হজরত ইমাম হাসান (আ) এর পবিত্র জন্মবার্ষিকী

১৫ রমজান ইসলামের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। কারণ তৃতীয় হিজরীর এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইমাম আলী (আ.) ও নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা (সা.) এর বড় সন্তান ইমাম হাসান ( আ)। ইমাম হাসান সম্পর্কে নবীজী বলেছেন,'হাসান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্যে বিশেষ এক উপহার।

হজরত ইমাম হাসান (আ) এর পবিত্র জন্মবার্ষিকী

ইমাম হাসান, মুসলমান, রাসূলে খোদা, ইমাম হাসান (আ), ইহুদি, স্ত্রী, ইমাম হাসান, হযরত ফাতেমা, ইমাম আলী, রাসূলে খোদা, ইসহাক, ইমাম আলী

১৫ রমজান ইসলামের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। কারণ তৃতীয় হিজরীর এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইমাম আলী (আ.) ও নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা (সা.) এর বড় সন্তান ইমাম হাসান ( আ)। ইমাম হাসান সম্পর্কে নবীজী বলেছেন,'হাসান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্যে বিশেষ এক উপহার। সে মানুষকে আমার জ্ঞানের সাথে পরিচয় করাবে এবং আমার জীবনপদ্ধতি ও রীতিনীতিকে উজ্জীবিত করবে। কেননা তার আচার-আচরণ হবে আমারই মতো। আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করুন যে তাকে চিনবে এবং আমার সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রেখে তার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।'
শৈশবের সাতটি বছর রাসূলে খোদার দুর্লভ সান্নিধ্য ও সাহচর্য ছিল হাসানের জীবনের অমূল্য অর্জন। ইতিহাসে এসেছে-চেহারায় রাসূলের সঙ্গে ইমাম হাসান (আ.) এর খুব বেশি মিল ছিল। নবীজীও ভীষণরকম আদর ও স্নেহ করতেন তাঁকে। ইমাম হাসানও নানাকে খুব বেশি পছন্দ করতেন। প্রতিদিন তিনি যেতেন মসজিদে নানার সুমিষ্ট ও মূল্যবান বাণী শোনার জন্যে। ইমাম যখন ছোট্ট,তখনই নানার মুখের ওহীসমৃদ্ধ কথাগুলো বুঝতে পারতেন এবং বাসায় ফিরে নবীজীর মূল্যবান শিক্ষাগুলোকে মায়ের কাছে বর্ণনা করতেন।
ইমাম হাসান (আ) ছোটবেলা থেকেই সুন্দর করে কথা বলতেন। ইমামের সমকালীন ব্যক্তি উমায়েদ ইবনে ইসহাক এ সম্পর্কে বলেছেনঃ 'হাসান ইবনে আলী (আ.) যখন কথা বলতেন,তখন অনুরোধ করতাম যেন বক্তব্য অব্যাহত রাখেন। আমি তাঁর কথা শুনে ভীষণ উৎফুল্ল হতাম,তৃপ্ত হতাম। তাঁর পবিত্র মুখে রূঢ় কোনো শব্দ উচ্চারিত হতে কখনোই শুনিনি। সেই ছোট্ট বেলাতেই ইমাম হাসান ধর্মীয় বিষয়ে বেশ জ্ঞান রাখতেন। নবীজী এবং হযরত আলী (আ) ইমাম হাসানের এই জ্ঞান সম্পর্কে জানতেন। সেজন্যে তাঁরা ধর্মীয় নিয়ম-নীতি সম্পর্কে জনগণ প্রশ্ন করলে তার জবাবের জন্যে মাঝেমাঝে হাসান (আ) এর কাছে পাঠাতেন। আর ইমাম হাসানও অত্যন্ত দৃঢ়তা এবং যোগ্যতার সাথে জনগণের প্রশ্নের যথার্থ জবাব দিতেন।'
রাসূলেখোদা (সা.) এবং হযরত ফাতেমা (সা.) মহান আল্লাহর ডাকে পরপারে চলে যাওয়ার পর ইমাম হাসান পিতা ইমাম আলীর পাশেই ছিলেন। টানা ৩০টি বছর তিনি পিতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে ব্যাপক অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং পিতার বিচিত্র জ্ঞানের ঝর্ণাধারায় অবগাহন করে অসামান্য সমৃদ্ধি অর্জন করেন। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি তাঁর লেখা ইতিহাসগ্রন্থে লিখেছেন- "হাসান ইবনে আলী (আ) চারিত্রিক এবং মানবীয় বহু গুণে গুনান্বিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু, মর্যাদাবান, সুদৃঢ় এবং সদয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ইমাম হাসান (আ) নিজের সকল ধন-সম্পদ আল্লাহর পছন্দনীয় পূণ্য কাজে ব্যয় করেছেন এবং আল্লাহর পথে বহু মালামাল দান করেছেন।"
দানশীলতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। ইতিহাসে এসেছে- ইমাম হাসান (আ) তাঁর জীবনে দুইবার নিজের সকল সহায়-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার নিজের অর্থ-সম্পদের অর্ধেকটা গরীব-অসহায়দের দান করেছেন। তিনি কখনো কোনো সাহায্য প্রার্থীকে ফিরিয়ে দেননি। যারা তাঁর কাছে অভাবের কথা পেশ করেছে তাদেরকে কখনো ‘না' বলেননি। এ ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমিও আল্লাহর দরবারে একজন সাহায্যপ্রার্থী। আমি চাই,তিনি যেন কখনোই আমাকে বঞ্চিত না করেন। এ আশাতেই সাহায্যপ্রার্থীদেরকে ফিরিয়ে দিতে বা হতাশ করতে লজ্জা বোধ করি। যে আল্লাহ আমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহকে সহজলভ্য করেছেন,তিনি তো আমার কাছেও চাচ্ছেন তাঁর নেয়ামতকে যেন মানুষকে দান করি।'
ইমাম হাসান একদিন তাঁর চলার পথে দেখতে পেলেন কিছু ফকীরকে দস্তরখান পেতে রুটির টুকরো চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছে। তারা ইমামকে দেখে বললোঃ হে রাসূলের সন্তান! আসুন ! আমাদের সাথে আহার করুন! ইমাম দ্বিধাহীন চিত্তে পরিপূর্ণ আগ্রহ ও উৎসাহের সাথে তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন এবং দ্রুত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এসে তাদের সাথে বসে পড়লেন। বসেই তিনি বললেন-আল্লাহ অহংকারীদের ভালোবাসেন না-এই বলে তিনি ফকিরদের সাথে আহার করতে শুরু করলেন। না,কেবল খেলেনই না, বরং তাদেরকে নিজের বাসায় দাওয়াতও করলেন। অতিথি ফকিরগণ যখন ইমামের বাসায় এলেন, ইমাম হাসান তাদেরকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করলেন এবং তাদের মেহমানদারি করলেন। সেইসাথে তাদের সবাইকে নতুন জামা-কাপড়ও উপহার দিলেন।'-এ রকম গর্ব-অহংকারমুক্ত একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম হাসান (আ.)
প্রতিবেশীদের অধিকারের প্রতি তিনি সব সময় নজর রাখতেন। নিজের ক্ষতি হলেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদাচার করতেন তিনি। ইমামের ঘরের পাশে এক ইহুদি পরিবার বসবাস করতো। একবার ওই ইহুদি লোকটির ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরায় ইমাম হাসান (আ) এর ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এ বিষয়টা ইহুদি প্রতিবেশী জানতো না। একদিন ইহুদি ভদ্রলোকের স্ত্রী ইমাম হাসান (আ) এর ঘরে কিছু একটা চাইতে এলেন। তখন বুঝতে পারলেন যে, তাদের ঘরের ক্ষতির আঁচড় ইমাম হাসান (আ) এর ঘরেও লেগেছে। মহিলা দেরি না করে তার স্বামীর কাছে দৌড়ে গিয়ে ব্যাপারটা খুলে বললো। ইহুদি ভদ্রলোক ইমামের কাছে গিয়ে নিজের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করলো এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলো। এ সময় ইমাম হাসান বললেনঃ 'আমার নানা রাসূলে খোদা (সা) এর কাছে শুনেছি,তিনি বলেছেন,‘প্রতিবেশীর ব্যাপারে সদয় হবে এবং তাদের সঙ্গে সদাচার করবে।' ইহুদি লোকটি এ জবাব শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল এবং ইমাম হাসানের প্রতি আকৃষ্ট হলো। সে বাসায় ফিরে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পুনরায় ইমামের কাছে এলো এবং মুসলমান হয়ে গেল।
ইমাম হাসান কেবল এসব গুণের অধিকারীই ছিলেন না। তিনি একদিকে ছিলেন ধৈর্য, প্রজ্ঞা, বিনয়, ভদ্রতা ও নম্রতার অধিকারী এবং অন্যদিকে ছিলেন সাহস ও বীরত্বের অধিকারী। সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ। বিচার কার্যেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। সর্বগুণের অধিকারী এই মহান মনীষীর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনকে সমৃদ্ধ ও আলোকিত করবো এই কামনায় শেষ করছি সংক্ষিপ্ত এই আলোচনা।

(সূত্র : ইন্টারনেট)