ইসলামি ইতিহাসে গাদীর

নিঃসন্দেহে ১০ম হিজরীর ১৮ই জিলহজ্বে সংঘটিত গাদীরে খুমের ঘটনার পর হতে কবি সাহিত্যিকরা এ বিষয় ও ঐ দিনের ঘটনার উপর অসংখ্য সাহিত্য ও কবিতা রচনা করেছেন। সার্বিকভাবে মানবেতিহাসে বিশেষ করে ইসলামি ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা নজির নেহায়েত কম, যার প্রতি মানুষ এতটা গুরুত্

ইসলামি ইতিহাসে গাদীর
মহান আল্লাহ’র ইচ্ছা এটাই ছিল যে, গাদীরের ঐতিহাসিক ঘটনা সকল যুগে জীবিত থাকবে। আর মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারী প্রত্যিটি ব্যক্তির দৃষ্টিকে এ ঘটনার প্রতি আকৃষ্ট করবে। মুসলিম লেখকরা প্রতিটি যুগে এ সম্পর্কে লিখবে এবং তাদের আকিদা, হাদীস, তাফসীর ও ইতিহাস ভিত্তিক রচনাসমূহে এ ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করবে।
নিঃসন্দেহে ১০ম হিজরীর ১৮ই জিলহজ্বে সংঘটিত গাদীরে খুমের ঘটনার পর হতে কবি সাহিত্যিকরা এ বিষয় ও ঐ দিনের ঘটনার উপর অসংখ্য সাহিত্য ও কবিতা রচনা করেছেন। সার্বিকভাবে মানবেতিহাসে বিশেষ করে ইসলামি ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা নজির নেহায়েত কম, যার প্রতি মানুষ এতটা গুরুত্ব দিয়েছে। আর মানব ইতিহাসে এ ঘটনার মত দৃষ্টান্ত খুবই কম যার প্রতি অধিকাংশ মুহাদ্দিস, মুফাসসির, কালাম শাস্ত্রবিদ, দার্শনিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাদের রচনাসমূহে স্থান দিয়েছেন।
গাদীরের বৃহৎ ঘটনা যুগের পর যুগ ধরে মুসলমানদের মাঝে স্থান করে থাকার অন্যতম মৌলিক কারণ হচ্ছে এ দিবসে পবিত্র কোরআনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের অবতীর্ণ হওয়া।

উক্ত আয়াতদ্বয় হচ্ছে :
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللّهَ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ﴿۶۷﴾

অনুবাদ: “হে রাসূল! পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না”। (সূরা মায়েদা: ৬৭)

ِ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِینا

অনুবাদ: “আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে মনোনিত করলাম”। (প্রাগুক্ত: ৩)
মুসলমানরা বিশেষ করে শিয়ারা (মহানবী (স.) ও তাঁর আহলে বাইত (আ.) এর অনুসারীরা) পূর্বের শতাব্দিগুলোতেও এ দিনকে মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ঈদের দিন হিসেবে পালন করতো। যা তাদের মাঝে ঈদে গাদীরে খুম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
ইবনে খাল্লাকান লিখেছেন: ‘৪৭৮ হিজরীর ১৮ই জিলহজ্ব; ঈদে গাদীরের দিনে মুস্তালা’ বিন মুস্তানসিরের হাতে বাইয়াত করা হয়’। (ওয়াফিয়াতুল আইয়ান, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬০)
আবু রেইহানে বিরুনী স্বীয় গ্রন্থ আল আসারুল বাকিয়াহ’তে এ দিনটিকে ঐ সকল দিনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যে দিনগুলোকে মুসলমানরা ঈদ হিসেবে পালন করে থাকে। (আল আসারুল বাকিয়াত, পৃ. ৩৯৫; আল গাদীর ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬৭)
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ১৮ই জিলহজ্ব রোজা রাখবে, মহান আল্লাহ্ তার জন্য ৬ মাস রোজার সওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন। আর এ দিনটি হচ্ছে ঈদে গাদিরে খুমের দিন। যে দিন মহানবী (স.) হযরত আলী (আ.) এর হাত উঁচু করে ধরে বলেছিলেন: ‘আমি যার মাওলা (অভিভাবক) আলীও তার মাওলা। হে প্রভু! আলী যাদেরকে ভালবাসে তাদেরকে তুমি ভালবাসো আর যারা আলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ কর। আর যে তাকে সহযোগিতা করে, তাকে তুমি সহযোগিতা কর। অতঃপর উমার ইবনে খাত্তাব বললেন: অভিনন্দন তোমাকে, অভিনন্দন তোমাকে হে আবু তালিবের সন্তান, তুমি (আজকের পর হতে) আমার এবং সকল মুসলমানের অভিভাবক হয়ে গেলে’। (তারিখে দামেশক, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৫ ও ৫৭৫-৫৭৭; তারিখে বাগদাদ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২৯০)
সা’লাবীও গাদীরের রজনীকে মুসলমানদের মাঝে প্রসিদ্ধ একটি রজনী হিসেবে অভিহিত করেছেন (সামারাতুল কুলুব, পৃ. ৫১১)। এ ইসলামি ঈদের মূল ঘটনাটি গাদীরের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। কেননা মহানবী (স.) এ দিন সকল মুহাজির ও আনসার এবং তাঁর স্ত্রীগণ ও আহলে বাইতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তারা আলীকে মোবারকবাদ ও অভিনন্দন জানায়।

যাইদ বিন আরকাম বলেন: (মহানবী (স.) কর্তৃক উক্ত নির্দেশ দানের পর) যে সকল ব্যক্তিগণ প্রথমে হযরত আলী (আ.) এর সাথে কর্মদন এবং তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান তারা হলেন: আবু বকর, উমর ইবনে খাত্তাব, তালহা ও যুবাইর ইবনে আওয়াম। অতঃপর অন্যান্য মুহাজির ও আনসাররা তার সাথে কর্মদন করেন ও তাকে অভিনন্দন জানান। (আল গাদীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭০, এ ঘটনাটি আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ তাবারী ওরফে খালিলী হতে ‘মানাকেবে আলী ইবনে আবি তালিব’ গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে।)
এ ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এ ঘটনাটি মহানবী (স.) এর ১ শত ১০ জন বিশিষ্ট সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে (আল গাদীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬১ ও ৩১৪)। বলা যেতে পারে যে, হাদীস ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহে এ ১১০ জন রাবী (বর্ণনাকারী) এর নাম উল্লেখিত হয়েছে।

এ রেওয়াতটিকে দ্বিতীয় হিজরীতে ৮৯ জন তাবেঈন কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসটির মোতাওয়াতির হওয়ার ক্ষেত্রে শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ের আলেমগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ইসলামি ইতিহাসের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবু জাফার তাবারী এ বিষয়ে ‘আল বেলায়াহ ফি তুরুকি হাদীসিল গাদীর’ শীর্ষক শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে তিনি হাদীসে গাদীরকে ৭০টির বেশী রাবীর মাধ্যমে মহানবী (স.) হতে বর্ণনা করেছেন।
ইবনে উকদাহ ‘আল বেলায়াহ’ সন্দর্ভতে (পত্রিকা বিশেষ) উক্ত হাদীসটিকে ১৫০ জন রাবী মারফত বর্ণনা করেছেন। অধিক অবগতির জন্য ইবনে শাহরে আশুব রচিত ‘মানাকেবে আলে আবি তালিব’ গ্রন্থের ২য় খণ্ড, পৃ. ২২৮ অধ্যায়ন করা যেতে পারে।  সূত্রঃ ইন্টারনেট