তব্য দিয়েই শুরু করা যাক আজকের আসর। তিনি বলেছেনঃ হে মানুষেরা! আমাকে হারাবার আগেই যা কিছু জানার আছে প্রশ্ন করে জেনে নাও! নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীর বিষয়াবলীর চেয়ে আকাশের বিষয়াবলী সম্পর্কে ভালো জানি। মানুষ যতোই জ্ঞান ও সত্যের ব্যাপারে বেশি বেশি সচেতন হবে,ততোই অন্যের অজ্ঞতায় কষ্ট পাবে এবং তাদের হেদায়েতের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন হবে। আলী (আঃ) জ্ঞান ও চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন একজন মানুষ ছিলেন। তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞানের উপায়গুলো তুলে ধরেছেন। মূর্খকে তিনি দিশেহারা বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় বলে মনে করেন। আবার জ্ঞানী ব্যক্তিকেও তিনি কেবল জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে ফিরিয়ে রাখার পক্ষপাতী। কেননা যেসব মানুষ সত্যান্বেষী এবং জ্ঞানপিপাসু,তারা অনেক সময় আত্মপূজারী ও পদ-মর্যাদাকাঙ্ক্ষীও হয়।
আলী (আঃ) তাই জ্ঞানের পাশাপাশি ঈমানকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন। তার কারণ জ্ঞান এবং ঈমান মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিচিত্রমুখী ভূমিকা রাখে। জ্ঞানের ভূমিকাটা হলো এটা মানুষকে যোগ্যতা ও সক্ষমতা প্রদান করে এবং উন্নতি ও অগ্রগতির পথগুলোকে উন্মুক্ত করে দেয় যাতে মানুষ যেভাবে চায় সেভাবেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। কিন্তু ঈমান মানুষকে হেদায়াত দান করে যাতে সে তার ভবিষ্যৎকে পুণ্য ও কল্যাণময় করে গড়ে তোলে। আলী (আঃ) বলেছেনঃ ঈমান হলো সুস্পষ্টতম পথ এবং সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল বাতি। ঈমানের সাহায্যে পুণ্য ও নেক আমল করা যায় আর নেক আমলের সাহায্যে ঈমানের নাগাল পাবার সামর্থ তৈরি হয়। ঈমানের সাহায্যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আরো বেশি দীপ্তিমান হয়।
বর্তমান বিশ্বের বহু শিক্ষিতজন বা জ্ঞানী-গুণী মনীষী স্বীকার করেছেন যে জ্ঞানের পাশাপাশি ঈমানের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জর্জ শার্টেন ছয় ডানা নামক গ্রন্থে মানুষের সম্পর্ককে মানবীয় করার জন্যে জ্ঞান ছাড়াও আরো একটি উপাদানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ শিল্প সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে,সেজন্যে শিল্প মানুষের জীবনের আনন্দ ও সুখের উৎস হিসেবে কাজ করে। আর ধর্ম প্রেম নিয়ে আসে,এ অর্থে দ্বীন হলো জীবনের সঙ্গীত। জ্ঞানও মানুষের সচেতনতার উৎস। এই তনটি জিনিসই আমাদের জন্যে প্রয়োজন। একটি হলো শিল্প,আরেকটি হলো দ্বীন এবং তৃতীয়টি হলো জ্ঞান।
নাহজুল বালাগায় আলী (আঃ) এর একঠি বক্তব্য এ রকমঃ হে জনগণ! খোদার কসম খেয়ে বলছি তোমাদেরকে এমন কোনো কিছুর অনুসরণ বা আনুগত্য করার জন্যে বলি না,যা তোমাদের আগে আমি নিজে আমল না করি। আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে জ্ঞানের অলঙ্কার হচ্ছে আমলের মধ্যে। জ্ঞান অনুযায়ী আমল করলে জ্ঞানের পরিধি বেড়ে যায় এবং জ্ঞানীজনকে তা সম্মান ও মর্যাদাবান করে। অপরদিকে ধর্মে বারবার যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হলো- জ্ঞান সেই কাজের মূল্য ও প্রভাব বৃদ্ধি করে যেই কাজ জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির আলোয় করা হয়। এ ধরনের কাজের মূল্য না জেনে করা কাজের তুলনায় শতগুণ বেশি। এ কারণে আলী (আঃ) বলেছেন,জ্ঞানী লোকেরা তাদের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অনেক বিষয়ে উপকৃত হন। তিনি বলেছেনঃ
জ্ঞানের সাথে তার ব্যবহারিক প্রয়োগের সম্পর্কটি খুবই নীবিড়। যিনি জ্ঞান অর্জন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন,তাঁর উচিত সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করা। কেননা জ্ঞান আমলকে আহ্বান জানায়। আমল যদি জ্ঞানের আহ্বানে সাড়া দেয় তাহলে সেই জ্ঞান অক্ষুন্ন থাকে নতুবা তা চলে যায়। তিনি আরো বলেছেন ঈমান-আমল এবং অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন যে জ্ঞান সেই জ্ঞান পার্থিব এই পৃথিবীতে তার অধিকারীর জন্যে সম্মান ও মর্যাদা বয়ে আনে আর পরকালীন জগতের মুক্তি নিশ্চিত করে। এই ধরনের জ্ঞানের অধিকারীদের প্রশংসা করা হয়েছে। ইমাম আলী (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে,কোনো মুমিন যদি মৃত্যুবরণ করে আর তার লেখা একটি পাতাও যদি পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকে যাতে জ্ঞানের কথা লেখা রয়েছে,তাহলে ঐ পাতাটি তার এবং আগুণের মাঝে হিজাব বা পর্দা হিসেবে কাজ করবে।
অন্য এক জায়গায় ইমাম আলী (আঃ) বলেছেন,জ্ঞানী লোকেরা জীবিত যদিও তাঁদেরকে মাটির অন্তরে শায়িত করা হয়েছে আর মূর্খ লোকেরা মৃত যদিও তারা পৃথিবীর বুকে বাস করছে। ইমাম আলী (আঃ) এভাবেই মানুষকে জ্ঞানের ব্যাপারে বিশেষ করে ঈমান ও আমলযুক্ত জ্ঞানের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। জ্ঞানের নগরীতে তাই আমাদের সবারই উচিত প্রবেশ করা এবং সেই নগরীতে প্রবেশ করার একটি দরোজা হলো নাহজুল বালাগা।
মালঞ্চ-১৪
নাহজুল বালাগাতে বিভিন্ন শ্রেণী ও মানুষের উদ্দেশ্যে ইমাম আলী (আঃ) এর ছোট-বড়ো অনেক চিঠি এবং বক্তব্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সুন্দর একটি চিঠি হলো তাঁর আপন সন্তান ইমাম হাসান (আঃ) কে লেখা। সময়ের সঙ্কীর্ণতার জন্যে আমরা সেই চিঠিটিা পুরোপুরি হয়তো উপস্থাপন করতে পারবো না। তবে চিঠিটার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ এবং তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আপনারা যথারীতি মালঞ্চের সাথেই আছেন-এ প্রত্যাশা রইলো।
হযরত আলী (আঃ) তাঁর নিজের লেখা চিঠিতে নৈতিকতা সম্পর্কে পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যে নিজের সন্তানকে বহু উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পূর্ববর্তীদের জীবনেতিহাস এবং তাদের অতীত ঘটনা পর্যালোচনা করতে হবে। হযরত আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে পূর্ববর্তীদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তাদের পতনের কারণগুলো কিংবা সাফল্যের কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রাচীনদের সমাজ জীবনে পরিভ্রমণ করে মানুষ ভালোকে মন্দ থেকে আলাদা করতে শিখবে এবং এভাবে জীবন চলার সঠিক পথ নির্বাচন করতে পারবে।
ইমাম আলী (আঃ) আরো বলেছেন,আমার আগে যাঁরাই গত হয়েছেন তাঁদের সমান জীবন তো আমি যাপন করি নি কিন্তু আমি তাঁদের কর্মগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি এবং তাদের জীবন কাহিনী খতিয়ে দেখেছি। তাঁদের যেসব অবদান বা সৃষ্টিকর্ম রয়েছে সেগুলো আমি খুব ভালোভাবে দেখেছি। এসব দেখেশুনে তাঁদের সম্পর্কে এতোটাই অবহিত হয়েছি যে,মনে হয় আমি সেই প্রথম ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বশেষ ব্যক্তি পর্যন্ত সবার সাথেই জীবনযাপন করেছি। আর এভাবে আমি আঁধার থেকে আলোয় ফেরা এবং ক্ষতি থেকে কল্যাণের দিকে পরিবর্তনের উপায়গুলো সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।
হযরত আলী (আঃ) তাঁর সন্তানকে লেখা পত্রের অন্যত্র লিখেছেন তাঁর দেওয়া উপদেশগুলো থেকে তিনটি বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে। বিষয় তিনটি হলোঃ এ্যাক-আল্লাহকে ভয় করা,দুই-ফরজ কাজগুলো আদায় করা এবং তিন- পুণ্যবান এবং তাঁদের পিতৃপুরুষদের অনুসরণ করা। আলী (আঃ) একইভাবে তাঁর সন্তানের কাছ থেকে চেয়েছেন যে,এই পথ অতিক্রম করার জন্যে সবসময় যেন আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে। তিনি বলেন-মনে রেখো প্রিয় সন্তান আমার! আমি পছন্দ করি যে-আমার দেওয়া উপদেশগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে বেশি যার ওপর আমল করবে তা হলো আল্লাহকে ভয় করা,আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের ওপর এবং রিযিকের ওপর পরিতৃপ্ত থাকা এবং তোমার খান্দানের সচ্চরিত্রবানদের পথে চলা। কেননা তাঁরা তোমার মতোই কখনোই আত্মপর্যালোচনা করতে ভোলেন নি এবং অবশেষে যা চিনতে পেরেছেন তাকে কাজে লাগিয়েছেন। পথ অতিক্রম করার আগে অবশ্যই আল্লাহর কাছে সাহায্য ও সাফল্য কামনা করবে এবং একান্তই তাঁর ওপর নির্ভর করবে।
আলী (আঃ) এর চিঠির ধারাহিকতায় আল্লাহর প্রশংসা এবং মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সক্ষমতা ও শক্তির কথা এসেছে। মানুষ যে তার সকল যোগ্যতা ও শক্তি-সামর্থ আল্লাহর কাছ থেকেই পেয়েছে এবং সেজণ্যেই মানুষের উচিত কেবলমাত্র আল্লাহরই ওপর নির্ভর করা। সকল ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহকেই স্মরণ করা মানুষের অবশ্য কর্তব্য হওয়া উচিত বলে আলী (আঃ) উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি আরো বলেছেন,হে প্রিয় পুত্র আমার! মনে রেখো! যিনি মানুষের মৃত্যু নির্ধারণ করেন,তিনি হলেন সেই সত্ত্বা যাঁর হাতে তার জীবন রয়েছে,যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি হলেন সেই সত্ত্বা যিনি মৃত্যু দেন। আর যিনি ধ্বংস করেন তিনিই আবার প্রত্যাবর্তন করাবেন।
জেনে রাখো! কাজের পুরস্কারও রয়েছে পরিণাম দিবসে। যখন তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তখন তুমি কিছুই জানতে না। পরে তুমি জানতে শিখেছো। তাই এমন কারো বন্দেগি করা উচিত যে তোমাকে সৃষ্টি করেছে,তোমাকে প্রতিপালন করেছে, তোমাকে আহার্য দিয়েছে। কেবল তারি বন্দেগি করো এবং তার ওপর নির্ভরতায় অটল থাকো,কেবল তাকেই ভয় করো।
ইমাম হাসান (আঃ) কে লেখা চিঠির অন্য এক অংশে ইমাম আলী (আঃ) পৃথিবী এবং পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান সম্পর্কে কথা বলেছেন। তারপর একটি উদাহরণ দিয়ে মানুষের মধ্যকার দুটি দলের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। একটি দল হলো যারা নশ্বর এই পৃথিবীকে খুব ভালোভাবে চেনেন এবং জানেন ,তাই নিজেদেরকে তাঁরা এই পৃথিবীতে ক্ষণিকের পান্থ হিসেবে মনে করেন। অন্য দলটি হলো যারা পার্থিব এই দুনিয়ার জালে আটকা পড়েন এবং পরিনতিতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হন। চলুন আমরা বরং ইমাম আলী (আঃ) এর নিজের বক্তব্যটিই সরাসরি শুনি। তিনি বলেছেনঃ
প্রিয় পুত্র আমার! আমি তোমাকে দুনিয়া সম্পর্কে অবহিত করলাম-দুনিয়ার নশ্বরতা সম্পর্কে,দুনিয়ার পরিবর্তন বা রূপান্তর সম্পর্কে।তোমাকে এ-ও জানিয়েছি পরবর্তী জগত সম্পর্কে,মানুষের জন্যে যে জগতটি প্রস্তুত রয়েছে। এ ব্যাপারে তোমার জন্যে এমন কিছু উদাহরণ টানবো যাতে ঐ উদাহরণ থেকে চিন্তা করতে পারো এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারো। এমন একটি ভ্রমণকারী দল রয়েছে যারা এমন একটি ঘর বেছে নেয় এবং সেই ঘরে যাবার জন্যে ভ্রমণের কষ্ট ভোগ করে যাতে কাঙ্খিত সেই ঘরে গিয়ে পৌঁছুতে পারে এবং পরিপূর্ণ সুখ লাভ করতে পারে। এরা পথের কষ্টটাকে কষ্টই মনে করে না এবং সেই ঘরে প্রবেশ করার চাইতে তাদের কাছে বেশি আনন্দায়ক আর কোনো কিছুই নেই।
অন্যদিকে যারা এই পৃথিবীর প্রেমে মুগ্ধ হয়েছে,পার্থিব জগতের ফাঁদে আটকা পড়েছে,তারা হলো সেই দলটির মতো যারা নিয়ামতপূর্ণ স্থান ছেড়ে শুষ্ক-খরা আর পানিহীন,বৃক্ষহীন বিরান এক ভূমির বাসিন্দা হয়। তাদের কাছে সবচেয়ে কষ্টকর এবং অসন্তোষজনক বিষয়টিই হলো সেই ঘরটি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যে ঘরটিতে একসময় তারা বাস করতো।
মালঞ্চ-১৫
পাঠক! গত আসরে আমরা ইমাম হাসান (আঃ) কে লেখা আমিরুল মুমেনিন আলী (আঃ) এর একটি চিঠি নিয়ে কথা বলেছিলাম। আশা করি আপনাদের মনে আছে। সেই চিঠিতে বিচিত্র বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। তাই আমরা কথা দিয়েছিলাম যে আজকের আসরেও গুরুত্বপূর্ণ ঐ চিঠিটির আরো কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলবো। তো চলুন কথা না বাড়িয়ে আমরা ইমামের লেখা চিঠির মাঝে ফিরে যাই।
একটি কথা বহু মনীষীর মুখেই বলতে শোনা যায় যে,যা কিছু তোমার নিজের জন্যে পছন্দ করো তা অন্যদের জন্যেও পছন্দ ক'রো। আর যা কিছু তুমি তোমার নিজের জন্যে পছন্দ করো না,তা অন্যদের জন্যেও ক'রো না। এটা এমন এক নৈতিক বিধান যা প্রত্যেক জাতি-গোত্রের কাছেই সম্মানীয় এবং গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। নিঃসন্দেহে নৈতিকতা এবং সামজিক বিধি-বিধানগুলো মেনে চললে মানুষের ভেতরটা পঙ্কিলতামুক্ত হয় অর্থাৎ অন্তরের ভেতরকার সকল দূষণ বিদূরিত হয়ে যায়,ব্যক্তিকে মানসিক সুস্থতা ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দান করে এবং সমাজে বন্ধুত্ব ও সমঝোতাপূর্ণ একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আর এ রকম পরিবেশে একজন মানুষ সঠিক ও যথার্থ জীবন যাপন করতে পারে এবং ব্যক্তি নিজেকে তার কাঙ্খিত মঞ্জিলে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আলী (আঃ) এই নীতিমালা সম্পর্কে তাঁর সন্তান ইমাম হাসান (আঃ) কে উপদেশ দিয়ে বলেছেনঃ প্রিয় পুত্র আমার! নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করো! তারপর নিজের জন্যে যা কিছু ভালোবাসো তা অন্যদের জন্যেও ভালোবেসো! আর যা কিছু নিজের জন্যে পছন্দ করো না,তা অণ্যদের জন্যেও পছন্দ করো না। কক্ষনো কারো ওপর অন্যায়-অবিচার করবে না কেননা তুমি নিজেও পছন্দ করো না কেউ তোমার ওপর অবিচার করুক। দয়াপরবশ হও কেননা তুমি নিজেও তোমার জন্যে তাই পছন্দ করো। অন্যদের মাঝে যা কিছু খারাপ বা মন্দ বলে মনে করো,তা তোমার মাঝেও মন্দ বলেই মনে করো। যা কিছু তুমি শুনতে চাও না তা কখনোই অন্যদেরকেও বলবে না।
আলী (আঃ) একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ও সাহসী ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কেই তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিয়েছেন। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন যে,তখনি একটি সুন্দর সমাজ সৃষ্টি হবে যখন সেই সমাজের লোকজন একজন আদর্শ মানুষের গুণাবলিগুলোকে নিজর মাঝে লালন করবে এবং তার আলোকে নিজের মাঝে মানবীয় পূর্ণতার বিকাশ ঘটাবে। স্বয়ং ইমাম আলী (আঃ) এর জীবনেও নৈতিক মূল্যবোধের চিরন্তন বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল,আর সেটাই ছিল তাঁর সাফল্যের মূল শক্তি বা চাবিকাঠি।

ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, ইমাম আলী (আঃ) যুদ্ধের সময় পর্যন্ত শত্রুপক্ষের সাথে শালীন ও ন্যায় আচরণ করার মতো বিনয় ও মহত্ব দেখিয়েছেন। নৈতিকতার উপদেশ দিতে গিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্যের অন্যত্র বলেছেনঃ প্রিয় সন্তান আমার! যারা বেশি কথা বলে তাদের কথা নিরর্থক। যারা চিন্তাভাবনা করে তারা সচেতন ও দৃষ্টিসম্পন্ন। যারা সৎকর্মশীল তাদের সাথে পরামর্শ করো যাতে তাদের মতো হতে পারো। অসৎ লোকদের পরিহার করে চলো যাতে তাদের অন্তর্ভুক্ত না হও। সুদূর ইচ্ছা-আকাক্সক্ষাগুলো ত্যাগ করো কেননা তা হলো বোকার সওদা। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাও,সুযোগ হাতছাড়া করার আগে এবং কষ্ট পাবার আগে তাকে গনীমত মনে করো।
এরপর হযরত আলী (আঃ) শত্রুতা এবং বন্ধুত্বের ব্যাপারে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বন্ধুকে ভাইয়ের সমতুল্য বলে উল্লেখ করেছেন। বন্ধুদের সাথে সদাচরণ ও শালীন ব্যবহার করার জন্যে তিনি তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিয়েছেন। আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে মানুষের উচিত সবসময় বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রেখে চলা। ইমামের ভাষায়ঃ প্রিয় সন্তান আমার! তোমার ভাই যদি তোমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তুমি তার ওপর সদয় হও! সে যদি তোমাকে হিংসা করে তাকে ক্ষমা করে দাও! তোমার বন্ধুর শত্রুকে বন্ধু বানিও না যাতে তোমাকে তোমার বন্ধুর শত্রুতে পরিনত হতে না হয়। তোমার ভাইকে উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিক হও। বন্ধুর কাছ থেকে যদি বিচ্ছিন্ন হতে চাও বন্ধুত্বের কিছুটা রেশ নিজের কাছে রেখে দাও। যে তোমাকে চায় না তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ো না।
নাহজুল বালাগার এইসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায় ইমাম আলী (আঃ) কতোটা মহান এবং উচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এই বিদগ্ধ মণীষার কারণে এবং মহান মর্যাদার কারণে বিশ্বের জ্ঞানী-গুণী চিন্তাবিদরাও ইমামের প্রতি শ্রদ্ধায় বিমুগ্ধচিত্ত হয়ে আছেন। ডক্টর যাকি মোবারক বলেছেনঃ আমি বিশ্বাস করি নাহজুল বালাগা পড়ার মাধ্যমে মানুষের পৌরুষ এবং বীরত্বপূর্ণ আত্মা শক্তিশালী হয়। কেননা এই গ্রন্থ এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের হৃদয় নিংড়ানো বাণীর সংকলন, যিনি সর্বপ্রকার বৈরিতা বা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সিংহের মতো দাঁড়িয়েছেন।  
মালঞ্চ-১৬
পাঠক! আজকের আসরে আমরা নাহজুল বালাগায় কোরআন বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। হাকিম নিশাবুরি থেকে বর্ণিত একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করবো মালঞ্চের আজকের আসর। রাসূলে খোদা (সা) বলেছেন-আলী কোরআনের সাথে এবং কোরআন আলীর সাথে। কিয়ামত পর্যন্ত কোরআন এবং আলী একে অপরের কাছ থেকে কখনো পৃথক হবে না।
কোরআন হলো মানুষের জন্যে জীবনবিধান সংবলিত একটি ঐশী গ্রন্থ। ইহকাল এবং পরকালে মানবতার মুক্তির জন্যে পথনির্দেশক হিসেবে এই ঐশী গ্রন্থটিকে প্রেরণ করা হয়েছে। কোরআন তাই মূল পথের নীতি-আদর্শের নির্দেশনা দেয়। এই রেখা বা লাইনগুলো হলো এমন চেরাগের মতো যেই চেরাগের সাহায্যে চলার পথ দেখতে পাওয়া যায়। আর এই পথ দেখানোর ক্ষেত্রে আলী (আঃ) হলেন নবীজীর এর পাশাপাশি একজন গাইড।
আলী (আঃ) সেই ছোটোবেলা থেকেই নবীজীর সাহচর্যে ছিলেন। তিনি নবীজীর ওপর ওহী নাযিলের সাক্ষী। তিনি ছিলেন একাধারে কোরআনের হাফেজ, কোরআনের লেখক,কোরআনের ক্বারী এবং কোরআনের মুফাসসির। ওহীর পরিবেশে প্রতিপালিত হওয়া ছাড়াও নবীজীর জীবদ্দশায় এবং তাঁর পরবর্তীকালেও কোরআন প্রশিক্ষণ, কোরআন লেখা, কোরআন শেখানো ইত্যাদিতে তিনি তাঁর সময়ের একটা অংশ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই নাহজুল বালাগার বিভিন্ন স্থানে কোরআনের বক্তব্য বা উদ্ধৃতি এসেছে। আলী (আঃ) তাঁর বক্তব্যের একটা অংশে কোরআনের বর্ণনা দিয়েছেন, কোরআনের গুরুত্ব,কোরআনের মর্যাদা এবং সমাজে তার ভূমিকা সম্পর্কেও বলেছেন,অপর অংশে কোরআনের পরিচয় এবং কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন।
হযরত আলী (আঃ) কোরআনকে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নত মূল্যবোধ সম্পন্ন একটি ধর্মীয় গ্রন্থ বলে মনে করেন এবং তাঁর বক্তব্যে কোরআনের ব্যতিক্রমধর্মী ও অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো মানুষের জন্যে পুনরায় উল্লেখিত হয়েছে। মানবীয় চিন্তার ওপরে কোরআনের শ্রেষ্ঠত্বকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে কোরআন নজিরবিহীন এবং অভিনব এক সংকলন যা সর্বজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এতে বাতিলের কোনো স্থান নেই এবং প্রাচীনত্বের কোনো আবরণ কোরআনের ওপর পড়ে না। তাকওয়ার ব্যাপারে জনগণকে উপদেশ দিতে গিয়ে তিনি আল্লাহর কিতাবকে তুলে ধরেছেন এভাবেঃআল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনকে নবীজীর ওপর নাযিল করেছেন। যে নূরের দীপ্তি কখনো নেভে না। এটি এমন এক চেরাগ যার ঔজ্জ্বল্য কখনো অস্তমিত হয় না। এটি এমন এক মহাসমুদ্র যার গভীরতা অনুভব করা যায় না। কোরআনের পথ এমন এক পথ যে পথে গোমরাহীর কোনো স্থান নেই। এটি এমন এক মশাল যার রশ্মিতে আঁধারের কোনো স্থান নেই। কোরআন হলো সত্য এবং মিথ্যাকে আলাদাকারী। কোরআনের যুক্তপ্রমাণ অকাট্য,তা পরাভূত হয় না। কোরআন এমন এক স্থাপত্য যার পিলারগুলো অক্ষয়-অনড়।
ইমাম আলী (আঃ) তাঁর বক্তব্যে কোরআনের বহু চিত্র এঁকেছেন এবং কোরআনকে তিনি বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে সত্য হলো নিরাময়, সম্মানের উৎস এবং মুক্তির পথপ্রদর্শক। তাঁর যে সাহিত্যিক প্রতিভা রয়েছে এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর সাহচর্যে থেকে তিনি যে জ্ঞান লাভ করেছেন সেসবকে তিনি কোরআন ব্যাখ্যার কাজে লাগিয়েছেন। কোরআন হচ্ছে ঈমান এবং তার মূল খনি,প্রজ্ঞার ঝর্ণাধারা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমুদ্র। কোরআন ন্যায়ের উৎস এবং ন্যায়নীতির বহমান ধারা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনকে জ্ঞানীদের তৃষ্ণা নিবারণকারী,গভীর চিন্তার অধিকারী অন্তরগুলোর জন্যে আনন্দদায়ক বসন্ত এবং পূণ্যবানদের তৎপরতার জন্যে একটি আলোকিত পথ হিসেবে স্থাপন করেছেন।
কোরআনের গভীর আধ্যাত্মিক প্রভাব রয়েছে যা আত্মার গভীরে প্রবেশ করে। কোরআনের আয়াতের মাঝে যে সঙ্গীত বা সুর লুকানো আছে,তা অন্তরে বিশেষ একটা শিল্পসুষমা দেয় যার ফলে অন্তরে প্রশান্তি আসে। এজন্যেই ইমাম আলী (আঃ) বলেছেনঃ এই কিতাব এমন এক ঔষধ যার প্রয়োগে কোনোরকম রোগের অস্তিত্ব থাকে না। এই কিতাব তাদের জন্যে সম্মান ও মর্যাদার উৎস যারা তাকে মনোনীত করে। যারা কোরআনের মাঝে ডুবে যায় তাদের জণ্যে কোরআন হচ্ছে নিরাপদ স্থান। কোরআন তাদের মুক্তিদাতা যারা কোরআন অনুযায়ী আমল করে।
হযরত আলী (আঃ) হলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর সকল সম্মান ও মর্যাদা কোরআনের মাধ্যম বা ছায়াতেই অর্জিত হয়েছে। তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব জুড়েই রয়েছে কোরআনের কোরআনের বাণীর প্রভাব। এ কারণেই তিনি চেষ্টা করেছেন,মানুষকে হেদায়েতের এই উৎসটির সাথে পরিচয় করাতে।নাহজুল বালাগায় এসেছে তিনি বলেছেন কোরআন তোমাদের হাতের নাগালে রয়েছে। শিক্ষণীয় এবং উপদেশময় এই গ্রন্থটিকে তোমাদের কর্মসূচি প্রণয়নকারীরূপে গ্রহণ করো। তিনি আরো বলেছেন কোরআনের বর্ণনা থেকে অর্জন করে উপকৃত হও। কোরআনের উপদেশগুলো শোনো এবং সেগুলোকে গ্রহণ করো। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন,তিনি তোমাদের ওপর সকল আপত্তিকর পথকে বন্ধ করে দিয়েছেন এবং তাঁর হুজ্জাতকে তোমাদের ওপর সম্পন্ন করে দিয়েছেন।
আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে কোরআনের বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণ দুটি দিক রয়েছে। কোরআনের বাহ্যিক দিকটি আকর্ষণীয় এবং বিস্ময়কর। কিন্তু কোরআনের পরোক্ষ দিকটি এতোবেশি শেকড়ময় যে,মানুষ যতো গভীর চিন্তার অধিকারীই হোক না কেন,কোরআনের গভীরতা উপলব্ধি করার যোগ্য নয়। তবে যতো বেশি কোরআন নিয়ে চর্চা করবে ততো বেশি কোরআন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। সেজন্যেই ইমাম আলী (আঃ) সবাইকে কোরআন চর্চার দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। কোরআন চর্চাকে তিনি পরহেজগার এবং পুণ্যবানদের বৈশিষ্ট্যাবলির একটি বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন,যারা কোরআনের আত্মা থেকে দূরে তারা সবসময়ই মুখাপেক্ষী। মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্যে বা সমাজের সংকটগুলো দূর করার জন্যে কোরআনই যথেষ্ট। তো পাঠক! আসরের সময় ফুরিয়ে এসেছে। এখানেই বিদায় নিতে হচ্ছে। আগামী আসরে আবারো কথা হবে। তখনো আপনাদেরকে মালঞ্চের সাথে পাবো-এ প্রত্যাশা রইলো। যারা সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
মালঞ্চ-১৭
পাঠক! নাহজুল বালাগার অনুবাদক বিখ্যাত কবি ও লেখক জনাব নাসের আহমাদ যাদেহ'র বক্তব্য দিয়ে শুরু করবো আজকের আসর।
গতবছর জনাব নাসের আহমাদ যাদেহ'র অনূদিত নাহজুল বালাগাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাঝে বছরের শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে মনোনীত হয়েছিল। জনাব আহমাদ যাদেহ বলেছেনঃ আমি প্রজ্ঞা ও প্রেমের অন্বেষণে ছিলাম। আমাকে নাহজুল বালাগার সুস্পষ্ট অনুপ্রেরণা তার সিক্ত তরঙ্গের বিভিন্ন তীরে টেনে নিয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো এই যে,আলী (আঃ) আমাকে মহান এক ভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আর আমি জানতাম যে নাহজুল বালাগা হলো একটি জীবনের গ্রন্থ। নাহজুল বালাগার চিন্তা-চেতনাগুলো জীবনের প্রয়োজনে এসেছে। এই বই মানুষকে শিল্পগুণে গুণান্বিত মানুষ হবার চিত্র আঁকে অর্থাৎ অসম্ভব কার্যকলী একটি বই এটি। নাহজুল বালাগা পড়ে উজ্জীবিত হওয়ায় আমি খুবই আনন্দিত।
পরহেজগারী এমন একটা বিষয় যে ব্যাপারে আল্লাহর সকল নবী-রাসূলই মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে কোরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো মানুষের পারস্পরিক সম্মান-মর্যাদার উচ্চতর উৎস হলো একমাত্র পরহেজগারী। আলী (আঃ)ও নাহজুল বালাগায় পরহেজগারীর মতো আল্লাহর প্রতি আত্মনিবেদনের শ্রেষ্ঠ এই মাধ্যমটি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি সবসময়ই আল্লাহর নাম নিয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করেছেন। এক বতৃতায় তিনি বলেন আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের জন্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।আল্লাহ রঅধিকার আদায়ে তাঁর কাছ থেকেই সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ হলেন মহান এবং সর্বশক্তিমান। তাঁর সিপাহীরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই আল্লাহকে ভয় করো এবং তাকওয়াবান হও।
মানুষ যদি তার অভ্যন্তরে আত্মিক এবং আধ্যাত্মিকতা অবস্থাকে লালন করে এবং আভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর অভিজ্ঞ হয়,তাহলে সে যে কেবল গুনাহর দিকেই ধাবিত হবে না-তাই নয়,বরং তার নিজের ওপর যে আত্মনিয়ন্ত্রণ রয়েছে,সেই শক্তি ব্যাপক বৃদ্ধি পায় এবং সেই শক্তি আত্মাকে শক্তি যোগায়।আর এই শক্তিটাই হলো পরহেজগারী। আলী (আঃ) সকল মানুষের উদ্দেশ্যে বলেছেনঃ হে আল্লাহর বান্দারা! তোমাদের আল্লাহর তাকওয়ার দিকে আহ্বান জানাই। তাকওয়া হলো কিয়ামতের সফরের পাথেয়। পরহেজগারী এমন এক পাথেয় যা মানুষকে তার মঞ্জিলে মকসুদে অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নিয়ে যায়। তাকওয়া এমন এক আশ্রয়স্থল যেখানে সবাই নিরাপদ।
অনেকে মনে করেন যে তাকওয়া বোধ হয় নির্দিষ্ট একটা শ্রেণীর মানুষের জণ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ প্রকৃত সত্য হলো পরহেজগারী হলো ব্যক্তির সৌভাগ্যবান হবার নেপথ্য শক্তি। পরহেজগারী মানুষকে ক্ষণিকের ভোগ-বিলাস থেকে দূরে রাখে যাতে সে তার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে। সে একধরনের ছাত্রের মতো যে কিনা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্যে তার বহু ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি দেয়। জ্ঞানান্বেষি যদিও নিজেকে কিছু কিছু জিনিসের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলে এবং সর্বান্তকরণে সে বেশি বেশি জানার পেছনেই পড়ে থাকে। তার এই সীমাবদ্ধতা কিন্তু তারি নিজস্ব উন্নতির সোপান।
ব্যাপারটা এমন যে,তাকওয়াবান মানুষকে সুস্থ চিন্তা ও সুস্পষ্ট লক্ষ্যের অধিকারী ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হয়। আলী (আঃ) এর ভাষায় নফসের লাগাম তার নিজ হাতে রয়েছে। এ কারণে আলী (আঃ) পরহেজগারীকে নফসের সম্মান ও মুক্তির কারণ বলে মনে করেন। নাহজুল বালাগায় তিনি বলেছেনঃ তাকওয়া হলো কিয়ামতের যথার্থ সঞ্চয় এবং উপযুক্ত চাবি। সর্বপ্রকার গোলামি থেকে মুক্তির উপায়। সকল প্রকার দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তির পথ। তাকওয়ার মাধ্যমে মানুষ তার নিজের লক্ষ্যে পৌঁছে , শত্রু থেকে রেহাই পায় এবং নিজস্ব ইচ্ছাগুলোকে বাস্তবায়িত করতে পারে।
পরহেজগারী মানুষের অন্তরাত্মায় পুণ্য ও কল্যাণকামী চিন্তার বিকাশ ঘটায়। আলী (আঃ) এর মতে যাঁরা এই পথে পা ফেলেন তাদের সংখ্যা খুবই কম। কেননা নাহজুল বালাগার বিভিন্ন স্থানে আমরা আমিরুল মুমেনিনের আহ্বান লক্ষ্য করবো। তিনি চেয়েছেন,মানুষ নিজেকে পরহেজগারীর আলোকে সমৃদ্ধ করুক। অন্তরকে যেন তারা পরহেজগারীর চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। তিনি বলেছেন পরহেজগার ব্যক্তিকে সমাজে উচ্চ মর্যাদাবান ও সম্মানীয় মনে করতে হবে। কেননা তাঁরা কল্যাণ ও বিনয়ের পথ অতিক্রম করে।
আলী (আঃ) বলেছেন,পরহেজগারীর বিষয়টি মনে রেখো!পার্থিব জগত থেকে পবিত্র থেকো। পরকালীন সাক্ষাতের ব্যাপারে আকর্ষণ বোধ করো। যারা তাকওয়া অর্জনের মধ্য দিয়ে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হয়েছে,তাদেরকে হীন মনে করো না। আর দুনিয়া যাদেরকে উচ্চাসনে স্থাপিত করেছে তাদেরকে উচ্চ মর্যাদাবান ভেবো না। অন্যত্র তিনি মুত্তাকিনদের বাহ্যিক আকৃতি সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন এবং তাওকয়া ও পরহেজগারীর সুস্পষ্ট নিদর্শন দেখিয়ে দিয়েছেন। আগামী আসরে ইনশাআল্লাহ এ বিষয়ে আরো কথা বলার চেষ্টা করবো। তখনো আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন-এ প্রত্যাশা রইলো।
মালঞ্চ-১৮
পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে আজকের আসরে ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে পরহেজগার লোকদের স্বরূপ নিয়ে কথা বলবো। সে অনুযায়ী চলুন আলোচনা শুরু করা যাক। নাহজুল বালাগায় আলী (আঃ) বহুবার মুমিনের বৈশিষ্ট্য বা স্বরূপ এঁকেছেন। একইভাবে মোত্তাকিনদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেছেন। হাম্মাম নামে একজন পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। একদিন তিনি হযরত আলী (আঃ) এর খেদমতে হাজির হয়ে বললো,হে আমিরুল মোমেনিন! আপনি মোত্তাকিনদের কথা এমনভাবে বর্ণনা করুন যাতে মনে হয় আমি তাদের দেখছি। হযরত খানিক কালক্ষেপণ করে বললেনঃ হে হাম্মাম! তুমি নিজে খোদাকে ভয় করো এবং ভালো কাজ করো। খোদা পরহেজগার এবং পুণ্যবানদের সাথে রয়েছেন। কিন্তু হাম্মাম এই উত্তরে তুষ্ট বা পরিতৃপ্ত হলো না,সে আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইলো। তাদের বসবাস পদ্ধতি,তাদের ইবাদাত-বন্দেগির পদ্ধতি এবং তাদের জীবনযাপন পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাইলো। তখন ইমাম আলী (আঃ) মুমিনদের বৈশিষ্ট্য এবং মুত্তাকিনদের স্বরূপ সম্পর্কে শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক বর্ণনা করেন।
আলী (আঃ) এর বক্তব্যে মুমিন এবং মুত্তাকি ব্যক্তিরা জ্ঞানী এবং মর্যাদাবান। তাঁরা সত্য ব্যতিত অন্য কিছু বলেন না,তাঁদের মাঝে উগ্রতা নেই,তারা ভারসাম্যপূর্ণ এবং মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। আল্লাহ যেসব বস্তু মানুষের জন্যে হারাম করেছেন সেসবের ওপর থেকে তাদের দৃষ্টি ফেরানো। উত্তম ও ফযিলতপূর্ণ ভাষণের দিকে তাঁদের কান সবসময় পাতা থাকে। আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি তারা এতোটাই অনুগত যে আনন্দ-বেদনা তাদের কাছে এক সমান। দেহ কাঠামোটা তাদের আত্মার জন্যে একটা ছোট খাঁচার মতো। মৃত্যু যদি তাদের জন্যে নির্ধারিত না হয়ে থাকতো তাহলে তারা ঐ খাঁচাটিকে এক মুহূর্তের জন্যেও সহ্য করতো না। সওয়াবের আশায় এবং শাস্তির ভয়ে তারা প্রাণ দিয়ে দেয়।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এ সম্পর্কে বলেছেনঃ ধর্মীয় ব্যক্তিরা নিজেদের অস্তিত্বকে এক ধরনের কারাগারে আবদ্ধ বলে ভাবে। তারা চায় দেহের খাঁচা থেকে উড়াল দিতে এবং সমস্ত অস্তিত্বকে একবারে একটি ইউনিট হিসেবে পেতে। অবশ্য আলী (আঃ) এর বক্তব্যে এই সত্যটি আরো বিস্তারিত এবং পরিপূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে মুমিন ব্যক্তি জানে যে সত্ত্বার একটি অংশের সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে কেননা সমগ্র সত্ত্বা হলো বিশাল সমুদ্রের মতো অসীম। সেজন্যেই তারা হঠাৎ কাঠামো ভেঙ্গে তাদের অন্তরকে মুক্তি দেয়। হাম্মাম সংক্রান্ত ইমাম আলীর ভাষণেও এ বিষয়টি এসেছে। যখন পরহেজগারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা সম্পর্কে ইমামের বক্তব্য শেষ হয় হাম্মাম তখন চিৎকার করে ওঠে এবং মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
যে ব্যক্তি তার চিন্তাকে পার্থিব জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না করে এই বিশ্বের কোনো উৎকণ্ঠা তার নেই এবং যাই সে করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই করে,তার এই মানসিক প্রশান্তি অদৃশ্যের প্রতি তার ঈমান এবং পরকালের প্রতি তাঁর বিশ্বাস থেকেই উদ্ভুত। আমরা বরং আলী (আঃ) এর বক্তব্যের প্রতিই মনোযোগ দিই। পরেহজগারগণ রাতের বেলা নামাযে দাঁড়ান কোরআন পড়েন,মুখস্ত করেন,অন্তরে বেদনা দূর করার ঔষধ তাঁরা কোরআনে অন্বেষণ করেন। যখন বেহেশতের বর্ণনা সংবলিত আয়াত সামনে আসে তখন তাদের সামনে বেহেশতের চিত্র এমনভাবে ফুটে ওঠে যেন মনে হয় বেহেশতের নিয়ামতগুলো তারা তাদের সামনে দেখতে পাচ্ছে। আর যখন দোযখের আযাবের আয়াত সামনে আসে তখন মনে হয় তারা যেন তা প্রত্যক্ষ করছে,তাই দ্রুত তারা রুকু-সিজদায় গিয়ে আল্লাহর দরবারে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি কামনা করে। কিন্তু দিনের বেলায় পরহেজগারদের দেখবে ভীষণ নম্র,ভদ্র ও সহনশীল। তারা তাদের জ্ঞান এবং তাকওয়ার মাধ্যমে পুণ্য কাজ করে। আল্লাহর ভয় তাদেরকে ধনুকের মতো বাঁকা করে ফেলেছে। যারা তাদের দিকে তাকায় ভাবে তারা অসুস্থ আসলে তাদের কোনো রোগ নেই। আলী (আঃ) পরহেজগারদের নৈতিক গুণাবলি সম্পর্কে আরো বলেনঃ পরহেজগারদের নিদর্শন হলো তাঁরা ভীষণ দ্বীনদার,নম্র-ভদ্র,দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী,দৃঢ় ঈমানদার,জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে লোভী, সহনশীল জ্ঞানী,সম্পদের ব্যাপারে মিতব্যয়ী,ইবাদাতের ক্ষেত্রে বিনয়ী,দারিদ্র্যে সজ্জিত,কষ্ট সহিষ্ণু,হালালের সন্ধানে থাকা,হেদায়েতের পথে প্রফুল্ল আর লোভ-লালসা পরিত্যাগী।
পাঠক! ইমাম আলী (আঃ) এর ভাষণটি বেশ দীর্ঘ হবার কারণে সংক্ষিপ্ত পরিসরের এ আসরে পুরোপুরি উপস্থাপন করা গেল না। আপনারা যারা ইমাম আলী (আঃ) এর ভাষণটি পুরোপুরি শুনতে বা পড়তে চান তাঁরা নাহজুল বালাগার ১৯৩ নম্বর ভাষণটি পড়তে পারেন। এ ভাষণটিকে খুৎবায়ে হাম্মাম বা খুৎবায়ে মুত্তাকিন বলা হয়। আল্লাহ আমাদেরকেও তাকওয়াবানদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করুন-এই প্রার্থনা করে মালঞ্চের আজকের আসর থেকে এখানেই বিদায় নিচ্ছে।
মালঞ্চ-১৯
ইমাম আলী (আঃ) একজন উচ্চ মর্যাদাবান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মানব সমাজের একজন বড়ো চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি খ্যাতিমান। জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সুনির্দিষ্ট ও সুপ্রযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তিনি তাঁর অসামান্য জ্ঞানের ভিত্তিতে সঠিক ও সুগভীর দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে ন্যায় ও কল্যাণময় সমাজ বিনির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন যদিও তিনি তা বাস্তবায়ন করার মতো যথেষ্ট সময় পান নি। তবে তাঁর সেই সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নজিরবিহীন একটি আদর্শ হিসেবে আজো বর্তমান রয়েছে। যাই হোক আমরা আজো নাহজুল বালাগা নিয়ে খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো-আপনারা যথারীতি আমাদের সাথেই আছেন-এ প্রত্যাশা রইলো।
ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে একটি আদর্শ সমাজের প্রথম বৈশিষ্ট্যটি হলো আদর্শ সমাজের কাঠামো বিনির্মিত হতে হবে একত্ববাদ এবং আল্লাহর বন্দেগির ওপর ভিত্তি করে। সমাজের শাসকশ্রেণী নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বা উপদেশ হলো তারা যেন নিজেদের এবং নিজেদের খোদার জন্যে সর্বোত্তম সময়টুকু নির্বাচন করেন এবং তারপর জনগণের হাতে হাত মিলিয়ে সমাজে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করেন। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর অধীনস্থ গভর্নরদেরকে প্রায়ই সতর্ক করে চিঠি দিতেন। সেসব চিঠি নাহজুল বালাগা নামক সংকলনে বিধৃত রয়েছে।
হযরত আলী (আঃ) যে সফল সমাজে শাসন করেছিলেন,সেখানে জনগণ এবং চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবীগণ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে তাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালিয়েছিলেন।কোনোক্রমেই নিজেদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে তারা উদাসীন ছিলেন না। তারা আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ছিলেন পরস্পরে ঐক্যবদ্ধ ও সহযোগী। আলী (আঃ) তাঁর এক প্রতিনিধিকে বলেছিলেন মানুষকে এতো বেশি ভালোবাসবে,একজন বাবা বা মা তার সন্তানদেরকে যতোটা ভালোবাসে। তিনি তাঁর এক সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বলেছিলেনঃ তুমি তো তাদেরই একজন দ্বীনের ব্যাপারে সাহায্যকারীদের মধ্য থেকে যাদের কাছ থেকে আমি সহযোগিতা নেই এবং যেসব গুনাহগারদের ঔদ্ধত্য ও অহংকারকে গুঁড়িয়ে দেই। অতএব সকল সমস্যায় আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করো। খিটমিটে স্বভাবকে নম্র করো। যেখানে আপোষ করা ভালো মনে করো,সেখানে তাই করো। আর যেখানে সোজা আঙ্গুলে ঘি ওঠে না সেখানে আঙ্গুল বাঁকা করো।নাগরিকদের সামনে তোমার পাখা-পালক মেলে ধরো। চোখের দৃষ্টি এবং ইশারাতেও মানুষের সাথে বিনয়ী হও। সালাম করার ক্ষেত্রে কিংবা ইশারা করার ক্ষেত্রে সবার সাথে সমান আচরণ করো যাতে বলদর্পীরা তোমাকে বিরক্ত করার সুযোগ না পায় আর অক্ষম অসহায়গণ তোমার ন্যায়নীতির ব্যাপারে নিরাশ না হয়।
নাহজুল বালাগায় বর্ণিত সমাজ এবং হুকুমাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো সমাজের জনগণের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করা এবং মতবিনিময় করা। ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিতে সমাজ পরিচালনার ব্যাপারে সর্বোত্তম ও সঠিক উপায়গুলো খুঁজে পাবার জন্যে ভুলভ্রান্তিগুলো এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। একটি সমাজের বিকাশের ব্যাপারে আলী (আঃ) বলেছেনঃ পরামর্শের চেয়ে উত্তম আর কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। যারা জনমত এবং বিচিত্ররকম দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাগত জানায়,তারা ভুল থেকে শুদ্ধটাকে ভালোভাবেই আলাদা করে নিতে পারে।
একটা সমাজকে কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে হলে সেই সমাজের ভ্রান্ত মূল্যবোধ ও আচার-প্রথায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং দৃষ্টিভঙ্গি আর সচেতনতা সে সমাজের স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হতে হবে। যে সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনগ্রসর,সেই সমাজ অন্যদের ক্রীড়নক বা হাতিয়ারে পরিনত হয়।আর যতোই জ্ঞান-বিদ্যা-বুদ্ধির উন্নতি হবে সে সমাজের লোকজনকে সুবিধাবাদীরা তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহার করতে পারবে। আলী (আঃ) তাই সমাজ থেকে সকল অসৎ ও অপসংস্কৃতির বিলোপ ঘটানোর ব্যাপারে চূড়ান্তরকম পক্ষপাতী। জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেনঃ আত্মনিমগ্নতার আগে এবং জ্ঞানের উৎস ও জ্ঞানী লোকদেরকে হারানোর আগেই তাড়াতাড়ি জ্ঞান অর্জনের পথে এগিয়ে যাও।
বিশ্বের বহু দেশের পশ্চাদপদতার অন্যতম একটি কারণ হলো তোষামোদবৃত্তি। তোষামোদবৃত্তি রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং নেতাদের দুর্নীতির কারণ। তোষামোদের কারণে ভালো-মন্দ বিচার করার দিকটি বিবেচনায় আনা হয় না। অযোগ্য ব্যক্তিও তোষামোদের কারণে যোগ্যতার মানদণ্ডে বিচার্য হয়ে ওঠে। হযরত আলী (আঃ) তাঁর একজন প্রতিনিধির উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ কখনোই আত্মপূজারী হবে না,নিজের ভালোত্বের ব্যাপারে আত্মতুষ্টি লাভ করো না,কখনোই প্রশংসা ভালোবেসা না। কেননা এইসবই তোমাকে পতনের অতলে নিয়ে যাবার জন্যে এবং তোমার সকল নেক আমলকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যে শয়তানের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার।
আলী (আঃ) সিফফিনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় একটা লোক তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করছিলো। আলী (আঃ) তখন বললেন,তোমরা হয়তো ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছো যে আমি হয়তো প্রশংসা পছন্দ করি কিংবা প্রশংসা আশা করি। আল্লাহর অসীম কৃপায় আমি প্রশংসা বা চাটুকারিতা পছন্দ করি না। আমি বরং সেটাই বেশি ভালোবাসি যা ভালোবাসেন আল্লাহ তায়ালা।
পাঠক! মালঞ্চের আজকের আসরের সময় ফুরিয়ে এসেছে।আগামী আসরে আমরা সুস্থ একটি সমাজ বিনির্মাণে ইমাম আলী (আঃ) এর আরো কিছু দিক-নির্দেশনা নিয়ে কথা বলবো। তখনো আপনাদের সঙ্গ পাবো-এ প্রত্যাশা রইলো।
মালঞ্চ-২০
পাঠক! ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান মালঞ্চের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা নাহজুল বালাগায় বর্ণিত আদর্শ একটি সমাজের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইমাম আলী (আঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। আজকের আসরে আমরা আদর্শ একটি সমাজে উন্নীত হবার নেপথ্য উপাদানগুলো সম্পর্কে আলী (আঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

ইমাম আলী (আঃ) এর মতে কোনো একটি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যোগ্যতা বিশেষ করে আদর্শ সমাজ পরিচালনায় দায়িত্বশীল যারা তাদের যোগ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাঁর মতে সমাজের প্রত্যেক স্তরেই এ বিষয়টির বাস্তবায়ন সমানভাবে প্রযোজ্য। নাহজুল বালাগায় বর্ণিত ইমাম আলী (আঃ) এর বক্তব্য অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা একটা জটিল এবং কঠিন গুরুদায়িত্ব। হুকুমাতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন যোগ্য,সক্ষম,সৃজনশীল এবং উপযুক্ত দায়িত্বশীল। সেই যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কাউকে যদি দায়িত্বে বসানো হয় তাহলে তাহলে সেই সমাজের উন্নতি,অগ্রগতি বা পূর্ণতা অর্জিত হবে না। আলী (আঃ) এ সম্পর্কে নাহজুল বালাগায় বলেছেনঃ শাসকদের যোগ্যতা ছাড়া জনগণের কাজে সাফল্য আসে না। অন্যত্র তিনি বলেছেন-হে জনগণ!শাসন করার উপযুক্ত সে-ই,যে সে ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত যোগ্যতরো এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত বেশি জ্ঞানী।
আদর্শ একটি সমাজের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইমাম আলী (আঃ) আরো বলেছেন,সেই সমাজই আদর্শ সমাজ যে সমাজে জনগণ ও তাদের শাসকদের যোগ্যতার পরিমাপ যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তিনি আরো বলেছেন কোনো সমাজে যদি অসাধারণ কোনো কাজ করা হয় তাহলে সেই কাজের মূল কর্তাকে উৎসাহিত করা হয়। বসরার গভর্নরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেনঃ এমন যেন না হয় যে সৎ কর্মশীল আর অসৎ কর্মশীলদেরকে এক দৃষ্টিতে দেখা হয়। সৎকর্মশীলদেরকে সৎ কাজ করার ব্যাপারে কম উৎসাহিত করা আর অসৎ কর্মশীলদেরকে মন্দ কাজের ব্যাপারে প্ররোচিত করা-এমন যেন না হয়।
একটি সমাজের আভিজাত্যর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ যেসব চালিকাশক্তি থাকে তার একটি হলো সেই সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার উপস্থিতি। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন করে। তাই একটি হুকুমাতের ভিত্তিও এই নীতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। নাহজুল বালাগায় স্বাধীনতার যে বর্ণনা এসেছে তা প্রমাণ করে যে এটা এমন কোনো অধিকার নয় যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা তাদের অধীনস্থ জনগণকে তা হস্তান্তর করবে। এ কারণেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরকে স্বাধীন একটি সমাজ বিনির্মাণের আগে জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন,তোমরা স্বাধীন। কেননা আল্লাহ পাক তোমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
ইমাম আলী (আঃ) তাঁর নিজস্ব পথের যথার্থতায় বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু জনগণের ব্যক্তিসত্ত্বাকে তিনি সম্মান করতেন। তাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন তিনি। তাঁর মতে স্বাধীনতার এই মূলনীতিটি বিরোধীদের এমনকি শত্রুদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে মেনে চলা উচিত। এক চিঠিতে ইমাম আলী (আঃ) লিখেছেন আমি রাসূলে খোদার কাছ থেকে বহুবার শুনেছি ততোক্ষণ পর্যন্ত যথার্থ একটি সমাজ বিনির্মাণ করা যাবে না যতোক্ষণ না সেখানে একজন দুর্বল মানুষ সবলের কাছ থেকে নির্ভয়ে ও অবাধে তার অধিকার আদায় করে নিতে সক্ষম না হবে।
নাহজুল বালাগায় স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বলতে বোঝানো হয়েছে একটি সমাজের সুখ-শান্তি ও সৌবাগ্যকে। কেননা ইমাম আলী (আঃ) এর সমাজেই স্বাধীনতার সেই মূল অর্থ বাস্তবে পরিলক্ষিত হয়েছে এবং সেখানে এমনকি খ্রিষ্টানরা এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনও পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ও প্রশান্তির মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করেছে। অবশ্য স্বাধীনতা হচ্ছে এমন এক মূল্যবোধ যার ব্যবহারিক বাস্তবতা সরকারের কর্মকর্তাদের গভীর বিশ্বাসের ছত্রছায়া ছাড়া এবং বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়া অর্জিত হওয়া দুরূপ ব্যাপার।
আদর্শ সমাজের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হলো জনগণকে সমান দৃষ্টিতে দেখা এবং আইন সবার জন্যে সমানভাবে কার্যকর করা। এটা ইসলামের মহান এক অবদান। ইসলাম সমাজে প্রত্যেক মানুষকে ভাই ভাই বলে মনে করে। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব আর হীনতা নির্ভর করে তাদের মানবিকতা বোধ এবং তাদের তাকওয়ার ওপর। আলী (আঃ) এর কাঙ্ক্ষিত সমাজেও মানুষের এই সমান অধিকারের বিষয়টি ছিল এবং ইসলামের এই মৌলিক বিধানটি সকল অস্তিত্ব দিয়েই অনুভব করা যেত।
মালঞ্চ-২১
পাঠক! নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণধর্মী সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। বিচিত্র ফুলের এ উদ্যানে আজো আমরা ঘুরে বেড়াবো যাতে সেখান থেকে আরো কিছু সুগন্ধি ফুল কুড়ানো যায়। আপনারা মালঞ্চের সাথেই আছেন-যথারীতি এ প্রত্যাশা করছি।
নাহজুল বালাগার গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচ্য বিষয় হলো অর্থনীতি। নাহজুল বালাগার বিভিন্ন বক্তব্যে এবং তাঁর লেখা বিভিন্ন পত্রে অর্থনীতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা রয়েছে। অর্থনীতি মানে হলো উচ্চাভিলাষ এবং হীনমন্যতার মধ্যবর্তী সীমা। অর্থনীতির এই অর্থটি সম্পর্কে আলী (আঃ) বলেছেনঃ যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে সে পরমুখাপেক্ষী হয় না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন তিনি মানুষের জন্যেই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছুকেই তিনি হিসাব-নিকাশ করে বা পরিমিত করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের দায়িত্ব হলো আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে সঠিকভাবে অর্জন করা। এ অনুযায়ী আল্লাহর নিয়ামতগুলো মানুষের প্রচেষ্টা ও কাজের সাথে সম্পৃক্ত। খোদা তায়ালা তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির জন্যেই মাটির মাঝে রুযির ব্যবস্থা রেখেছেন।
হযরত আলী (আঃ) সকল ভূখণ্ডকে আবাদ করা এবং আল্লাহর সকল বান্দাকে সৌভাগ্যশালী করা মানুষের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ খোদাকে স্মরণ রেখো! তাকওয়া অর্জন করো!আল্লাহর ভূখণ্ড এবং সেখানকার চতুষ্পদীদের ব্যাপারে তোমরা দায়িত্বশীল। তাদের অধিকারের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে মনে রেখো!
মানুষের জীবনে কল্যাণ,শান্তি ও স্বস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কারণে ইসলাম সবসময় কর্মতৎপরতার ব্যাপারে সক্রিয় থাকার ওপর জোর দিয়েছে,ইসলাম কখনোই অলসতাকে পছন্দ করে না। এ কারণেই নাহজুল বালাগায় আলী (আঃ) কর্মতৎপর হবার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন।তিনি বলেছেনঃ ব্যবসা করো এবং উৎপাদনশীল কাজে তৎপর হও-যাতে যা কিছু অন্যদের রয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে তুমি তাদের মুখাপেক্ষি না হও!
আলী (আঃ) এ সম্পর্কে পিঁপড়ার উদাহরণ দিয়েছেন। পিঁপড়া কীভাবে তাদের আয়-রোজগারের জন্যে শ্রম দেয় এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয় গড়ে তোলার চেষ্টায় আত্মনিয়োজিত হয় সে সম্পর্কে উদাহরণত তিনি বলেছেনঃ ক্ষুদ্র পিঁপড়ার দিকে তাকিয়ে দেখো-কতো ছোট্ট তার শরীর কিন্তু কতো সম্পূর্ণ। মানুষের পক্ষে ক্ষুদ্র এই প্রানীটির গঠন তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। লক্ষ্য করো-পৃথিবীর পথে সে কীভাবে চলে এবং জীবনধারনের জন্যে কীভাবে সে নিরন্তর শ্রম দিয়ে যায়,শস্যদানা বহন করে নিয়ে যায় তার গর্তে এবং নির্দিষ্ট ও নিরাপদ স্থানে তা কীভাবে সংরক্ষণ করে। শীতকালের জন্যে গ্রীষ্মকালে সে তা সংরক্ষণ করে। গর্তের ভেতরে যাওয়া এবং সেখান থেকে বের হবার বিষয়টিও লক্ষ্য করতে ভুলো না।
অর্থনীতিবিদরা মানুষের জন্যে সম্পদকেই কেবল লাভজনক বলে মনে করেন। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদটা দুই রকমের-একটা হলো বস্তগত সম্পদ অপরটি আধ্যাত্মিক সম্পদ। আলী (আঃ) জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে সবচেয়ে মূল্যবান এবং লাভজনক বলে মনে করেন। কেননা জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ অনেক বেশি পুজিঁ করতে পারে। আর যদি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নিয়ামতের অধিকারী না হয় তাহলে তার সম্পদের পুজিঁ বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোনো সম্পদই জ্ঞানের চেয়ে বেশি লাভজনক নয়। আলী (আঃ) অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্যে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে বলেছেনঃযার জীবনে প্রাচুর্য আছে তার সাথে অংশী হও! কেননা বেশি সম্পদ লাভ এবং সুপ্রসন্ন ভাগ্যের জন্যে সে-ই বেশি উপযুক্ত।
অপরদিকে আলী (আঃ) অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে স্বয়ং খেত-খামারে, বাগ-বাগিচায় কাজ করেছেন। সম্পদ জমিয়ে রাখাকে তিনি নিষেধ করেছেন। কেননা সম্পদ জমিয়ে রাখলে তা আটকে যায় অথচ সেই সম্পদ সঠিকভাবে ব্যয় করা উচিত। তাঁর দৃষ্টিতে এই ধরনের কাজ জীবন ধ্বংস করার শামিল। তাঁর ভাষায়ঃ যারা সম্পদ স্তুপিকৃত করে রাখে তারা তো মৃত যদিও বাহ্যত তাদের জীবন রয়েছে।
আলী (আঃ) স্বয়ং একজন বড়ো দানশীল। তিনি ধন-সম্পদ দান করার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজেকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং পবিত্রতা অর্জন করে,নিজের ভেতরকার মন্দ দোষগুলোকে ধুয়ে মুছে সাফ করে,কল্যাণকামী হয় এবং অতিরিক্ত সম্পদ দান করে দেয়-কতোই না সুন্দর তার অবস্থা।
আলী (আঃ) বলেছেন রুটি-রুটি দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই রুটিরুযির জণ্যে উচিত হলো বৈধ উপায়ে এবং যথার্থ পথে তা অর্জন করা।অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে লিপ্সা কিংবা কৃপণতা অন্যদের অধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়ায়। লোলুপতা,একগুয়েঁমি এবং হিংসা-বিদ্বেষ মানুষকে গুনাহের পথে নিয়ে যায়। লোভী ব্যক্তি তার সম্পদ বৃদ্ধির জন্যে ন্যায় ও সত্য পথ থেকে দূরে সরে যায়। এভাবে অসৎ মানুষের গুণাবলিগুলো তার ভেতরে এসে বাসা বাধেঁ। তিনি বলেছেন সম্পদ আর সন্তানাদি বৃদ্ধির মধ্যে কল্যাণ নেই,কল্যাণ রয়েছে জ্ঞান বৃদ্ধি এবং সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির মধ্যে। তিনি আরো বলেছেন-অন্যর টাকা দিয়ে কিংবা হারাম উপায়ে অর্জিত টাকা দিয়ে বাসা কিনবে না। যদি কেনো তাহলে অবশ্য দুনিয়া এবং আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আলী (আঃ) বলেছেনঃ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম হলো তাঁর বান্দাদের প্রদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। অল্পে তুষ্টির মানসিকতাও এক অশেষ সম্পদ যা অভাবীকে অতিরিক্ত চাহিদা থেকে ফিরিয়ে রাখে। এই সুন্দর বৈশিষ্ট্যটি যার মধ্যে রয়েছে, সে মানুষের সুখশান্তি নিয়ে এবং বিশ্বের উন্নয়নের জন্যে সবচেয়ে বেশি চিন্তাভাবনা করে। এ জন্যেই আলী (আঃ) বলেছেনঃ পরিতৃপ্তি বা অল্পে তুষ্টি হলো এমন এক সম্পদ যার কোনো পরিসমাপ্তি নেই।
মালঞ্চ-২২
পাঠক! নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণধর্মী সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। বহু মানুষ বন্ধুত্বের রীতি-নীতি সম্পর্কে জানতে চায়। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণ এমনকি মনোবিজ্ঞানীগণও তাদেঁর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন। সেইসব দৃষ্টিভঙ্গি বা মতামত বেশ মূল্যবান ও সমৃদ্ধ বৈ কি। আমরা জানি নাহজুল বালাগার স্থপতি গভীর মনোসমীক্ষক ইমাম আলী (আঃ) এর চিন্তাভাবনাগুলো কালোত্তীর্ণ মহিমায় উজ্জ্বল। তিনি এই বন্ধুত্ব সম্পর্কেও মূল্যবান দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন নাহজুল বালাগায়। তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো নিয়ে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো মালঞ্চের আজকের আসরে।
আজকাল সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের গুরুত্ব এবং তার প্রভাব বেশ স্পষ্ট। যাদের উপযুক্ত বন্ধু রয়েছে তারা কক্ষণো সাথীহীন সহযোগীহীন থাকে না। প্রকৃতপক্ষে তারা যথাযথ জীবনযাপনের জন্যে শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতা পায়। ইমাম আলী (আঃ) প্রকৃত বন্ধুদের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেনঃ বন্ধুরা হলো দুনিয়া এবং আখেরাতের সঞ্চয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই মূল্যবান এই সম্পদ অর্জনের জন্যে উচিত হলো বন্ধুত্বের রীতিনীতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া।
বন্ধু পাবার রহস্য পলায়নপর অন্তরগুলোকে বশীভূত করার মধ্যে লুকিয়ে আছে। মানুষের অন্তর সাধারণত পলায়নপর,যখন কেউ সেইসব অন্তরের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়,তখন তারা বশীভূত হয়ে যায়। কিন্তু কোন্ সেই শক্তি বলে অন্তর বশ মানে? ইমাম আলী (আঃ) সে বিষয়টি সম্পর্কে বলেছেনঃ বন্ধুত্বের মূল হাতিয়ার হলো প্রফুল্লতা। তিনি মানুষকে একটি বৃক্ষের সাথে তুলনা করে বলেছেন যে বৃক্ষের দেহটি ভীষণ শক্ত ও কঠিন তার পাতা-পল্লব শাখা-প্রশাখা কম থাকে,আর যে বৃক্ষের দেহটি নরম কোমল তার পাতাপল্লব বেশি হয়। মানব বৃক্ষের ব্যাপারেও এ সত্যটি প্রযোজ্য। যে মানুষের অন্তরটা হবে নরম এবং প্রশান্ত তার বন্ধু-বান্ধব বেশি হবে। বদমেজাজি এবং রাগী মানুষ তার বন্ধুদের হারায়।
বন্ধুত্ব নষ্ট হবার কারণ এবং পারস্পরিক বন্ধুত্ব রক্ষা করার উপায়গুলোও তিনি বর্ণনা করেছেন।আলী (আঃ) আমাদের মাঝে প্রচলিত হালকা রঙ্গ-রসিকতা বা ঠাট্টা-মস্করার পরিণতি সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন-দুঃখজনকভাবে ঠাট্টা-মস্করা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন হবার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেছেনঃ মুমিন ব্যক্তি যদি এমন কাজ করে বসে যাতে তার ভাই লজ্জা পায় অথবা রাগান্বিত হয় তাহলে তা বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হিংসা-বিদ্বেষও এমন একটি রোগ যা কেবল আত্মাকেই পেরেশান করে না বরং শরীরকেও অসুস্থ করে তোলে এবং অন্যদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ইমামের ভাষায়-বন্ধুর হিংসা সেই বন্ধুত্বের ভিত্তিহীনতারই প্রমাণ।
আলী (আঃ) বলেছেন, বন্ধুত্ব হওয়া উচিত ঈমান ও প্রকৃত ভালোবাসার ভিত্তিতে। জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান এবং সচ্চরিত্রবানদের সাথে বন্ধুত্ব করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন আর বিবেকহীনদের সাথে বন্ধুত্ব করার ব্যাপারে তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ মূর্খ বা অজ্ঞদের সহচর হয়ো না,কেননা তারা তাদের মন্দ কাজকে সুন্দর বলে তুলে ধরবে এবং তুমিও সেরকম হও-তারা সেটাই আশা করবে।
সামাজিক জীবনযাপনের জন্যে উৎকৃষ্ট এবং পরিপূর্ণ কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়ে ইমাম আলী (আঃ) তাঁর সন্তান ইমাম হাসান (আঃ) কে একটি চিঠি লিখেছেন। ঐ চিঠিতে তিনি বলেছেনঃ হে আমার সন্তান! তোমার এবং অন্যদের মাঝে তুলনা করতে শেখো! তারপর যা তোমার নিজের জন্যে পছন্দ করো অন্যদের জন্যেও তা পছন্দ করো! তোমার নিজের জন্যে যা পছন্দ করবে না তা অন্যদের জন্যেও করো না! পূর্ণতার এরকম পর্যায়ে পৌঁছা যদিও বেশ কঠিন ব্যাপার তবুও আমরা যদি সবাই পরস্পরে এ রকম ব্যবহার করি তাহলে একটি পূত পবিত্র সমাজ গড়ে উঠবে।
পাঠক! বন্ধুত্বের নিয়ম-নীতি সম্পর্কে আমরা যেটুকু আলোচনা করলাম তা খুবই সামান্য। নাহজুল বালাগায় আরো বিস্তারিতভাবে এ সম্পর্কে আলোচিত হয়েছে। আপনারা প্রয়োজনে মূল গ্রন্থটি পড়ে নিতে পারেন। যাই হোক, ইমাম আলী (আঃ) মানুষের অন্তরকে একটা প্রস্তুত ভূমির সাথে তুলনা করে বলেছেনঃ এই অন্তর-ভূমি প্রত্যেক উদ্ভিদের জন্যেই উপযোগী। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জ্ঞান-ঈমান ও আখলাকের বীজ সেখানে বপন করে মানুষের মাঝে সুপ্ত মেধা ও প্রতিভাকে বিকশিত করা যায়। আলী (আঃ) তাই বলেছেন নিজেকে এবং নিজ পরিবারকে উত্তম জিনিস শেখাও,তাদেরকে শিষ্টাচার শেখাও! তবে বিষয়টির প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তাহলো-একজন প্রশিক্ষক যা কিছু প্রশিক্ষণ দেন সে সবের চর্চা যেন তিনি নিজে করেন। অর্থাৎ প্রশিক্ষকের কথায় এবং কাজে মিল থাকতে হবে। আর তা অর্জিত হবে কেবল আল্লাহকে সবসময় হাজির নাজির জানার মধ্য দিয়ে।
আলী (আঃ) আত্মপ্রশিক্ষণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জ্ঞানের ভিত্তি ও চিন্তাকে দৃঢ় করার ওপর জোর দিয়েছেন। সেইসাথে নিজেদের ভেতরে আধ্যাত্মিকতার আলো বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। আধ্যাত্মিকতার আলোয় সিক্ত জ্ঞান ও বিবেক যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় তাহলে কামনা-বাসনার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। তিনি বলেছেন-জ্ঞানের সাহায্যে সঠিক পথ অনুসন্ধান করো এবং কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করো তাহলেই সফলকাম হবে।
যারা প্রশিক্ষিত তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখে এবং নিজের ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে আত্মসচেতন। তারা সমাজের পঙ্কিল পরিস্থিতিতে আটকে পড়ে না। স্বেচ্ছাচারী মনের বন্ধন থেকে তারা মুক্তি পায়। আর যারা প্রশিক্ষিত নয় তারা অন্য কারো সঠিক দিক-নির্দেশনাও গ্রহণ করতে রাজি নয়। তারা আত্ম-অহঙ্কারের দম্ভে বিভোর থাকে। আলী (আঃ) তাই বলেছেনঃ সবচেয়ে বড়ো মূর্খতা হলো আত্ম-অসচেতনতা।
অন্যত্র তিনি বলেছেন, সবচেয়ে বড়ো আধ্যাত্মিকতা হলো নিজেকে চেনা। তিনি তাঁর সন্তান ইমাম হাসান (আঃ) কে বলেছেন, এই বিশ্বটা হলো মানুষের জণ্যে প্রশিক্ষণের বিদ্যালয়। তার জানা উচিত তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে অন্য পৃথিবীর জন্যে,তাই নিজের মর্যাদা সম্পর্কে জানা উচিত। তিনি বলেছেন-যে নিজের মূল্য নিজেই বুঝলো না,সে ধ্বংসোন্মুখ।
মালঞ্চ-২৩
পাঠক! নাহজুল বালাগা বিশ্লেষণধর্মী সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। সুনসান প্রশান্ত এই সমৃদ্ধ বাগিচায় আজো আমরা একটু ঘুরে বেড়াবো। যতোই দিন যাচ্ছে ততোই বেড়ে যাচ্ছে এই বাগানের শোভা,ততোই বোঝা যাচ্ছে তার অন্তর্নিহিত গূঢ়ার্থ,তাই বেড়ে যাচ্ছে তার অপরিহার্য সুষমা। রতনে রতন চেনে-এই প্রবাদটির মাহাত্ম্য নাহজুল বালাগার ক্ষেত্রে একান্তই প্রযোজ্য। কেননা বিশ্বের জ্ঞানী-গুণীজনরাই নাহজুল বালাগার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এবং হচ্ছেন অন্যদের চেয়ে বেশি। আজকের আসরের মধ্য দিয়ে শেষ হবে নাহজুল বালাগা বিষয়ক আসর মালঞ্চ।
গত আসরে আমরা নাহজুল বালাগায় বর্ণিত মানব প্রশিক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করেছি। আসলে প্রশিক্ষণ মানে হলো মানুষের অন্তরাত্মা এবং দেহকে লালন-পালন করার জন্যে সবোর্ত্তম শিক্ষা এবং সবোর্ত্তম প্রক্রিয়া নির্বাচন করা। আমরা যদি নাহজুল বালাগার পৃষ্ঠাগুলো সচেতনভাবে উল্টাই তাহলে সেখানে লক্ষ্য করবো মানুষের আচার-ব্যবহার,মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি,মানুষের উন্নত চরিত্র গঠন,ব্যক্তিত্ব গঠনের আদর্শ উপায়গুলো চমৎকারভাবে বিধৃত রয়েছে। মানবীয় পূর্ণতায় যারা পৌঁছুতে চায় তাদেরকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত মহান ব্যক্তিত্ব ইমাম আলী (আঃ) এর এইসব দিক-নির্দেশনা যথার্থই পথের দিশা দেবে। জ্ঞানীজনদেরকে এজন্যেই এ গ্রন্থটি এতো বেশি অনুপ্রাণিত করে। নাহজুল বালাগার বক্তব্যগুলো সবই আসলে প্রিয় নবীজীর প্রভাব আর কোরআন ও হাদীসের আলোকেই ব্যক্ত হয়েছে। তাই ইমাম আলী (আঃ) মানুষের জন্যে পরিপূর্ণতম আদর্শের নমুনা হিসেবে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর জীবনাদর্শকেই নির্বাচন করেছেন।
তিনি বলেছেনঃ রাসূলে খোদা (সা) কে যদি তোমার অনুসৃত নেতা হিসেবে মনোনীত করে নাও তাহলেই যথেষ্ট। তাই তোমার পূত-পবিত্র পয়গাম্বরের আনুগত্য করো যার মধ্যে রয়েছে তোমাদের অনুসরণীয় সবোর্ত্তম আদর্শ-যে আদর্শের অনুসারীদের জীবন ধন্য।কেননা আল্লাহর কাছে প্রিয়তম বান্দা সে-ই যে তার পয়গাম্বরকে অনুসরণ করে।
আলী (আঃ) বলেছেনঃ আমি মানুষকে এমন কোনো ভালো কাজের দাওয়াত দেই নি যা তাদের আগে আমি নিজে করি নি। যাঁরা প্রশিক্ষক তাদেঁর ব্যাপারে এ নীতিমালা অনুসরণ করা অর্থাৎ কথা ও কাজের মধ্যে মিল রাখার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। কারণটা হলো মানুষের প্রবণতাটাই এমন যে তারা কথার চেয়ে কাজে বা ব্যবহারে বেশি প্রভাবিত হন।
সেজন্যেই তিনি বলেছেনঃ যে নিজেকে জনতার নেতার আসনে বসালো তার উচিত অন্যদেরকে শিক্ষা দেওয়ার আগে নিজেকে শিক্ষিত করা এবং কথার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার আগে তা নিজের আচরণে ফুটিয়ে তুলতে হবে। মূলত অন্যকে শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করাটাই অনেক বেশি উত্তম ও সম্মানজনক।
আবার সন্তানদেরকে তাদের মন কঠিন এবং অন্ধকারে আচ্ছন্ন হবার আগেই প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ইমাম হাসান (আঃ) কে তিনি এভাবেই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অন্যত্র তিনি বলেছেনঃ সন্তানদের জন্যে বাবার পক্ষ থেকে দেওয়া সবোর্ত্তম উপহার হলো তাদেরকে উত্তম ব্যবহার ও আদব-কায়দা শেখানো।
আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (আঃ) এর এ ধরনের বক্তব্য থেকে অনুমিত হয় যে তিনি তাঁর পরিবার-পরিজন বিশেষ করে তাঁর সন্তানদের ব্যাপারে কতোটা দায়িত্ববান ছিলেন। আমরা এখন এমন একটা সময় বা জগতে বসবাস করছি যেখানে গোমরাহী ও ধ্বংসের পথগুলো অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি উন্মুক্ত। তাই আমাদের উচিত নিজেদের হেদায়েতের জন্যে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঠিক দিক-নির্দেশনার জন্যে যতো বেশি সম্ভব আলী (আঃ) এর মহামূল্যবান জীবনাদর্শ ও তাঁর নির্দেশিত পথের দিশা থেকে উপকৃত হওয়া,নাহজুল বালাগা অধ্যয়নের মাধ্যমে বেশি বেশি অর্জনের চেষ্টা করা।
নাহজুল বালাগা সংক্রান্ত তেহরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো নাহজুল বালাগা ফাউন্ডেশান। এই ফাউন্ডেশানের পরিচালক হলেন হুজ্জাতুল ইসলাম দ্বীন পারভার। তিনি এই গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেনঃ চিঠিপত্র-বক্তৃতা-বিবৃতি আর বাণীর আকৃতিতে নাহজুল বালাগায় আলী (আঃ) এর যে দৃষ্টিভঙ্গি ও দিক-নির্দেশনা প্রতিফলিত হয়েছে,তা খুবই গঠনমূলক এবং গভীর তাৎপর্যবহ। মানুষের স্বাভাবিক মেধা ও চিন্তা অনেকসময় চাপা পড়ে যায়। বিশেষ করে চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ যদি নাহজুল বালাগা পাঠ করেন তাহলে তাঁরা তাদেঁর হারানো বা বিস্মৃত সকল চিন্তা ও জ্ঞান ফিরে পাবেন অর্থাৎ সকল জ্ঞানের কথাই এতে রয়েছে। তাই যিনি জ্ঞানী,যাঁর পড়ালেখার পরিধি যতো বেশি তিনি এই গ্রন্থটি থেকে ততো বেশি উপকৃত হবেন। যেহেতু এতে রয়েছে মানবীয় মুক্তি ও ন্যায়-নীতির প্রতি আহ্বান সেহেতু পৃথিবীর সর্বত্রই তার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
নাহজুল বালাগা ফাউন্ডেশানের পরিচালক জনাব দ্বীন পারভার আরো বলেছেনঃ যে আমিরুল মোমেনিন আলী (আঃ) এর নাহজুল বালাগা শিক্ষায় মনোনিবিষ্ট হবে এবং যথাযথ সম্মান ও আন্তরিকতার সাথে তা পাঠ করবে সে অবশ্যই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যে আলী (আঃ) বৈজ্ঞানিক এবং মানবীয় চিন্তার ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অনেক উর্ধ্বে। বিশ্ব ও মানুষের তথা জগত ও জীবনের গূঢ় রহস্যের সাথে তিনি যতোটা পরিচিত ততোটা অন্য কারো নেই। এই বিশ্ব সম্পর্কেও তাঁর যতোটা জ্ঞান রয়েছে তার সাথে অন্য কারো তুলনাই চলে না। তবে হ্যাঁ,যাঁরা আল্লাহর অলি বা ঐশী জ্ঞানে সমৃদ্ধ তাদের কথা আলাদা। মানুষ যখন বহু গবেষণার পর বুঝতে পারলো যে গ্রহগুলোতে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে,তার বহু আগে ইমাম আলী (আঃ) বলেছিলেন-এইসব গ্রহ-নক্ষত্র তোমাদের শহরগুলোর মতোই শহর। ইমামের এ বক্তব্য শুনে একজন অমুসলিম অর্থাৎ খ্রিষ্টান চিন্তাবিদ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
জ্ঞানের ব্যাপারে ইমাম আলী (আঃ) এর একটি বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো মালঞ্চের এ ধারাবাহিক। তিনি বলেছেনঃ যে-কোনো পাত্রেই কোনো কিছু ঢাললে তা পূর্ণ হয়ে যায় কিন্তু জ্ঞানের পাত্র পূর্ণ হয় না বরং জ্ঞানের পাত্রে যতোই ঢালা হোক না কেন তার পরিধি আরো বেড়ে যায়।
সূত্রঃ ইন্টারনেট