ইমাম রেযা (আ.) এর জ্ঞানগত ও তফসিরগত ব্যক্তিত্ব

ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.) তাঁর সন্তানদের উদ্দেশ্যে বলেন: "তোমাদের এ ভাই আলী ইবনে মুসা (আ.) হচ্ছে নবী বংশের মধ্যে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি, তোমাদের ধর্মীয় প্রশ্নগুলো তার কাছ থেকে জেনে নাও এবং সে তোমাদেরকে যা শিক্ষা দেবে তা মনে রেখ, আমার বাবা ইমাম জাফর সাদেক (আ.)

ইমাম রেযা (আ.) এর জ্ঞানগত ও তফসিরগত ব্যক্তিত্ব

ইমাম রেযা, ইমাম, ম আবা সাল্‌ত, মোহাম্মদ, মুসা ইবনে জাফর, মুসা, জাফর, খলিফা, মাযহাব, ফেরকা, ইমাম, ম ইব্রাহীম, কোরান, মোনাযেরা, ইঞ্জিল, আকায়েদ, আল্লাহ, মোহাম্মদ বাকের, বিহারুল আনওয়ার, কুলাইনি, কাফি
ইমামতের ধারার এ অষ্টম ইমাম তাঁর স্বাধীন পূর্বপুরুষদের মত জ্ঞানগত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন; যার কারণে তাঁকে "আলেমে আলে মোহাম্মদ" নামে পদবী প্রদান করা হয়েছে।
আবা সাল্‌ত মোহাম্মদ বিন ইসহাক হতে এবং তিনি ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.) হতে বর্ণনা করেন:
« هذا اخوكم علي بن موسي عالم آل محمد (ص) فاسئلوه عن أديانكم و احفظوا ما يقول لكم، فإني سمعت أبي جعفر بن محمد غير مرة يقول لي: إنّ عالم آل محمد (ص) لفي صلبك و ليتني ادركته »
ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.) তাঁর সন্তানদের উদ্দেশ্যে বলেন:
"তোমাদের এ ভাই আলী ইবনে মুসা (আ.) হচ্ছে নবী বংশের মধ্যে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি, তোমাদের ধর্মীয় প্রশ্নগুলো তার কাছ থেকে জেনে নাও এবং সে তোমাদেরকে যা শিক্ষা দেবে তা মনে রেখ, আমার বাবা ইমাম জাফর সাদেক (আ.) আমাকে অনেকবার বলেছেন যে, নবী বংশের মধ্যে বিজ্ঞ ব্যক্তিটি হবে তোমার সন্তান, হায় ! আমি যদি তার দেখা পেতাম"।(১০)
খলিফার দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন মাযহাব ও ফেরকার চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞজনদের আহবান করতো এবং তাদেরকে ইমাম রেযা (আ.) এর মুখোমুখি করতো কিন্তু সেই বৈঠক তাদের অভিযোগ ও ইমাম (আ.) এর মহত্বের কারণ হত আর তাঁর অনুসারীদের জন্য জ্ঞানগত ও আকিদাগত দিক দিয়ে লাভজনক হত। বেশিভাগ আলোচনা ও মোনাযেরা বৈঠকের মধ্যে যারা উপস্থিত থাকতো তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে আব্দুস সালাম হারাউয়ি, সে বলে:
"ইমাম রেযা (আ.) হতে বিজ্ঞ লোক আমি আর কাউকে দেখিনি এবং এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তি নেই যে, তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে তাঁর জ্ঞানগত যোগ্যতার স্বীকার করেনি"।(১১)
এ ধরণের জলসায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে আরেকজন চাক্ষুস প্রমাণ হচ্ছেন ইব্রাহীম ইবনে আব্বাস সুলি, তিনি বলেন:
"এমন কোন প্রশ্ন ছিল না যে, ইমাম রেযা (আ.) তার জবাব দিতেন না, শিক্ষা ও জ্ঞানের দিক থেকে আমি তাঁর চেয়ে উত্তম ও বিজ্ঞ ব্যক্তি আর দেখিনি। খলিফা মামুন যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতো তার সম্পূর্ণ জবাব সে পেতো এবং ইমাম (আ.) যা কিছু বলতেন সব পবিত্র কোরানের উপর ভিত্তিশীল। তিনি প্রতি তিন দিনে দিন -রাত মিলিয়ে একবার কোরান খতম করতেন এবং বলতেন: আমি যদি ইচ্ছা করি এর চেয়ে কম সময়ে একবার কোরান খতম করতে পারি, কিন্তু (তিন দিনের এ খতমে) এমন কোন আয়াত আমি অতিক্রম করি না যা নিয়ে আমি চিন্তা করিনি যে, তার উদ্দেশ্য কি এবং কোন বিষয়ে নাযিল করা হয়েছে এবং কখন নাযিল করা হয়েছে, এ কারণেই কোরান তেলাওয়াত করে শেষ করতে আমার তিন দিন সময়ে লাগে"।(১২)
পবিত্র কোরানকে বিশ্বাস ও সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ইমাম রেযা (আ.) এর একটি পদ্ধতি ছিল এই যে, বেশিভাগ সময়ে -মোনাযেরাতে হোক কিম্বা জ্ঞানগত অন্য কোন আলোচনাতে- কোরানের আয়াত থেকে যুক্তি -প্রমাণ নিয়ে আসতেন; এমনভাবে আলোচনা করতেন যেন মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায় এবং কোরানের কথাকেই বিশ্বাসযোগ্য ও শেষ কথা বলে মনে করতেন। অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইমাম (আ.) পবিত্র কোরানের আয়াতকে তখনই প্রমাণস্বরূপ পেশ করতেন যখন মোনাযেরা ও আলোচনাকারী ব্যক্তিটি মুসলমান হত এবং পবিত্র কোরানকে সত্য বলে বিশ্বাস করতো। আর নয়তো যদি সম্বোধনকারী অন্য কোন ধর্মের বিশ্বাসী হলে অথবা কোন ধর্মকেই বিশ্বাস না করলে সে ক্ষেত্রে ইমাম (আ.) হয় বুদ্ধিগত (আকলি) প্রমাণ পেশ করতেন অথবা তাদের বিশ্বাসকৃত ধর্ম গ্রন্থ থেকে প্রমাণাদি নিয়ে আসতেন। উদাহরণস্বরূপ ইমাম (আ.) জাসিলিক এক খ্রীষ্টানের সাথে মোনাযেরা করার সময় ইঞ্জিল থেকে(১৩) এবং রা'সুল জালুত এক ইহুদীর সাথে আলোচনার সময় তাওরাতের ঘটনা(১৪) এবং যারতুশ্তিয়ানদের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে স্বাধীন আলোচনার সময় এবং বিজ্ঞ আকায়েদ বিশেষজ্ঞ এমরান সাবি যে প্রকৃত পক্ষে খোদা বিশ্বাসী ছিল না তার সাথেও বুদ্ধিগত (আকলি) দলিল প্রমাণের উপর নির্ভর করে আলোচনা করেছেন।(১৫) আর যখন মুসলমান বলে দাবীদারদের সাথে মোনাযেরার সময়, যেমন: ইবনে জাহাম এর সাথে নবী করিমদের (আ.) নিষ্পাপ (ইসমাত) হওয়া সম্পর্কে প্রমাণ করতে গিয়ে(১৬)অথবা যখন সোলায়মান মোরাউওয়েযির সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাজ -কর্ম এবং দোষগুণ নিয়ে আলোচনা করেন সমস্ত প্রমাণাদি তখন পবিত্র কোরান থেকে নিয়ে আসেন।(১৭)
অতএব বলতে হবে যে, পবিত্র কোরান সম্পর্কে ইমাম রেযা (আ.) এর জ্ঞান এমন এক প্রকৃত সত্য ছিল যা বন্ধু ও শত্রু সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও অন্তর থেকে মামুন এ কথাটি বিশ্বাস করতে ও মেনে নিতে চাইতো না কিন্তু তার কারণে এমন ফল হল যে, ইমাম রেযা (আ.) এর জ্ঞানগত ও তফসিরগত ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রকাশ পেল।  
 
সূত্রসমূহ:
১। ফযল বিন হাসান তাবারসি, আ'লামুল ওয়ারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০; শেখ আব্বাস কোম্মি, মোনতাহিয়ুল আমাল, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৫৫।
২। মোহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে বাবওয়েই সদুক, উয়ুনু আখবারুর রেযা (আ.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৪।
৩। মোহাম্মদ বাকের মজলিসি, বিহারুল আনওয়ার, ৪৯তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১০।
৪। দ্রষ্টব্য: মোহাম্মদ বিন জারির তাবারি, তারিখু তাবারি, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৯।
৫। দ্রষ্টব্য: মোহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে বাবওয়েই, উয়ুনু আখবারুর রেযা (আ.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫।
৬। দ্রষ্টব্য: মোহাম্মদ বিন ইয়াকুব কুলাইনি, কাফি, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৯।
৭। দ্রষ্টব্য: মোহাম্মদ বাকের মজলিসি, বিহারুল আনওয়ার, ৪৯তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১০।
৮। মোহাম্মদ বাকের মজলিসি, বিহারুল আনওয়ার, ৪৯তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৩।
৯। দ্রষ্টব্য: মোহাম্মদ জাওয়াদ মোয়িনি ও আহমদ তোরাবি, ইমাম আলী ইবনে মুসা আর রেযা (আ.) মোনাদিয়ে তৌহিদ ওয়া ইমামত, পৃষ্ঠা: ১৭১।
১০। ফযল বিন হাসান তাবারসি, আ'লামুল ওয়ারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৪।
১১। ফযল বিন হাসান তাবারসি, আ'লামুল ওয়ারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৪।
১২। শেখ সদুক, উয়ুনু আখবারুর রেযা (আ.), ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪১৯, ৪৪তম অধ্যায়, হাদিস নং: ৪; হাসান আশ শাকেরি, মাউসু'আতুল মোস্তাফি ওয়াল ইতরাহ, ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮০।
১৩। দ্রষ্টব্য: শেখ সদুক, উয়ুনে আখবারুর রেযা (আ.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৩ হতে ৩৬১ পর্যন্ত, ১২তম অধ্যায়, হাদিস নং: ১।
১৪। দ্রষ্টব্য: শেখ সদুক, উয়ুনে আখবারুর রেযা (আ.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৩ হতে ৩৬১ পর্যন্ত, ১২তম অধ্যায়, হাদিস নং: ১।
১৫। দ্রষ্টব্য: শেখ সদুক, উয়ুনে আখবারুর রেযা (আ.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৩ হতে ৩৬১ পর্যন্ত, ১২তম অধ্যায়, হাদিস নং: ১।
১৬। দ্রষ্টব্য: শেখ সদুক, উয়ুনে আখবারুর রেযা (আ.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৮, ১৪তম অধ্যায়, হাদিস নং: ১।
১৭। দ্রষ্টব্য: শেখ সদুক, উয়ুনে আখবারুর রেযা (আ.), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৬১ হতে ৩৮৮ পর্যন্ত, ১৩তম অধ্যায়, হাদিস নং: ১।
 
- মূল: সাইয়েদ আব্বাস বাকেরি, দিদগাহহায়ে ইমাম রেযা (আ.) দার তফসির ওয়া উলুমে কোরান।
(সূত্র : ইন্টারনেট)