লাইতুল ক্বাদর : খোদাপ্রেমের মহামহিমান্বিত রজনী

কালের গড্ডালিকা প্রবাহে নিমজ্জিত অধিকাংশ মানুষ আত্মার প্রশান্তির কথা ভুলে গেছে। পার্থিব অর্থ-বৈভবের লালসা, যশ ও খ্যাতির মোহ, নিরবচ্ছিন্ন আরাম-আয়েশের প্রত্যাশা প্রভৃতি হাজারো প্রবঞ্চনা বা কুহকিনী আশার ফাঁদ কেড়ে নিচ্ছে আধুনিক মানুষের জীবনের অতি মূল্যবান সময়

লাইলাতুল ক্বাদর : খোদাপ্রেমের মহামহিমান্বিত রজনী
কালের গড্ডালিকা প্রবাহে নিমজ্জিত অধিকাংশ মানুষ আত্মার প্রশান্তির কথা ভুলে গেছে। পার্থিব অর্থ-বৈভবের লালসা, যশ ও খ্যাতির মোহ, নিরবচ্ছিন্ন আরাম-আয়েশের প্রত্যাশা প্রভৃতি হাজারো প্রবঞ্চনা বা কুহকিনী আশার ফাঁদ কেড়ে নিচ্ছে আধুনিক মানুষের জীবনের অতি মূল্যবান সময়গুলো। এমনকি পার্থিব সব কিছু পাওয়ার পরও মানুষের অতৃপ্ত মনের গহীনে ছড়িয়ে পড়েছে ক্লান্তি, শ্রান্তি ও দুঃখ-শোকের দহন। যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত খোদাবিমুখ মৃত আত্মাকে জাগিয়ে তুলে
সত্যিকারের সম্পদ ও সৌভাগ্যের নাগাল পাওয়ার ক্ষীণ আশা মাঝে মাঝে জেগে উঠলেও আত্মার ওপর জমে থাকা দীর্ঘ দিনের জঞ্জাল মানুষকে আবারও করে আশাহত। কারণ, পাপ-পংকিলতার বিপুল কালিমা দূর করে আত্মাকে খোদাপ্রেমের পরশে সজীব করার জন্য দরকার দীর্ঘ সময়ের একনিষ্ঠ ও একাগ্র সাধনা। কিন্তু সময় তো থেমে নেই। দ্রুত শেষ হয়ে আসছে মানুষের আয়ু। তবে কি মুক্তির কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিল যোজন যোজন দূরেই থেকে যাবে?
না, দয়াময় আল্লাহ কর্মব্যস্ত মানুষের মুক্তির জন্য বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থাও রেখেছেন। প্রতি বছরই একবার আসে সেই বিশেষ সূযোগ। জীবনের এক হাজার মাস বা ত্রিশ হাজার দিবসে খোদাপ্রেমের একনিষ্ঠ ও একাগ্র সাধনায় নিমজ্জিত থেকে যে সৌভাগ্য বা আত্মিক প্রশান্তি অর্জন করা যায় তার চেয়েও বেশি অর্জন করা সম্ভব মাত্র এই এক রাতের সাধনায়। আর এই রাতই হল মহামহিমান্বিত শবে ক্বদরের রাত। ক্ষমা ও প্রশান্তি লাভের কঠিন পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব এই এক রাতেই। তাই এ রাতটি যেন বৃথা না যায়। বিদ্রোহী আত্মার লাগাম টেনে ধরতে হবে এ রাতেই। অতীতের কর্মতৎপরতা পর্যালোচনার ও ভবিষ্যতকে নিয়ে ভাবনার শ্রেষ্ঠ সময় এ রাত। ভাগ্য নির্ধারণের এ রাতে আমরা সবাই মহান আল্লাহর মেহমান। ইহকাল ও পরকালের সমস্ত কল্যাণ এবং সৌভাগ্যের অশেষ ভান্ডার আল্লাহ এ রাতে খুলে দিয়েছেন মেহমানদের জন্য। মেহমান কতটুকু সম্পদ নিতে পারবেন তা নির্ভর করছে মেহমানের যোগ্যতা বা ধারণ-ক্ষমতার ওপর। লাইলাতুল ক্বাদর বা মহামহিমান্বিত এ রজনী সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের "সুরা ক্বাদর"-এ বলা হয়েছে : "আমি ক্বোরআন নাযিল করেছি শবে-কদরে। শবে-কদর বা মহামহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে আপনি কি জানেন? শবে-কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশে। সে রাতে প্রভাত বা ফজরের উদয় পর্যন্ত শান্তি তথা খোদায়ী রহমত ও বরকত অব্যাহত থাকে।"
শবে-কদর এমন এক রাত যে রাতে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয় মুমিনদের মজলিসে। তারা সেখানে বিশ্বাসীদের সালাম জানায় ও তাদের প্রার্থনা কবুলের আবেদন জানায় মহান আল্লাহর কাছে। যেসব কারণে পবিত্র রমজানের গুরুত্ব ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল, এ মাসেই নাজেল হয়েছে মানব জাতির মুক্তির দিশারি মহাগ্রন্থ আলকোরআন এবং এ মাসের মধ্যেই রয়েছে মহামহিমান্বিত রাত বা শবে কদর। তবে রমজান মাসের ঠিক কোন রাতটি কদরের রাত তা গোপন রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য মানুষ যেন রমজানের প্রত্যেক রাতকেই গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহর অশেষ রহমত লাভ করে। অবশ্য বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র পবিত্র আহলে বাইতের বর্ণনা অনুযায়ী, রমজানের ১৯, ২১ ও ২৩ তম রাতের মধ্যে রয়েছে মহকল্যাণময় ওই রাত। পুরো বছরের জন্য মানুষের ভাগ্য এ রাতেই নির্ধারিত হয়। তবে মানুষের স্বাধীনতার সাথে এর কোনো সংঘাত নেই। কারণ, মানুষের যোগ্যতা, ঈমান ও খোদাভীতির মাত্রার আলোকে তার ভাগ্য নির্ধারণ করেন মহান আল্লাহ। অর্থাৎ মানুষই তারা ভাগ্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
হযরত জিবরাইল আঃ শবে কদরের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবী (সাঃ)-কে বলেছেন, এ রাতে সবার প্রার্থণা কবুল করা হয় এবং প্রত্যেক তওবাকারী বা অনুতপ্ত ব্যক্তির ক্ষমা প্রার্থণা কবুল করা হয়।
কদরের রাতে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়। তাই মানুষ আত্মাকে পবিত্র করে বা আত্মসংশোধনের মাধ্যমে এ রাতে মহান আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের সাহচর্য পেতে পারে। ইতিবাচক মন বা মানসিক যোগ্যতা নিয়ে মহান আল্লাহর সাথেও সংযোগ পেতে পারে মানুষ এই বিশেষ রাতে।
কদরের রাতে চিন্তা-ভাবনার গুরুত্বও অপরিসীম। মন ও আত্মাকে অসচেতনতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করা এবং কল্যাণের পথে, উন্নতির পথে ও সচেতনতার পথে পা বাড়ানোর জন্য এই চিন্তাভাবনা জরুরি। আমরা এ রাতে এটা ভাবতে পারি যে, মহান যে উদ্দেশ্যে দয়াময় প্রভু আমাদের সৃষ্টি করেছেন সে জন্য আমরা নিজেকে কতটা প্রস্তুত করেছি? এভাবে কদরের রাত আমাদের জীবনের মোড় ও গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
শবে কদরের রাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল বা এবাদত হল পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত। যে পবিত্র রজনীতে কোরআন নাজেল হয়েছিল মানুষের চিরন্তন হেদায়াত বা সুপথ প্রদর্শক এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে, সেই অমূল্য খোদায়ি নেয়ামতের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আমাদের উচিত এই রাতে কোরআন তেলাওয়াত করা। কোরআনের কিছু আয়াত বা বিশেষ বিশেষ আয়াতের অর্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করাও অত্যন্ত পছন্দনীয় আমল। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের আগে রাসূল (সাঃ)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) এই বিশেষ দোয়া করতেন যে, "" হে আল্লাহ! কোরআনের যে তেলাওয়াত চিন্তাভাবনাহীন, তা থেকে আমাকে মুক্ত রাখ, বরং আমাকে এমন অবস্থায় রাখ যাতে আমি কোরআনের আয়াত ও বিধানগুলো নিয়ে ভাবতে পারি এবং ধর্মের বিধানগুলো বাস্তবায়ন বা আমল করতে পারি।""
রাসূল (সাঃ)'র পবিত্র আহলে বাইতের অন্য এক সদস্য হযরত ইমাম বাকের (আঃ) শবে কদরের রাতে পবিত্র কোরআন সঙ্গে নিয়ে বলেছেন, "কোরআন হাতে নাও এবং তা খুলে সামনে রাখ, আর বল, হে আল্লাহ! তোমাকে তোমার নাজেল করা কিতাবের ওসিলা দিয়ে বলছি এবং এতে যেসব বড় বা বৃহত্তর নাম রয়েছে ও রয়েছে যেসব সুন্দরতর নাম , সেসব নামের ওসিলায় আমাকে দোযখ বা নরকের আগুন থেকে মুক্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কর। "
শবে কদরের রাতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও অধ্যয়ন এবং দোয়া পাঠ আল্লাহর সাথে মানুষের সংযোগের অন্যতম পথ। এই মহামহিমান্বিত রাতে "দোয়ায়ে জওশান কবির" নামে একটি বিখ্যাত দোয়া পাঠও খুবই উচ্চ পর্যায়ের বা পছন্দনীয় আমল। এতে আল্লাহর বিশেষ কিছু নাম ও গুণবাচক বাক্য উচ্চারণ করা হয় যার মোট সংখ্যা এক হাজার। যেমন, হে সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাকারী, সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহীতা, সাহায্যকারী, শাসক ও দাতা, সর্বোত্তম অভিভাবক, প্রশংসাকারী ও স্মরণকারী, সর্বোত্তম ত্রাণকর্তা এবং পৃষ্ঠপোষক। পবিত্র তুমি ও প্রশংসা কেবল তোমারই, তুমি ছাড়া কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই, হে সকল সাহায্য ও ত্রাণের অনুমোদন দাতা তথা হে ত্রাণকর্তা, আমাদের রক্ষা কর জাহান্নামের আগুন থেকে, হে প্রভু।
কদর রাতে যে প্রার্থনাটি ভুলবেন না তা হল, "হে আল্লাহ, তুমি আমাদের সকল পাপ ক্ষমা কর, যদি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে থাক, তবে আরো সন্তুষ্ট হও। হে আল্লাহ, আমাদেরকে দাও ইহকাল ও পরকালের সকল কল্যাণ ; আমাদের রক্ষা কর সব ধরনের চরমপন্থা ও শৈথিল্যপনা থেকে; একইসাথে আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি যেন ভাল হয়।"
সূত্রঃ ইন্টারনেট