মাহদী ও ইমামত

মাহদী ও ইমামত

মাহদীইজম ও ইমামত

ইমাম মাহদী, মাসুম, রাসূল, বিহারুল আনওয়ার, ইমাম আলী, ফাতিমাতুয্ যাহরা, ইমাম হাসান আসকারী, ইমাম, মুসা, ঈসা, আল্লাহ, ইমাম হুসাইন, ইমাম সাজ্জাদ, ইমাম বাকের, ইমাম জাফর সাদিক, ইমাম কাযিম, ইমাম মুসা রেযা, ইমাম তাকি আল জাওয়াদ, ইমাম হাদী, হাসান আসকারী, রাজআত, পুনরুত্থান
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুরপর নবীন মুসলিম সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়টি ছিল খেলাফত তথা রাসূল(সা.)-এর উত্তরাধিকারী নিয়ে৷ একটি দল কিছু বিশিষ্ট সাহাবাদের পরামর্শে আবুবকরেরখেলাফতকে মেনে নিয়েছিল৷ অপর দলটির দৃঢ় বিশ্বাস রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী তাঁরমনোনয়নের মাধ্যমেই (অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশে) নির্ধারিত হবে আর তিনি হলেন হযরত আলী(আ.)৷
বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হল এই যে, শিয়াসুন্নির পার্থক্যটা শুধুমাত্র ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারীকে নিয়ে নয় বরংপ্রত্যেকের দৃষ্টিতে ইমামের অর্থ, বিষয়বস্তু এবং পদমর্যাদাও ভিন্ন৷ আর এ ভিন্নদৃষ্টিভঙ্গিই দুই মাঝহাবকে একে অপর থেকে পৃথক করেছে৷
বিষয়টির স্পষ্টতার জন্য ইমাম ওইমামতের অর্থকে বিশ্লেষণ করব যার মাধ্যমে দৃষ্টিভঙ্গিসমূহের ভিন্নতা সুস্পষ্ট হবে৷"ইমামতের" আভিধানিক অর্থ হল পথপ্রদর্শন বা নেতৃত্বএবং "ইমাম" তাঁকে বলা হয় যিনি কোন সম্প্রদায়কে একটি নির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করারদায়িত্বভার গ্রহণ করেন৷ তবে ইসলামী পরিভাষায় ইমামতকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করাহয়েছে৷
আহলে সুন্নতের দৃষ্টিতে ইমামতহচেছ পার্থিব হুকুমত (ঐশী পদমর্যাদা নয়) যার মাধ্যমে ইসলামী সমাজ পরিচালিত হবে৷যেহেতু প্রতিটি জাতিরই নেতার প্রয়োজন রয়েছে ইসলামী সমাজও রাসূল (সা.)-এর পর নিজেদেরজন্য অবশ্যই একজন নেতা নির্বাচন করবে৷ তবে তাদের দৃষ্টিতে যেহেতু ইসলামে নেতানির্বাচনের কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেই কাজেই বিভিন্ন পন্থায় রাসূল (সা.)-এরউত্তরাধিকারী নির্বাচন করা যেতে পারে৷ যেমন: অধিকাংশের ভোটের মাধ্যমে অথবা সমাজেরবিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের মতামতের ভিত্তিতে বা কখনো পূর্ববর্তী খলিফার ওসিয়াতেরমাধ্যমে এমনকি কখনো আবার সামরিক অদ্ভুত্থানের মাধ্যমে৷
কিন্তু শিয়া মাযহাব ইমামতকে নবুয়্যতেরধারার ধারাবাহিকতা এবং ইমামকে আল্লাহর হুজ্জাত ও মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্কস্থাপনের মাধ্যম মনে করেন৷ তাদের বিশ্বাস হল এই যে, "ইমাম" শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষথেকে নির্বাচিত হবেন এবং ওহীর বার্তা বাহক মহানবী হযরতমুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমেপরিচয় লাভ করবেন৷ ইমামতের সুউচচ মর্যাদার কারণেই শিয়া মাযহাব ইমামকে মুসলমানদেরপরিচালক এবং ঐশী হুকুম-আহকাম বর্ণনাকারী, কোরআনের বিশ্লেষণকারী এবং সৌভাগ্য অর্জিতপথের দিক নির্দেশক মনে করেন৷ অন্য কথায় শিয়া মাযহাবের সাংস্কৃতিতে ইমাম হলেনমানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধানকারী৷ অর্থাৎ সুন্নি মাযহাবেরসম্পূর্ণ বিপরীত কেননা তারা বিশ্বাস করে যে, খলিফার দায়িত্ব হল সে শুধুমাত্র শাসনকরবে এবং মানুষের পার্থিব সমস্যার সমাধান করবে৷
ইমামের প্রয়োজনীয়তা
দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ স্পষ্ট হওয়ার পর এইপ্রশ্নটির জবাব দেওয়া সমিচীন মনে করছি যে কোরআন এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নত থাকাসত্ত্বেও (যেমনটি শিয়া মাযহাব বিশ্বাস করে) ইমাম বা নেতার কি প্রয়োজন?
ইমামের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তার জন্যঅসংখ্য দলিল প্রমাণ রয়েছে তবে আমরা এখানে একটি অতি সাধারণ দলিল বর্ণনা করেই ক্ষান্তহব৷ নবীর প্রয়োজনীয়তার জন্য যে সকল দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে তা ইমামের প্রয়োজনীয়তারদলিলও বটে৷ এক দিকে যেহেতু ইসলাম সর্ব শেষ দ্বীন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহরসর্ব শেষ নবী সেহেতু ইসলামকে অবশ্যই কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের সকল সমস্যার সমাধানদিতে হবে,অপর দিকে আল কোরআনে (ইসলামের) মৌলিক বিষয়, আহকাম সম্পর্কিত নির্দেশাবলীএবং ঐশী তথ্যাবলী বর্ণিত হয়েছে এবং তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব রাসূল(সা.)-এর উপর অর্পিত হয়েছে৷ এটা স্পষ্ট যে রাসূল (সা.) মুসলমানদের নেতা হিসাবেসমাজের প্রয়োজনীয়তা এবং ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী আল্লাহর আয়াতকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকরেছেন৷ অতএব তাঁর এমন যোগ্য উত্তরাধিকরীর প্রয়োজন যিনি তাঁর মত আল্লাহর অসীমজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন, তাহলেই তিনি রাসূল (সা.) যে সকল বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েযান নি তার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন এবং ইসলামী সমাজের সকল যুগের সকল সমস্যার সমাধানকরতে পারবেন৷ এমন ইমামইরাসূল (সা.)-এর রেখে যাওয়া দ্বীন ইসলামের রক্ষী এবং কোরআনেরপ্রকৃত মোফাস্সের৷ আর তাঁরাই পারেন ইসলামকে সকল প্রকার শত্রুর হাত থকে রক্ষা করেকিয়ামত পর্যন্ত পাক ও পবিত্র রাখতে৷
তাছাড়া ইমাম একজন পূর্ণমহামানব হিসাবেমানুষের জন্য একটি পরিপূর্ণ আদর্শ এবং মানুষ এমন একটি আদর্শের প্রতি বিশেষভাবেনির্ভরশীল৷ এভাবে তাঁর সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় উপযুক্ত মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতেপারবে৷ এই ঐশী পথপ্রদর্শকের ছত্র ছায়ায় থেকে চারিত্রিক অবক্ষয় এবং বাহ্যিক শয়তানথেকে নিরাপদ থাকতে পারবে৷
উপরুক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়যে, মানুষের জন্য ইমামের প্রয়োজনীয়তা অতি জরুরী৷ তাই নিম্নে ইমামের কিছু বৈশিষ্টবর্ণিত হল:
* নেতৃত্ব এবং সমাজ পরিচালনা (সরকারগঠন)৷
* রাসূল (সা.)-এর দ্বীন ও শরীয়তেররক্ষণাবেক্ষণ এবং কোরআনের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান৷
* মানুষের আত্মশুদ্ধি এবংহেদায়াত৷
ইমামের বৈশিষ্ট্যসমূহ
রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী যিনিদ্বীনের অব্যাহত ধারার কর্ণধর, মানুষের সমস্যার সমাধানকারী, এক ব্যাতিক্রমধর্মীব্যাক্তিত্ব এবং মহান ইমাম ও নেতা হিসাবে নিঃসন্দেহে তিনি বহুমূখী গুণাবলীরঅধিকারী৷ এখানে ইমামের উল্লেখযোগ্য কিছু গুণাবলী আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল৷
তাকওয়া, পরহেজগারি এবং এমন নিঃস্কলুষযে তাঁর দ্বারা সামান্যতম কোন গোনাহ সংঘটিত হয় নি৷
তাঁর জ্ঞানের উৎস হচেছ রাসূল (সা.)এবং তা ঐশী জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত৷
অতএব তিনি সকলের পার্থিব, আধ্যাত্মিক, দ্বীন এবং দুনিয়ার সকল ধরনের (প্রশ্নের) সমাধানকারী৷
তিনি ফযিলত এবং শ্রেষ্টতম চারিত্রিকগুনাবলিতে সু-সজ্জিত৷
তিনি মানবজাতিকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ীপরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম৷
উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ থেকে স্পষ্টহয়ে যায় যে, এমন ধরনের ব্যক্তি নির্বাচন করা মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতার ঊর্ধে৷একমাত্র আল্লাহ্ই তাঁর অসীম জ্ঞানের মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী নির্বাচনকরে থাকেন৷ সুতরাং ইমামের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকেনির্বাচিত ও নির্ধারিত হবেন৷ যেহেতু উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ অধিক গুরুত্ববহ তাইপ্রতিটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল:
১) - ইমামের জ্ঞান
ইমাম যেহেতু মানুষের নেতার আসনেসমাসীন সেহেতু অবশ্যই তাঁকে দ্বীন সম্পর্কে সার্বিকভাবে জানতে হবে, দ্বীনেরনিয়ম-কানুন সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে৷ তাঁকে কোরআনের তফসীর এবং রাসূল(সা.)-এর সুন্নতের উপর পূর্ণ দখল থাকতে হবে৷ দ্বীনি শিক্ষার বর্ণনা ও জনগণেরবিভিন্ন বিষয়ে সকল প্রকার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং তাদেরকে উত্তমভাবে পথপ্রদর্শনকরতে হবে৷ এটা স্পষ্ট যে কেবল মাত্র এধরনের ব্যক্তিই সর্বসাধারণের বিশ্বস্ত এবংআশ্রয় স্থান হতে পারেন আর এ ধরনের পাণ্ডিত্ব একমাত্র ঐশী জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্তথাকার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে৷ ঠিক একারণেই শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ বিশ্বাস করেনযে, ইমাম (আ.) তথা রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত প্রতিনিধিগণের জ্ঞান আল্লাহ প্রদত্ত৷
হযরত আলী (আ.) প্রকৃত ইমামের চি‎হ্নসম্পর্কে বলেছেন:
ইমাম হালাল হারাম, বিভিন্ন ধরনেরআহকাম, আদেশ, নিষেধ এবং জনগণের সকল প্রয়োজন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী অবহিত (মিযানুলহিকমা খণ্ড-১, হাদীস-৮৬১)৷
২) - ইমামের ইসমাত (পবিত্রতা)
ইমামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবংইমামতের মৌলিক শর্ত হচেছ "পবিত্রতা" আর তা সত্যের জ্ঞান ও বলিষ্ঠ ইচছা (দৃঢ় মনবল)থেকে সৃষ্টি হয়৷ ইমাম এ দুই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার কারণে সকল প্রকার গোনাহ এবংত্রুটি থেকে বিরত থাকেন৷ ইমাম ইসলামী শিক্ষার পরিচয় এবং বর্ণনা ও পালন করারক্ষেত্রে, এবং ইসলামী সমাজের উন্নতি ও ক্ষতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে ত্রুটিমুক্ত ও নিস্পাপ৷ ইমামের পবিত্রতার জন্য (কোরআন এবং হাদীসের আলোকে) বুদ্ধিবৃত্তিকএবং উদ্ধৃতিগত দলিল রয়েছে৷ উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলসমূহনিম্নরূপ:
ক) দ্বীন এবং দ্বীনি কর্মকাণ্ড(ইসলামী সাংস্কৃতি) রক্ষার্থে ইমামের নিস্পাপ হওয়া একান্ত প্রয়োজন৷ কেননা দ্বীনকেবিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা এবং জনগণকে হেদায়াত করার দায়িত্বভার ইমামের উপর ন্যাস্ত৷এমনকি ইমামের কথা, আচরণ এবং অন্যদের কার্যকলাপকে অনুমোদন করা বা না করাও সমাজেপ্রভাব বিস্তার করে৷ সুতরাং ইমামকে দ্বীন সম্পর্কে জানতে হবে এবং আমলের ক্ষেত্রেসম্পূর্ণরূপে ত্রুটি মুক্ত এবং নিস্পাপ হতে হবে আর তাহলেই তিনি তাঁর অনুসারীদেরকেসঠিক পথে হেদায়াত করতে পারবেন৷
খ) সমাজে ইমামের প্রয়োজনীয়তার অপরএকটি যুক্তি হল যে, জনগণ দ্বীন সম্পর্কে জানতে এবং তা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রেত্রুটি মুক্ত নয়৷ এখন যদি মানুষের নেতাও এমনটি হন তাহলে মানুষ কিভাবে তার প্রতিপরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করবে? অন্য কথায় ইমাম যদি মাসুম না হন তাহলে মানুষ তারঅনুসরণ এবং নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়বে (তাছাড়া ইমাম যদি মাসুম না হনতাহলে আর একজন ইমামের শরণাপন্ন হতে হবে যে মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারবে৷ যদিসেও মাসুম না হয় তাহলে আর একজন ইমামের প্রয়োজন দেখা দিবে এভাবে একর পর এক চলতে থকবেএবং দর্শনের দৃষ্টিতে তা বাতিল বলে গন্য হয়েছে)৷
কোরআনের আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয় যে, ইমামকে অবশ্যই মাসুম তথা নিস্পাপ হতে হবে৷ সূরা বাকারার ১২৪ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছেযে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে নবুয়ত দান করার পরও অনেক পরীক্ষা নিয়ে তবেইতাঁকে ইমামতের পদমর্যাদা দান করেন৷ তখন হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থণাকরলেন যে, হে আল্লাহ এই মর্যাদাকে আমার বংশধরের জন্যেও নির্ধারণ করুন৷ আল্লাহ তাআলাবললেন: আমার এ প্রতিশ্রুতি (ইমামতের পদমর্যাদা) জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য হবে না৷
পবিত্র কোরআনেশিরকসর্বাপেক্ষা বড়জুলুম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশ লপঘন (গোনাহে লিপ্ত হওয়া) করাওনিজের প্রতি অত্যাচারের অন্তর্ভূক্ত৷ প্রতিটি মানুষই তাদের জীবনে কোন না কোন গোনাহেলিপ্ত হয়েছে, সুতরাং সেও জালিমদের অন্তর্ভূক্ত এবং কখনোই সে ইমামতের পদমর্যাদালাভের উপযুক্ত নয়৷
অন্যকথায় নিঃসন্দেহে হযরত ইব্রাহীম(আ.) তাঁর ওই ধরনের বংশধরের জন্য দোয়া করেন নি যারা সারা জীবন গোনাহে লিপ্ত ছিল এবংযারা প্রথমে ঈমানদার ছিল পরে গোনাহগার হয়েছিল৷ সুতরাং দুই শ্রেণীর লোকরা অবশিষ্টথাকে যথা:
১.যারা প্রথমে গোনাহগারছিল কিন্তু পরবর্তীতে তওবা করে সৎকর্মশীল হয়েছে৷
২.যারা কখনোই গোনাহেলিপ্ত হয় নি৷
আল্লাহ রাববুলআলামিন কোরআনপাকে প্রথম শ্রেণীর লোকদেরকে বাদ দিয়েছেন এবং ইমামতেরপদমর্যাদাকে শুধুমাত্র দ্বিতীয় শ্রেণীর মহামানবদের জন্য নির্ধারণকরেছেন৷
গ) - ইমামের সামাজিক দ্বায়িত্ব ওকর্মতৎপরতা
মানুষ সামাজিক জীব৷ সমাজ মানুষেরচিন্তা-চেতনা এবং আচরণে বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করে থাকে৷ তাই সঠিক প্রশিক্ষণ এবংসমাজকে আল্লাহর সান্ন্যিধ্যের পথে পরিচালনা করার জন্য উপযুক্ত সামাজিক ক্ষেত্রপ্রস্তুত করা একান্ত প্রয়োজন৷ আর তা কেবল ঐশী (ইসলামী) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেইসম্ভব৷ সুতরাং ইমাম তথা জনগণের নেতাকে অবশ্যই সমাজ পরিচালনা করার ক্ষমতা থাকতে হবেএবং কোরআনের শিক্ষা ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নতের আলোকে এবং উপযুক্ত ও কার্যকরিউপকরণের সাহায্যে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে হবে৷
ঘ) - মহান চারিত্রিক গুণাবলিতেগুনান্বিত হওয়া
ইমাম যেহেতু সমাজের নেতা সে জন্যতাঁকে অবশ্যই সকল প্রকার ত্রুটিমুক্ত এবং চারিত্রিক কলঙ্ক মুক্ত হতে হবে৷পক্ষান্তরে তাঁকে সকল প্রকার চারিত্রিক গুণাবলীর সর্বোচচস্থানে অবস্থান করতে হবে৷কেননা তিনি পরিপূর্ণ মানুষ (আদর্শ মহাপুরুষ) হিসাবে অনুসারীদের জন্য সর্বোত্তমআদর্শ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকেন৷
ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন, "ইমামেরবৈশিষ্ট্য রয়েছে; তিনি সর্বাধীক জ্ঞানী, পরহেজগার, মহানুভব, সাহসী, দানশীল এবংইবাদতকারী" (মায়ানী আল আখবার খণ্ড- ৪, পৃষ্টা ১০২৷ )৷
তাছাড়া তিনি রাসূল (সা.)-এরউত্তরাধিকারী এবং তার দায়িত্ব হল মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান করা৷ সুতরাং তারনিজেকে অবশ্যই সবার আগে সু-চরিত্রের অধিকারী হতে হবে৷
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:
যে (আল্লাহর নির্দেশে) মানুষের ইমামহওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে তাঁর প্রথম দায়িত্ব হল সবার পূর্বে নিজেকে গঠন করা এবংঅবশ্যই কথার পূর্বে কর্মের মাধ্যমে মানুষকে প্রশিক্ষণ দান করা (মিযানুল হিকমাহ বাব১৪৭, হাদীস ৮৫০৷
ঙ) - ইমাম আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিতহন:
শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে ইমাম তথারাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী কেবলমাত্র আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর অনুমোদনেই নির্ধারিতহয়ে থাকে এবং অতঃপর রাসূল (সা.) তাঁকে পরিচয় করান৷ সুতরাং এক্ষেত্রে (ইমামনির্বাচনে) কোন দল বা গোত্রের বিন্দুমাত্র ভুমিকা নেই৷
ইমাম যে আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত হবেনতার অনেক যুক্তি রয়েছে যেমন:
১. কোরআনের ভাষায় একমাত্র আল্লাহই সকলকিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন এবং সকলকে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করতে হবে৷ এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহ যাকে ইচছা এই ক্ষমতা (যোগ্যতা এবং প্রয়োজনানুসারে) দান করতে পারেন৷ সুতরাংযেমনভাবে রাসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন, ইমামও আল্লাহর নির্দেশেজনগণের উপর নেতৃত্ব পেয়ে থাকেন৷
২. ইতিপূর্বে আমরা ইমামের জন্যইসমাত (পবিত্রতা) এবং ইলম (জ্ঞান) বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিয়েছি৷ এটা স্পষ্ট যে, এইসকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিকে পাওয়া এবং চেনা একমাত্র আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব৷কেননা তিনি সকল কিছুর উপর সম্যক জ্ঞাত৷ কোরআনপাকে আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহীম(আ.)-কে বলেন:
"আমি তোমাকে মানবজাতির জন্যইমাম (নেতা) নির্বাচন করলাম" (সূরা বাকারা আয়াত নং ১২৪)৷
একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দরবাণী:
এ আলোচনার শেষে ইমামের মর্যাদা এবংবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হযরত ইমাম রেযা (আ.)-এর বাণীর অংশ বিশেষ বর্ণনা করা উপযুক্ত মনেকরছি যা নিম্নে তুলে ধরা হল:
"যারা ইমামত সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণকরে এবং মনে করে যে ইমামত হচেছ নির্বাচনের বিষয়, তারা অজ্ঞ৷ জনগণের পক্ষে সম্ভবই নয়যে তারা ইমামের মর্যাদাকে উপলব্ধিকরবে৷ অতএব কিরূপে সম্ভব যে তাদের ভোটে ইমামনির্বাচিত হবেন?"
"নিঃসন্দেহে ইমামতের মর্যাদা, আসন এবংগভীরতা মানুষের বুদ্ধি ও নির্বাচন ক্ষমতার অনেক উর্দ্ধে৷"
নিঃসন্দেহে ইমামত, এমন একটি পদমর্যাদাযাকে আল্লাহ তাআলা নবুয়্যাত ও খুল্লাত অর্থাৎ খলিলুল্লাহর পর তৃতীয় মর্যাদা হিসাবেহযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে দান করেছেন৷ ইমামত হচেছ আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর খলিফা এবংআলী (আ.)-এর পদমর্যাদা ও হযরত ইমাম হাসান ও ইমামহুসাইন (আ.)-এরউত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ৷ সত্যি বলতে ইমামত হচেছ দ্বীনের কাণ্ডারি, ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান, দুনিয়ার মঙ্গল এবং মুমিনদের সম্মানের স্থান৷অনুরূপভাবে ইমাম থাকার কারণেই ইসলামী রূপরেখা রক্ষিত এবং তাকে মেনে নেয়াতেই নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ কবুল হয়ে থাকে৷
ইমাম আল্লাহ বর্ণিত হারাম ওহালালকে ব্যাখ্যা করেন৷ আল্লাহর আদেশ নিষেধকে মেনে চলেন এবং আল্লাহর দ্বীনকে সমর্থনকরেন৷ তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের মাধ্যমে এবং সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে মানুষকেআল্লাহররাস্তায় দাওয়াত করেন৷
ইমাম উদিত সূর্যের ন্যায় যার জ্যোতিসারা বিশ্বকে আলোকিত করে কিন্তু সে নিজে সবার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ ইমাম উজ্জল চন্দ্র, জলন্ত প্রদ্বীপ, দ্বীপ্তিময় জ্যোতি, বিষম অন্ধকারে পথপ্রদর্শনকারী নক্ষত্র৷ মোটকথাতিনি সকল প্রতিকুলতা থেকে মুক্তিদানকারী স্বর্গিয় দূত৷
ইমাম উত্তম সাথী, দয়ালু পিতা, সহোদরভ্রাতা এবং ছোট্ট শিশুর জন্য মমতাময়ী মাতা৷ তিনি মহা বিপদের দিনে অসহায়দের জন্যআশ্রয় কেন্দ্র৷ ইমাম এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি সকল প্রকার গোনাহ এবং ত্রুটি হতেমুক্ত৷ তিনি বিশেষ জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি এবং ধৈর্যের প্রতীক৷ ইমাম যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষএবং কেউই তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার যোগ্যতা রাখে নাএবং কোন পণ্ডিতই তাঁর সমকক্ষ হতেপারে না৷ কেউ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না এবং কেউ তাঁর অনুরূপ নয়৷
সুতরাং কার পক্ষে ইমামকে চেনাসম্ভব অথবা কে পারে ইমাম নির্বাচন করতে? আফসোস, হায় আফসোস! এখানেই মানুষ বুদ্ধিহারিয়ে হতবাক হয়ে যায়৷ এখানেই চোখের জ্যোতি হারিয়ে যায়, বড় ছোট্ট হয়ে যায়,বিচক্ষণরা হকচকিয়ে যায়, বক্তারা নির্বাক হয়ে যায়, কেননা তারা কেউই ইমামের একটিফযিলত এবং বৈশিষ্ট্যকে বর্ণনা করতে অক্ষম এবং তারা সকলেই তাদের দূর্বলতাকে একবাক্যেস্বীকার করে নিয়েছেন (কাফী খণ্ড- ১, বাব ১৫, হাঃ ১, পৃষ্ঠা ২৫৫)৷
শিয়া মাযহাবের শেষ ইমাম এবং রাসূল(সা.)-এর বারতম উত্তরাধিকারী ২২৫ হিজরীর ১৫ই শাবান শুক্রবার প্রভাতে (৮৬৮খ্রীষ্টাব্দে) ইরাকের সামের্রা শহরে জন্মগ্রহণ করেন৷
শিয়া মাযহাবের একাদশ ইমাম হযরত হাসানআসকারী (আ.) তাঁর মহান পিতা৷ মাতা হযরত নারজিস খাতুন৷ নারজিস খাতুনের পিতা হলেনরোমের যুবরাজ, আর মাতা আশ্ শামউন সাফার বংশধর হযরত ঈসা (আ.)-এর ওয়াসি এবং নবীগণেরবন্ধু হিসাবে পরিচিত৷ নারজিস খাতুন স্বপ্নের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইমামহাসান আসকারী (আ.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দানে যান এবং সেখানে অন্যান্যমুসলমানদের সাথে বন্দি হন৷ ইমাম হাদী আন্ নাকী (আ.) একজনকে প্রেরণ করেন এবং সেনারজিস খাতুনকে কিনে সার্মেরায় ইমামের বাড়িতে নিয়ে আসে (কামালুদ্ দ্বীন খণ্ড- ২, বাব ৪১, হাদীস ১,পৃষ্ঠা ১৩২)৷
এসম্পর্কে আরও কয়েকটি হাদীস বর্ণিতহয়েছে (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫, হাদীস ২৯, পৃ.-২২, এবং হাদীস ১৪ পৃ.-১১) তবেগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হযরত নারজিস কিছুদিন যাবৎ ইমাম হাদী (আ.)-এর বোন হযরত হাকিমাখাতুনের বাড়িতে ছিলেন এবং তিনি তাকে অনেক কিছু শিক্ষা-দীক্ষা দিয়েছিলেন৷ হযরতহাকিমা খাতুন নারজিস খাতুনকে অধিক সম্মান করতেন৷ নারজিস খাতুন হলেন সেই রমনী যারপ্রশংসা করে পূর্বেইরাসূল (সা.) (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫, হাদীস ২৯, পৃ.-২২, এবংহাদীস ১৪ পৃ.-১১), আলী (আ.) (গাইবাতে শেখ তুসী হাদীস ৪৭৮, পৃ.-৪৭) ও ইমাম জাফরসাদিক (আ.) (কামালুদ্ দ্বীন খণ্ড- ২,বাব ৩৩, হাদীস ৩১, পৃষ্ঠা ২১) হতে হাদীসবর্ণিত হয়েছে৷ তাকে সর্বোত্তম দাসী এবং তাদের নেত্রী হিসাবেও উল্লেখ করাহয়েছে৷
উল্লেখ্য যে ইমাম মাহদী (আ.)-এর মাতাআরও কয়েকটি নামে যেমন: সুসান, রেহানা, মালিকা এবং সাইকাল (সাকিল) নামেপরিচিত৷
নাম, কুনিয়া ও উপাধি
ইমাম মাহদী (আ.)-এর নাম ও কুনিয়া (যেনাম "আব" অথবা "উম" দিয়ে শুরু হয়ে থাকে যেমনঃ আবা আবদিল্লাহ ও উম্মুল বানিন) রাসূল(সা.)-এর নাম ও কুনিয়ার অনুরূপ৷ কিছু সংখ্যক হাদীসে তাঁর আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ততাকে নাম ধরে ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে৷
ইমাম যামানার প্রসিদ্ধ উপাধিসমূহহচেছ: মাহ্দী, কায়েম, মুনতাযার, বাকিয়াতুল্লাহ, হুজ্জাত, খালাফে সালেহ, মানসুর, সাহেবুল আমর, সাহেবুয্ যামান এবং ওলী আসর আর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলমাহ্দী৷
প্রতিটি উপাধিই মহান ইমাম সম্পর্কেএকবিশেষ বাণীর বার্তাবাহক৷
ঐ মহান ইমামকে "মাহ্দী" বলা হয়েছে৷কারণ তিনি নিজে হেদায়াত প্রাপ্ত এবং অন্যদেরকে সঠিক পথে হেদায়াত করবেন৷ তাঁকে"কায়েম" বলা হয়েছে৷ কেননা তিনি সত্যের জন্য সংগ্রাম করবেন৷ তাঁকে "মুনতাযার" বলাহয়েছে৷ কেননা সকলেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে৷ তাঁকে "বাকিয়াতুল্লাহ" বলা হয়েছে৷কেননা তিনি হচেছন আল্লাহর হুজ্জাত এবং গচিছত শেষ সম্পদ৷
"হুজ্জাত" অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতিআল্লাহর স্পষ্ট দলিল এবং "খালাফে সালেহ"-এর অর্থ হচেছ আল্লাহর ওয়ালিগণেরউত্তরাধিকারী৷ তিনি "মানসুর" কেননা আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করবেন৷ তিনি "সাহেবুল আমর"কেননা ঐশী ন্যায়পরায়ণ সরকার গঠনের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যান্ত হয়েছে৷ তিনি "সাহেবুয্যামান" এবং "ওয়ালি আসর" কেননা তিনি হচেছন তাঁর সময়ের একছত্র অধিপতি৷
জন্মের ঘটনা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হতেবহুসংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে তাঁর বংশ হতে মাহ্দী নামক একজন ব্যক্তি অদ্ভুথ্যানকরবেন এবং তিনি অত্যাচারের ভিতকে সমূলে উৎপাটন করবেন৷ অত্যাচারী আববাসীয় শাসকরাএঘটনা জানতে পেরে ইমাম মাহদী (আ.)-কে তাঁর জন্মলগ্নেই হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়৷সুতরাং ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর সময় থেকে মাসুম ইমামগণের জীবন-যাপন কড়া সীমাবদ্ধতারমধ্যে চলে আসে এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সময়ে এ পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌছায়৷এমনকি ইমাম (আ.)-এর গৃহের অতি সামান্য আসা যাওয়ার বিষয়ও শাসকবর্গের নখদর্পনে থাকত৷অতএব এমতাবস্থায় শেষ ইমাম তথা ঐশী নবজাতকের জন্ম গোপনে বা লোকচক্ষুর আড়ালে হওয়াটাইবাঞ্চনীয়৷ ঠিক একারণেই ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর অতি নিকট আত্মীয়রাও ইমাম মাহদী(আ.)-এর জন্মের ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না৷ এমনকি জন্মের কয়েক ঘন্টা পূর্বেও হযরতনারজিস খাতুনের গর্ভবতী অবস্থা পরিদৃষ্ট ছিল না৷
হযরত ইমাম মুহাম্মদ তকী আল জাওয়াদ(আ.)-এর কন্যা হাকিমাহ বলেন যে, ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাকে বললেন:
"ফুপি আম্মা আজকে ১৫ই শাবান, আমাদেরসাথে ইফতার করুন৷ কেননা, আজ রাতে (রাতের শেষ ভাগে) আল্লাহ তার বরকতময় হুজ্জাতকেদুনিয়াতে প্রেরণ করবেন৷"
আমি বললাম: "এই বরকতময় নবজাতকের জননীকে?"
ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন:"নারজিস৷"
আমি বললাম: "কিন্তু আমি তো তার কোনআলামত দেখছি না!"
ইমাম (আ.) বললেন: "কল্যাণ এর মধ্যেইনিহিত, আমি যা বলেছি তা ঘটবেই ইনশা আল্লাহ৷"
আমি নারজিস খাতুনের ঘরে প্রবেশ করেসালাম করে বসলাম, সে আমার পায়ের থেকে জুতা খুলে বলল: শুভ রাত্র হে আমার, নেত্রী৷
আমি বললাম: "তুমি আমার এবং আমাদেরপরিবারের মহারাণী৷"
নারজিস খাতুন বললেন: "না! আমি কোথায়আর এ মর্যাদা কোথায়৷"
আমি বললাম: "হে আমার কন্যা! আল্লাহপাকতোমাকে আজ রাত্রে এমন একটি সন্তান দান করবেন যে দুনিয়া ও আখেরাতের নেতা৷"
একথা শোনার পর সে বিনয় ও লাজুকতারসাথে বসে পড়ল৷ আমি নামায-কালাম পড়ে ইফতার করে শুয়ে পড়লাম৷
মধ্যরাত্রে উঠে তাহাজ্জতের নামাযপড়লাম৷ নারজিস ঘুমাচিছল কিন্তু বাচচা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না৷ নামায শেষেপুনরায় শুয়ে পড়লাম৷
কিছুক্ষণ পর ঘুম ভেঙ্গে গেল দেখলামনারজিস নামায পড়ছে কিন্তু বাচচা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না৷ তখন আমার সন্দেহহল ইমাম হয়ত ঠিক বুঝতে পারে নি৷
এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাঁরশোয়ার ঘর থেকে উচচস্বরে বললেন,
لا تعجلي يا عمه فانّ الامر قد قرب
"ফুপি আম্মা ব্যস্ত হবেন না বাচচাহওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে৷"
একথা শোনার পর আমি সুরা সাজদা এবংসুরা ইয়াছিন পড়তে লাগলাম৷ এর মধ্যে হটাৎ নারজিস লাফিয়ে উঠলে আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসাকরলাম তোমার ব্যথা অনুভব হচেছ? বলল, "হ্যাঁ ফুপি৷"
আমি বললাম: চিন্তার কোন কারণ নেইধৈর্য ধর, তোমাকে যে সুসংবাদ দিয়েছিলাম এটা তারই পূর্বাভাস৷
অতঃপর আমি ও নারজিস সামান্য ঘুমালাম, জেগে দেখি সেই চোখের মণি জন্মগ্রহণ করেছে এবং সেজদা করছে৷ তাকে কোলে নিয়ে দেখলামসম্পুর্ণ পাক ও পবিত্র কোন ময়লা তার গায়ে নেই৷ এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী (আ.)বললেন, "ফুপি আম্মা আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসুন৷"
আমি নবজাতককে তাঁর কাছে নিয়ে গেলামতিনি শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং নিজের জিহবাকে তার মুখে দিলেন এবং চোখে ও কানেহাত বুলালেন এবং বললেন:
تكلم يا بنيّ
"আমার সাথে কথা বল হে আমার পুত্র৷"
পবিত্র শিশুটি বলল:
اشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له و اشهد محمد رسول الله
অতঃপর ইমাম আলী (আ.) সহ সকল ইমাম (আ.)গণের উপর দরুদ পাঠ করলেন৷
ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: "ফুপি!তাকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে যান সে মাকে সালাম করবে, তারপর আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়েআসুন৷"
তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম, সেমাকে সালাম করল নারজিস সালামের উত্তর দিল এবং আবার তাকে তাঁর পিতার কাছে নিয়েগেলাম৷
হাকিমা খাতুন বলেন: "পরের দিন আমি ইমাম হাসান আসকারী(আ.)-এর কাছে গিয়ে সালাম করলাম এবং ঘরে ঢুকে নবজাতককে দেখতে পেলাম না৷ ইমামের কাছেজানতে চাইলাম, ইমাম মাহ্দী কোথায়, তাঁকে দেখছিনা কেন, তাঁর কি হয়েছে?
ইমাম বললেন: "ফুপি, তাকে তাঁর কাছে শপে দিয়েছি যারকাছে হযরত মুসার মাতা মুসা (আ.)-কে শপে দিয়েছিলেন৷"
হাকিমা খাতুন বলেন: "সপ্তম দিনে আবারইমামের বাসায় গেলাম এবং ইমাম আমাকে বললেন: "ফুপি, আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়েআসুন! আমি তাঁকে ইমামের কাছে নিয়ে আসলাম৷ ইমাম বললেন: "হে আমার সন্তান! কথা বল!শিশুটি মুখ খুললেন এবং কালিমা শাহাদত পাঠ করলেন৷ অতঃপর মহানবী ও তাঁর পবিত্র আহলেবাইতের প্রতি দরুদ পাঠ করলেন৷ অতঃপর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
﴿بِسْمِ اللّهِ الرّحْمَنِ الرّحيمِ * وَ نُريدُ أَنْ نَمُنّ عَلَي الّذينَ اسْتُضْعِفوا فِي الْأَرْضِ وَ نَجْعَلَهُمْ أَئِمّةً وَ نَجْعَلَهُمُ الْوَرِثينَ وَ نُمَكنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَ نُرِيَ فِرْعَوْنَ وَ هَمَنَ وَ جُنوذَهُما مِنْهُمْ ما كانوا يَحْذَرونَ﴾
"আমি ইচছা করলাম পৃথিবীতে যাদেরকেহীনবল করা হয়েছিল, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকেনেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধিকারী করতে এবং তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিতকরতে, আর ফিরাউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা তাদের নিকট তারা আশঙ্কাকরত" (সূরা কাসাস আয়াত নং ৫, ৬/ কামালুদ্দিন, খণ্ড-২, বাবে ৪২, হাদীস নং-১, পৃ.-১৪৩)৷
আকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য
রাসূল (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত(আ.)-এর বাণীতে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তারকিছু এখানে তুলে ধরছি:
তাঁর চেহারা যুবক এবং গৌরবর্ণেও, কপাল প্রশস্ত ও উজ্বল, ভ্রু চাঁদের মত, চোখের রং কালো ও টানা টানা, টানা নাক ওসুন্দর, দাঁতগুলো চকচকে৷ ইমামের ডান চোয়ালে একটি কালো তিল আছে এবং কাধের মাঝেনবীগণের মত চিহ্ন আছে৷ তাঁর গঠন সুঠাম ও আকর্ষণীয়৷
পবিত্র ইমামদের পক্ষ থেকে তাঁরসম্পর্কে যে সকল বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে তুলে ধরা হল:
ইমাম মাহদী (আ.) তাহাজ্জুদের নামাজপড়েন, সংযমি এবং সাধারণ, ধৈর্যশীল এবং দয়ালু, সৎকর্মশীল ও ন্যায়পরায়ন৷ তিনি সকলজ্ঞান-বিজ্ঞানের ধনভান্ডার৷ তাঁর সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে পবিত্রতা এবং বরকতেরঝর্ণাধারা৷ তিনি জিহাদী ও সংগ্রামী, বিশ্বজনীন নেতা, মহান বিপ্লবী এবং তিনিপ্রতিশ্রুত শেষ সংষ্কারক ও মুক্তিদাতা৷ সেই জ্যোর্তিময় অস্তিত্ব রাসূলের বংশধর, হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরার সন্তান এবং সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এরনবম বংশধর৷ তিনি মক্কা শরিফে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর হাতে থাকবে রাসূল (সা.)-এরঝাণ্ডা৷ তিনি সংগ্রামের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করবেন ও আল্লাহর শরিয়তকেসারাবিশ্বে প্রচলিত করবেন৷ এ পৃথিবী অন্যায় অত্যাচারে পরিপূর্ণ হওয়ার পর তিনি তান্যায়-নীতিতে পরিপূর্ণ করবেন (মুনতাখাবুল আছার দ্বিতীয় অধ্যায়পৃ.-২৩৯-২৮৩)৷
ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনি তিনটিঅধ্যায়ে বিভক্ত:
১৷ গুপ্ত অবস্থা: জন্মের পর থেকে ইমামহাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদত পর্যন্ত তিনি গুপ্ত অবস্থায় জীবন-যাপন করেন৷
২৷ অদৃশ্যকাল: ইমাম হাসান আসকারী(আ.)-এর শাহাদতের পর থেকে শুরু হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশে আবির্ভাব হওয়ার পূর্বপর্যন্ত তা চলতে থাকবে৷
৩৷ আসরে যহুর (আবির্ভাবের সময়): অদৃশ্যকালশেষ হওয়ার পর মহান আল্লাহর ইচছায় তিনি আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীকে সুখ-শান্তি ওসৌন্দর্যে পরিপূর্ণ করবেন৷ কেউই তাঁর আবির্ভাবের সময়কে জানেন না৷ ইমাম মাহদী (আ.)নিজেই বলেছেন, যারা তাঁর আবির্ভাবের সময়কে নির্ধারণ করবে তারা মিথ্যাবাদী(ইহতিজাজা, খণ্ড-২, পৃ.-৫৪২)৷
সূত্রঃ ইন্টারনেট