ইমাম হাসান (আ.) এর সামাজিক জীবন

মানুষের ব্যক্তিত্বের আত্মিক উন্নতি, ধর্মীয় নেতাদের উচ্চতর ও পবিত্র উদ্দেশ্য ছিল। এই পথে তাঁরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, নিজের যত চেষ্টা ছিল তা ব্যায় করেছেন যাতে নেক চরিত্রকে নিজেদের আচরণ ও ব্যবহারের সুন্দর পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিতে পারেন এবং তাদে

ইমাম হাসান (আ.) এর সামাজিক জীবন

নাহজুল বালাগা, নহাসান মুজতাবা, মোহাম্মদ হানাফিয়্যাহ, খলিফা, জামালের যুদ্ধ, খেলাফত, হযরত আলী

মানুষের ব্যক্তিত্বের আত্মিক উন্নতি, ধর্মীয় নেতাদের উচ্চতর ও পবিত্র উদ্দেশ্য ছিল। এই পথে তাঁরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, নিজের যত চেষ্টা ছিল তা ব্যায় করেছেন যাতে নেক চরিত্রকে নিজেদের আচরণ ও ব্যবহারের সুন্দর পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিতে পারেন এবং তাদেরকে অশোভনীয় কাজ ও নোংরামি হতে দূরে রেখে মানুষের সত্যতার উচ্চতর স্থান ও তার মহান মর্যাদার প্রতি মনোযোগী করাতে পারেন।
এর মধ্যে ইমাম হাসান (আ.) এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা চোখে পড়ার মত অনেক আলোকিত করে। সুতরাং আমরা চিন্তা করেছি যে, সংক্ষেপে ইমাম হাসান (আ.) এর সামাজিক জীবন সম্পর্কে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যর দরজা খুলে দেব।

মেহেরবানী ও দয়া
আল্লাহর বান্দাদের সাথে মেহেরবানী করা ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) এর একটি বিশেষ গুণ ছিল। আনাস বর্ণনা করে: একদিন ইমাম হাসান (আ.) এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম, তাঁর কানিযদের (দাসী) মধ্য থেকে একজন হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে প্রবেশ করলো এবং ফুলের তোড়াটি ইমামকে পেশ করলো। ইমাম ফুলটি তার তার কাছ থেকে নিলেন এবং মেহেরবানীর সাথে তাকে বললেন: “যাও তোমাকে মুক্ত বা আজাদ করলাম” আমি ইমামের এই আচরণ ও ব্যবহার দেখে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম: “ইয়াবনা রাসুলিল্লাহ !! এই দাসী আপনাকে মাত্র একটি ফুলের তোড়া উপহার স্বরূপ দিল। আর আপনি তাকে মুক্ত করে দিলেন?!” ইমাম (আ.) আমার জবাবে বললেন:“আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে বলেছেন যদি কোন ব্যক্তি তোমাদের প্রতি মেহেরবানী করে, পক্ষান্তরে তুমি তার দুই বরাবর জবাব দেবে”। (সুরা আন্‌ নিসা, আয়াত: ৮৬) অতঃপর বললেন: “তার মেহেরবানীর মোকাবেলায় পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্ত করা ছিল”। (১)

ইমাম (আ.) সব সময় মেহেরবানীর জবাব মেহেরবানীর সাথেই দিতেন। এমনকি ঘৃণার বিপরীতেও তাঁর জবাব মেহেরবানীর সাথে হতো। যেমন লেখা হয়েছে যে, ইমাম (আ.) এর একটি সুন্দর ভেড়া ছিল, যেটাকে তিনি খুবই ভালবাসতেন। একদিন দেখলেন যে তার ভেড়াটি এক কোনাতে পড়ে আহাজারি করছে। ইমাম এগিয়ে গেলেন আর দেখলেন যে তার পা ভেঙ্গে গেছে। ইমাম তার গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন: “কে এই প্রাণীর পা ভেঙ্গেছে?” গোলাম বলল: “আমি ভেঙ্গেছি”। ইমাম বললেন: “কেন তুমি এরকম করলে?” সে বলল: “আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য করেছি”। ইমাম হৃদয়গ্রাহী এক মুচকি হাসি দিয়ে বললেন: “কিন্তু তার পরিবর্তে আমি তোমাকে খুশী করে দেব এবং গোলামকে মুক্ত করে দিলেন”। (২)
এরকম আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, একদিন ইমাম (আ.) খেতে মশগুল ছিলেন তখন একটি কুকুর এল এবং ইমামের সামনে দাড়িয়ে গেল। ইমাম এক লোকমা নিজে খেতেন আর এক লোকমা কুকুরের সামনে দিতেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো: “ইয়াবনা রাসুলিল্লাহ ! যদি অনুমতি হয় প্রাণীটাকে দূরে সরিয়ে দেই”। ইমাম বললেন: “না, ছেড়ে দাও ! আমি খোদার কাছে লজ্জা পাই যে, একটি জীবিত প্রাণী আমার খাওয়ার প্রতি দৃষ্টি দেবে আর আমি তাকে খেতে দেব না”। (৩)
 
আত্মত্যাগ ও মহানুভবতা
ইমাম (আ.) খুবই দয়াশীল ও মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন আর অন্যের অত্যাচার ও নিপীড়নকে উপেক্ষা করে চলতেন। প্রায় ঘটেছে যে, অন্যের অশোভন আচরণে ইমামের প্রতিক্রিয়া অপরাধী লোকটির আচরণে পরিবর্তন এনেছে।
লিপিবদ্ধ আছে যে, ইমামের (আ.) প্রতিবেশীত্বে এক ইয়াহুদী পরিবার জীবন ধারণ করতো। ইয়াহুদীর বাড়ীর প্রাচীরে ফাটল ধরে ছিল এবং অপবিত্র ও নাপাক পানি তার ঘর থেকে ইমামের (আ.) বাসাতে প্রবেশ করছিল। ইয়াহুদী লোকটি অবশ্য এ সম্পর্কে কিছুই জানতোনা। একদিন ইয়াহুদী লোকের স্ত্রী সাহায্যের জন্য ইমামের (আ.) বাড়ীতে এল এবং দেখতে পেল যে, দেয়ালের ফাটলের কারণে ইমামের (আ.) ঘরের প্রাচীর অপবিত্র হয়ে গেছে। বিলম্ব না করে স্বামীর কাছে গেল এবং তাকে অবহিত করলো। ইয়াহুদী লোকটি ইমামের (আ.) খেদমতে হাজির হল এবং নিজের অসতর্কতার জন্য ক্ষমা চাইলো এবং ইমাম (আ.) যে এতদিন চুপচাপ ছিলেন আর কিছু বলেননি তার জন্য খুব লজ্জিত হল। লোকটি যাতে আর বেশী লজ্জিত না হয় তাই ইমাম (আ.) বললেন: “আমার নানা আল্লাহর রাসুলের (সা.) কাছে শুনেছি যে, প্রতিবেশীদের সাথে মেহেরবানী কর”। ইয়াহুদী ব্যক্তি ইমামের (আ.) মহানুভবতা আর দেখেও না দেখার ভান করাতে এবং তাঁর পছন্দনীয় আচরণ দেখে তার বাড়ী ফিরে এলো। স্ত্রী ও বাচ্চার হাত ধরে ইমামের (আ.) কাছে এলো এবং তাঁর কাছে চাইলো যে, তাদেরকে দ্বীন ইসলামের প্রতি দিক্ষীত করে তুলুক। (৪)
তেমনি শ্যাম নগরের একব্যক্তি সম্পর্কে ইমামের মহানুভবতার একটি বিখ্যাত ঘটনা যে, সেই ব্যক্তিটি ইমামের (আ.) এতো মেহেরবানী ও মহানুভবতা দেখে লজ্জাতে কান্না করা ছাড়া আর অন্য কোন পথ পায়নি তারপর থেকে এই বংশের একজন ভাল বন্ধু হয়ে গেল। (৫)

 ইমামের (আ.) মেহেরবানী ও আত্মত্যাগের পরিসর এতো বিস্তৃত যে তার হত্যাকারীকেও শামিল করে নিয়েছে। যেমন: “ওমর ইবনে ইসহাক্ব” বলে: আমি ও হোসাইন (আ.) শাহাদাতের সময় ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) এর পাশে ছিলাম, তিনি তখন বললেন: “কতবার আমাকে বিষ দেয়া হয়েছে, কিন্তু এইবার পার্থক্য করে; কেননা এইবার আমার কলিজাকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে”। ইমাম হোসাইন (আ.)উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞেস করলেন: “আপনাকে কে বিষ দিয়েছে ?” আমি যাকে মনে করছি যদি সেই হয়ে থাকে, আপনার কষ্টের চেয়ে তার উপর খোদার আযাব বেশী হবে। আর যদি সে না হয়, আমি চাই না আমার কারণে তাকে বেগুনাহ আটক করা হোক”। (৬)
 
মেহমান নেওয়াজী বা আতিথেয়তা
ইমাম (আ.) সব সময় মেহমানদের আপ্যায়নে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। মাঝে মধ্যে এমন সব ব্যক্তিদের আপ্যায়ন করাতেন যাদেরকে তিনি আসলে জানতেনই না। বিশেষ করে নিঃস্ব ও অসহায় লোকদেরকে আপ্যায়ন করাতে বেশী ভালবাসতেন। তাদেরকে নিজের ঘরে নিয়ে আসতেন এবং মন খুলে তাদের আপ্যায়ন করাতেন। অতঃপর তাদেরকে পরিধানের জন্য কাপড় ও টাকা পয়সা দিতেন। (৭)

ইমাম হাসান (আ.) যে সফরে ইমাম হোসাইন (আ.) ও আব্দুল্লাহ ইবনে জাফারের সাথে হজ্বব্রত পালন করতে গিয়েছিলেন, যে উটের পিঠে মাল পত্র ছিল হারিয়ে যায়, তারা মাঝ পথে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থেকে যান। এই সময় একটি তাঁবুর দিকে তারা মনোযোগী হোন, যেখানে এক বৃদ্ধা মহিলা একা জীবন যাপন করতো। তার কাছে দানা পানি চাইলেন। সেই বৃদ্ধা মহিলাও যেহেতু একজন মেহেরবান ও অতিথিপরায়ণ ছিল, তার একমাত্র ভেড়ার দুধ দোহালো এবং বলল: “খাওয়ার জন্য ওটাকে জবাই কর যাতে তোমাদের জন্য খাওয়ার আয়োজন করতে পারি”। ইমাম (আ.) ও সেই ভেড়াটাকে জবাই করলেন আর বৃদ্ধা মহিলাটি তা দিয়ে ইমামের (আ.) জন্য খাওয় তৈরী করলো। তারা খাওয়া দাওয়া করলেন তারপর সেই বৃদ্ধা মহিলাকে কৃতজ্ঞতা জানালেন আর বললেন: “আমরা কোরায়শ গোত্রের লোক হজ্বব্রত পালন করতে যাচ্ছি। যদি মদীনাতে তোমার আসা হয় আমাদের কাছে এসো, যাতে তোমার আতিথেয়তার শোধ পুষিয়ে দেব”। অতঃপর সেই মহিলার কাছ থেকে বিদায় নিলেন এবং নিজেদের পথে যাত্রা শুরু করলেন। রাতে সেই মহিলার স্বামী তার তাঁবুতে এলো এবং সে আতিথেয়তার ঘটনাটি তাকে সব খুলে বলল। লোকটি রাগান্বিত হল এবং বলল: “কিভাবে তুমি এই মরু ভূমিতে একমাত্র ভেড়াটি যা আমাদের সমস্ত ধন সম্পদ ছিল যাকে তুমি জান না তার জন্য জবাই করলে ?”এই ঘটনার অনেকদিন পার হয়ে গেল আর একদিন যাযাবর ও মরুভূমিতে বসবাসকারীরা খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণে মদীনার দিকে রওয়ানা দিল। সেই মহিলাও তার স্বামীর সাথে মদীনাতে এলো। এই সময় একদিন ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) সেই বৃদ্ধা মহিলাকে পথে দেখতে পেলেন এবং বললেন: “এই খোদার দাসী !! আমাকে কি তুমি চিনতে পেরেছ ?” সে বলল: “না”, ইমাম (আ.) বললেন: “আমি সেই ব্যক্তি যে অনেকদিন পূর্বে দুজনের সাথে তোমার তাঁবুতে খাওয়া দাওয়া করে এসেছিলাম আমার নাম হাসান ইবনে আলী (আ.)”। বৃদ্ধা মহিলাটি খুশী হল এবং বলল: “আমার পিতা মাতে তোমার উপর উৎসর্গ হোক !” ইমাম (আ.) তার আতিথেয়তা ও আত্ম ত্যাগের খাতিরে, তাকে এক হাজার ভেড়া ও এক হাজার সোনার দিনার দান করলেন এবং তাকে নিজের ভাই হোসাইনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তিনিও তাকে সেই পরিমাণ ভেড়া ও সোনার দিনার দান করলেন এবং তাকে আব্দুল্লাহ ইবনে জাফারের নিকট পাঠিয়ে দেন। আব্দুল্লাহও নিজের ধর্ম নেতাদের অনুসরণে সেই পরিমাণ সেই বৃদ্ধা মহিলাকে দান করেন। (৮)

ইমাম (আ.) এই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার সাথে সাথে সেই আগন্তুক অতিথির আতিথেয়তাও করলেন এবং তার নেক কাজের মাধ্যমে মেহমানদারী ও আপ্যায়নের মহান মর্যাদাও রক্ষা করলেন। প্রায়ই যে সকল দারিদ্র ব্যক্তিরা তাঁকে আপ্যায়ন করেছিল তাদের উদ্দেশ্যে বলেন: “ফজিলত হচ্ছে তাদেরই। যদিও তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা অল্প এবং ধন সম্পদ বলতে কিছুই নেই, কিন্তু তারাই উচ্চ মানের মানুষ। কেননা তারা যা দিয়ে আমাদেরকে আপ্যায়ন করেছে তা ছাড়া অন্য কিছু তাদের কাছে নেই আর নিজের সব কিছু থেকে আত্ম ত্যাগ করলো। কিন্তু আমরা যা মেহমানকে দেই তার চেয়ে বেশী আমাদের কাছে রয়েছে”। (৯)
 
ব্যবহারের সময় ধৈর্য ও সহনশীলতা
ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) এর বরকতময় জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম সময়, মুয়াবিয়ার সাথে শান্তি চুক্তির পরের সময়টা ছিল। তিনি এই অত্যাচারিত বছরগুলোর কষ্টকে অবর্ণনীয় ধৈর্যের সাথে অতিক্রান্ত করেন। এই সময়ে তিনি পরিচিত ও অপরিচিত সবার কাছ থেকে অনেক খারাপ ও আঘাত দেয়ার মত কথা শুনেছেন এবং বিশ্বাস ভঙ্গ করা ধনুকের জখম খাচ্ছিলেন।
অনেক বন্ধু বান্ধব তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। খুব কষ্টে দিন কাটছিল। আলীকে (আ.) গালিগালাজ করা ও তার ব্যপারে অশ্লীল ভাষায় কথা বলা শহরের বক্তাদের নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। যখনই ইমামকে (আ.) কেউ দেখতো বলতো: “ السّلامُ عَلَیک یا مُذِلَّ المُومنین ” হে মুমেনিনদেরকে যে অপমানিত করেছে আপনার উপর সালাম হোক। (১০)

তাঁর উপস্থিতিতে আলী (আ.) এর অসম্মানে ও অপবাদে কথা বলতো। আর ইমাম হাসান (আ.) অনেক ধৈর্য ও অত্যাচারিত অবস্থায় এই সকল অপমান ও অপবাদগুলোকে সহ্য করতেন। একদিন তিনি মুয়াবিয়ার সভাতে প্রবেশ করেন। কক্ষটি খুবই জনাকীর্ণ ও ভিড় ছিল। ইমাম কোনও খালি যায়গা খুঁজে পাননি। বাধ্য হয়ে মেম্বরের উপরে মুয়াবিয়ার পায়ের কাছে গিয়ে বসলেন। মুয়াবিয়া আলিকে (আ.) অপবাদ দেয়ার মাধ্যমে নিজের বক্তব্য শুরু করলো আর নিজের খেলাফত সম্বন্ধে কথা বলতে লাগলো এবং বলল: “আমি আয়েশা থেকে খুবই বিস্মিত যে, সে আমাকে খেলাফতের উপযুক্ত মনে করেনি এবং তার চিন্তা ছিল খেলাফতের এই স্থানের অধিকারী আমি নই”। অতঃপর ঠাট্টার সুরে বলল: “এই সব কথা বার্তায় মহিলার কি কাজ ? খোদা তার গুনাহকে মাফ করুক। হ্যাঁ, খেলাফতের কাজে এই লোকের পিতার (ইমাম হাসানের (আ.) প্রতি ইশারা করে) আমার সাথে শত্রুতা ছিল, খোদাও তার প্রাণ নিয়ে নিল”। ইমাম (আ.) বললেন: “হে মুয়াবিয়া ! তুমি কি আয়েশার কথাতে আশ্চর্য হয়েছ ?” মুয়াবিয়া বলল: “খোদার কসম হ্যাঁ”। ইমাম (আ.) বললেন: “তুমি কি চাও যে, তার চেয়ে আশ্চর্যজনক কথা তোমাকে বলি ?” বলল: “হ্যাঁ বলেন”। ইমাম (আ.) উত্তরে বললেন: “আয়েশা যে, তোমাকে গ্রহণ করে না তার চেয়ে বেশী আশ্চর্যের কথা হল এই যে, আমি তোমার মেম্বরের নিচে তোমার পায়ের কাছে বসে থাকবো”। (১১)

ইমামের (আ.) এর ধৈর্য এতো ছিল যে, ইমামের (আ.) গুরুতর শত্রু মারওয়ান ইবনে হাকাম দুঃখ ভারাক্রান্ত তাঁর জানাযায় শরীক হল আর যারা তাকে বলল তুমিতো কাল পর্যন্ত তার শত্রু ছিলে (আজ জানাযাতে শরীক হলে কেন ?) তাদের জবাবে বলল: “সে এমন লোক ছিল যার ধৈর্য পাহাড়ের সাথে তুলনা করা যাবে না”। (১২)

দানশীলতা ও অন্যদের চাহিদা পূরণ করা
বলা যেতে পারে যে ইমাম হাসানের (আ.) গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব যা তাঁর অনুসারীদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হতে পারে, তা হচ্ছে অনেক বেশী দানশীল ও অন্যদের সাহায্য সহযোগিতা করা। তিনি বিভিন্ন অজুহাতে সবাইকে নিজের দস্তরখানে অংশীদার করতেন আর এতো পরিমাণ দান করতেন যে, অভাবগ্রস্ত স্বনির্ভর হয়ে যেতো। কেননা ইসলামী শিক্ষাই হচ্ছে এরূপ যে, এতটা দান করা হোক যাতে ভিক্ষাবৃত্তির সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সম্ভব হলে দরিদ্র ব্যক্তিকে অভাবগ্রস্তদের কাতার থেকে আলাদা করে ফেলা। একদিন ইমাম (আ.) ইবাদতে মশগুল ছিলেন। দেখলেন যে, এক ব্যক্তি তাঁর পাশে বসে আছে এবং আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বলছে: “হে খোদা! আমাকে দশ হাজার দেরহামের ব্যবস্থা করে দাও”। ইমাম (আ.) বাড়ী ফিরলেন আর লোকটির জন্য দশ হাজার দেরহাম পাঠিয়ে দিলেন। (১৩)
উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি ইমাম মুজতাবা (আ.) এর কাছে সাহায্য চাইলো। ইমামও (আ.) তাকে রূপার পঞ্চাশ হাজার দেরহাম এবং সোনার পাঁচ শত দিনার দান করলেন। সেই লোকটি ইমামকে বলল: “এতো ধন নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ভার বহনকারীর ব্যবস্থাও করে দিন”। ইমামও (আ.) একটি ভার বহনকারী ও তার সাথে নিজের একটি রেশমী কাপড়ও তাকে দান করেন। ইমাম হাসান (আ.) কখনই কোন ভিক্ষুককে নিজে থেকে দূরে সরিয়ে দিতেন না আর অভাবগ্রস্তদেরকে কখনও “না” বলতেন না বরং দান খয়রাতের সমস্ত আধ্যাত্মিক শর্তগুলোর প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। বলা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি ইমামের (সা.) কাছে এলো এবং নিজেকে অভাবগ্রস্ত সাব্যস্ত করলো। সরাসরি সাহায্য করতে গিয়ে লোকটির লজ্জিত হওয়ার কারণ না হয় তাই ইমাম (আ.) বললেন: “তোমার যা প্রয়োজন তা একটি টিঠিতে লিখে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও যাতে তোমার প্রয়োজনীয়তা দূর করা যেতে পারে”। সেই লোকটি চলে গেল এবং নিজের প্রয়োজন উল্লেখ করে একটি চিঠি ইমামকে (আ.) পাঠালো। ইমামও (আ.) তার চাওয়া মত জিনিষ পত্র তাকে পাঠালেন। ইমামের কাছে উপস্থিত এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল: “আসলেই লোকটির জন্য চিঠিটি খুব বরকতময় ছিল”। ইমাম (আ.) তার জবাবে বললেন: “এই কাজের বরকত আমার জন্য বেশী ছিল যে, আমার জন্য, এই নেক কাজ আঞ্জাম দেয়ার যোগ্য হওয়ার কারণ হল। কেননা সঠিক দান করার অর্থ হচ্ছে কোন ব্যক্তি চাওয়ার পূর্বেই তার প্রয়োজনীয়তা দূর করা, কিন্ত যদি কিছু চেয়ে থাকে আর তুমি তাকে দাও আসলে তার সম্মানের মূল্য তাকে দিয়েছ”। (১৪)

যে কোন অবস্থাতে অন্যের চাহিদা পূরণ করাকে ইমাম (আ.) অগ্রাধিকার দিতেন। ইবনে আব্বাস বর্ণনা করে: ইমাম হাসানের (আ.) সাথে মসজিদুল হারামে ছিলাম। ইমাম (আ.) এ’তেকাফ (ইবাদতের জন্য দীর্ঘ সময়ব্যাপী মসজিদে অবস্থান করা) অবস্থায় কাবা ঘরের তাওয়াফ করাতে মশগুল ছিলেন। একজন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি তাঁর নিকটে এলো এবং বলল: “ইয়াবনা রাসুলিল্লাহ ! ওমুক লোকের কাছে কিছুটা কর্য করেছি এবং তার কর্য শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই, সম্ভব হলে আমাকে সাহায্য করুন”। ইমাম (আ.) বললেন:“(কাবার দিকে ইশারা করে) এই ঘরের মালিকের কসম বর্তমানে আমার কাছে কোন টাকা পয়সা নেই তাই দুঃখিত”। অভাবগ্রস্ত লোকটি বলল: “ইয়াবনা রাসুলিল্লাহ !! তাহলে তার কাছ থেকে কিছু সময় আমাকে নিয়ে দিন; কারণ আমাকে ভয় দেখাচ্ছে যে, যদি তার কর্য শোধ না করবো আমাকে বন্দী করবে”। ইমাম (আ.) নিজের তাওয়াফকে মাঝ খানে ছেড়ে দিয়ে সেই লোকটির সাথে হাটা ধরলেন যাতে পাওনাদারের কাছে গিয়ে কিছু সময় নেওয়া যাক। ইবনে আব্বাস বলল আমি বললাম: “ইয়াবনা রাসুলিল্লাহ ! আপনি হয়তো ভুলে গেছেন যে, মসজিদে এ’তেকাফের নিয়ত করেছেন”। ইমাম (আ.) বললেন: “না আমি ভুলে যাইনি; কিন্তু আমার বাবার কাছে শুনেছি নবী করিম (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি তার মুমিন ভাইয়ের চাহিদা পূরণ করবে, আল্লাহর কাছে তার অবস্থা এমন যেন, নয় হাজার বছর দিনে রোযা রেখেছে আর রাতকে ইবাদত করে শেষ করেছে”। (১৫)
 
বিনয়
ইমাম হাসান (আ.) তাঁর নানা রাসুলে খোদা (সা.) এর মত কোন রকম অহংকার ছাড়াই মাটিতে বসে যেতেন এবং দরিদ্রদের সাথে এক দস্তরখানে বসে খাওয়া দাওয়া করতেন। একদিন ইমাম (আ.) ঘোড়াতে আরোহণ করে এক মহল্লা থেকে যাচ্ছিলেন তখন দেখেন যে, একদল সর্বহারা নিঃস্ব ব্যক্তি মাটিতে বসে আছে এবং কিছু রুটি সামনে রেখে খাচ্ছে। যখন ইমাম হাসানকে (আ.) দেখতে পেল তাঁকে একসাথে খাওয়ার জন্য নিজেদের দস্তরখানে আহবান করলো। ইমাম (আ.) নিজের ঘোড়া থেকে নামলেন এবং কোরানের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন: “ اِنّه لایُحبُ المُستَکبرین ” আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অহঙ্কারীকে ভালবাসেন না। (সুরা আন্‌ নাহল, আয়াত: ২৩)। অতঃপর তাদের সাথে দস্তরখানে গিয়ে বসলেন এবং খাওয়া শুরু করলেন। সবার যখন ভরপেট খাওয়া হয়ে গেল, ইমাম (আ.) তাদেরকে নিজের ঘরে তলব করলেন এবং তাদেরকে আপ্যায়ন করলেন এবং তাদেরকে উপহার স্বরূপ পোশাক দিলেন। (১৬)

সর্বদা নিজে থেকে অন্যকে বেশী অগ্রাধিকার দিতেন এবং সব সময় জনগণের সাথে সম্মান ও বিনয়ের সাথে ব্যবহার করতেন। তিনি একদিন এক জায়গায় বসে ছিলেন। যখন যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ ফকির লোক প্রবেশ করলো। ইমাম (আ.) তাকে স্বাগত জানালেন এবং বিনয় ও সম্মান জানানোর জন্য তাকে বললেন: “হে লোক ! এমন সময় তুমি আসলে যখন আমি চলে যেতে চাচ্ছিলাম। আমাকে যাওয়ার অনুমতি দেবে কি ?” দরিদ্র লোকটি বলল: “অবশ্যই ইয়াবনা রাসুলিল্লাহ !!” (১৭)
 
বীরত্ব ও সাহসিকতা
বীরত্ব, হযরত আলী (আ.) এর থেকে যাওয়া সম্পদ আর ইমাম হাসান (আ.) সেই মহান ব্যক্তির উত্তরাধিকারী। ইতিহাসের বইগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আলী (আ.) তাঁর সন্তানদেরকে এই মনোবলকে শক্তিশালী করার জন্য সরাসরি নিজেই হস্তক্ষেপ করতেন। ছোটকাল থেকেই তাদেরকে তলোয়ার চালানো ও সামরিক দক্ষতা অর্জনের শিক্ষা দিতেন। আর তাদেরকে হক্ব ও সত্যের সহায়তার শিক্ষা দিতেন। রণক্ষেত্রগুলো হযরত আলীর (আ.) সন্তানদের জন্য বীরত্ব ও সাহসিকতা শিক্ষার পাঠশালা ছিল। আলী (আ.) এর খেলাফত কাল শুরু হওয়ার সাথে সাথে বিরোধিতাও শুরু হল। প্রথম বিশৃঙ্খলা বা ফিতনা জামালের যুদ্ধ ছিল যা খলিফা ওসমানের রক্তের প্রতিশোধের উসিলা নিয়ে শুরু হল। যুদ্ধের শিখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। হযরত আলী (আ.) তাঁর ছেলে “মোহাম্মদ হানাফিয়্যাহ” কে ডেকে পাঠালেন এবং নিজের বর্শা দিলেন আর বললেন: “যাও আয়েশার উটকে নহর (জবাই) করে দাও”। মোহাম্মদ হানাফিয়্যাহ বর্শা নিয়ে আক্রমণ করলেন, কিন্তু যারা আয়েশার উটের চারিপাশ্বে কঠিন প্রাচীর তৈরী করেছিল তার আক্রমণকে ঠেকিয়ে দিল। তিনি পরপর কয়েকবার আক্রমণ করলেন কিন্তু উটের কাছে যেতে পারেননি। বাধ্য হয়ে পিতার কাছে ফিরে এলেন এবং নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। ইমাম আলী (আ.) বর্শাটি ফিরিয়ে নিলেন এবং ইমাম হাসানকে (আ.) দিলেন। তিনি বর্শা নিয়ে উটের দিকে আক্রমণ করলেন এবং তার কিছুক্ষন পর এমন অবস্থায় ফিরে এলেন যে, বর্শার ফলা থেকে রক্ত ঝরে পড়ছিল। মোহাম্মদ হানাফিয়্যাহ নহর (জবাই) করা উটের দিকে ও রক্তাক্ত বর্শার দিকে তাকালেন এবং লজ্জা পেলেন। আমিরুল মুমেনিন আলী (আ.) তাকে বললেন: “লজ্জিত হয়োনা; কেননা সে নবী করিমের (সা.) সন্তান আর তুমি হলে আলীর (আ.) সন্তান। (১৮)
ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) সেই সময়কার অনেক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন এবং নিজের সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। মুযাবিয়া তার সাহসিকতা সম্পর্ক বলেছিল: “সে এমন এক ব্যক্তির সন্তান যে, সে যেখানেই যেত মৃত্যুও তার অনুসরণ করতো (অর্থাৎ সাহসী ছিলেন আর মৃত্যুকে কখনই ভয় করতেন না)”। (১৯)

সূত্রসমূহ:
১। আল মানাকিব, ৪’ র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৮।
২। হায়াতু ইমাম আল হাসান ইবনে আলী, ১’ ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৪।
৩। বিহারুল আনওয়ার, ৪৩’ তম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩৫২।
৪। তুহফাতুল ওয়ায়েযিন, ২’ য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ১০৬।
৫। আল মানাকিব, ৪’ র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৯।
৬। উসুদুল গাবাহ, ২’ য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৫।
৭। আল মানাকিব, ৪’ র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৬।
৮।৪’ র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৬; কাশফুল গুম্মাহ, ২’ য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৩।
৯। বিহারুল আনওয়ার, ৪৩’ তম খন্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৩।
১০। বিহারুল আনওয়ার, ৭৫’ তম খন্ড, পৃষ্ঠা: ২৮৭।
১১। নাসেখুত তাওয়ারিখ, ২’ য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ২৯৩।
১২। আয়েম্মাতু ইসনা আশার, ১’ ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৫০৬।
১৩। আল মানাকিব, ৪’ র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৭।
১৪। আল মাহাসিন ওয়াল মাসাউয়ি, পৃষ্ঠা: ৫৫।
১৫। সাফিনাতুল বিহার, বাবুল হা।
১৬। বিহারুল আনওয়ার, ৪৩’ তম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩৫২।
১৭। মুলহাক্কাতু আহকাকুল হক্ব, ১১’ তম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১১৪।
১৮। আল মানাকিব, ৪’ র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ২১।
১৯। শরহু নাহজুল বালাগা, ইবনে আবিল হাদীদ, ৪’ র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩।