মহানবি (সা.) এর ইন্তিকালের পূর্বের দিনগুলো

মহানবি (সা.) এর ইন্তিকালের পূর্বের দিনগুলো

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

www.tvshia.com 

      মহানবি (সা.) এর ইন্তিকালের পূর্বে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারি। ঘটনাগুলো হচ্ছে এই ধরণের যে, নবি করিম (সা.) কিছু সংখ্যক সাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে জান্নাতুল বাকিতে কবর জিয়ারত করতে যান। সেখানে সাহাবাদের সামনে বক্তব্য দেন। তিনি বলেনঃ ইসলামে ফেতনা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। আমি অতি তাড়াতাড়ি এই দুনিয়া হতে বিদায় নিব। তিনি আমিরুল মুমিনিন আলি (আ.) কে তাঁর ওয়াসি হিসেবে নিযুক্ত করেন। কিছু সংখ্যক সাহাবা এমন কাজ করেন যাতে নবি করিম (সা.) অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

      আমিরুল মুমিনিন আলি (আ.) বলেন যেঃ নবি করিম (সা.) ইন্তিকালের পূর্বে আমার সাথে বিশেষ কিছু বিষয়ে আলোচনা করেন। ঐ আলোচনায় আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দেন যা হাজার জ্ঞানের দরজার সমতুল্য এবং প্রত্যেকটি জ্ঞানের দরজা হতে হাজার দরজা খুলে যাবে।

      মহানবি (সা.) আমিরুল মুমিনিন আলি (আ.) এর কোলে মাথা রেখে ইহজগত ত্যাগ করেন। যেহেতু তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ওয়াসি ছিলেন সেহেতু ইন্তিকালের পর তাঁকে গোসল দান করা ও দাফন কাফন করা তাঁর দায়িত্ব ছিল। সুতরাং রাসুলের ইন্তিকালের পর তিনি এই কাজ আঞ্জাম দেন।

      তাবাকাতে ইবনে সাদে এইভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অসুস্থতা বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বে একটি দলকে সাথে নিয়ে কবর জিয়ারত করতে যান। শিয়া এবং সুন্নিদের মাঝে এখতেলাফ হচ্ছে এই বিষয়ে যে ঐ দলে আলি (আ.) ছিল না আবু রাফে ছিল। তবে হ্যাঁ এখানে যে বিষয়টি প্রমাণিত হয় তা এই যে নবি করিম (সা.) একটি দলকে সাথে করে জান্নাতুল বাকিতে কবর জিয়রত করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেনঃ আমার নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশ এসেছে যে, আমি যেন জান্নাতুল বাকির অধিবাসীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি। অতপর কবরস্থানের মধ্যবর্তী স্থানে দাড়িয়ে বলেনঃ আস সালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর। কবর বাসীর জন্য দোয়া করেন এবং বলেনঃ হে কবরের অধিবাসীরা, তোমাদের সৌভাগ্য যে এই ফেতনা তোমাদেরকে দেখতে হবে না। (তাবাকাতে ইবনে সাদ, খঃ ২, পৃঃ ২০৪।)

          প্রকৃত পক্ষে এই ফেতনার কানণেই মুয়াবিয়ার সন্তান ইয়াজিদের মত কুখ্যাত ব্যক্তি ক্ষমতায় আসে। হুসাইন (আ.) ও তাঁর সাথীদেরকে কারবালায় শহিদ করা হয়। হুসাইনের দেহের উপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে দেওয়া হয়। সকলের মাথা দেহ হতে আলাদা করে বল্লমের মাথায় ঝুলিয়ে নিয়ে যওয়া হয়। ইয়াজিদের মদ্যপানের অনুষ্ঠানে হুসাইন (আ.) এর মাথা উপস্থিত করা হয়। সেখানে তাঁর মুখে ছড়ি দ্বারা আঘাত করা হয়। এই ফেতনার কানণেই হজরত জয়নবের চাদর কেড়ে নেওয়া হয় এবং বেপর্দা করে শামের বাজারে ঘোরানো হয়। মহিলাদের তাবুতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়...।

      মহানবি (সা.) আমিরুল মুমিনিন আলি (আ.) কে বলেনঃ আমাকে দীর্ঘ হায়াত ও দুনিয়ার সম্পদ এবং আল্লাহর সাথে মুলাকাত ও বেহেশতের মাঝে এখতিয়ার দান করা হয়েছে। আমি আল্লাহর মুলাকাতকে প্রাধান্য দান করেছি।

      নবি করিম (সা.) জান্নাতুল বাকিতে যে বক্তব্য দেন তাতে উল্লেখ করেনঃ

أَقْبَلَتِ الْفِتَنُ كَقِطَعِ‏ اللَّيْلِ‏ الْمُظْلِمِ يَتْبَعُ أَوَّلَهَا آخِرُهَا

রাতের অন্ধকারের ন্যায় ফেতনা ঘনিয়ে আসছে। একে অপরের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে ইসলামকে ফেতনার স্বীকার করবে। (আল এরশাদ ফি মারেফাতে হুজাজিল্লাহে আলাল এবাদ, খঃ ১, পৃঃ ১৮১।)

      বানি ইসরাইলে ফেতনা সৃষ্টি হয়েছিল। হারুনকে অমান্য করা হয়েছিল। তাওরাতের নির্দেশকে উপেক্ষা করা হয়েছিল। পক্ষান্তরে সামেরীকে অনুস্বরণ করা হয়েছিল। গোবৎসকে খোদা হিসেবে এবাদত করে ছিল। হজরত ইসা (আ.) এর উম্মতে কি ঘটনা ঘটেছিল? তাঁর ওয়াসিকে অমান্য করা হয়েছিল। পুলেসকে তাঁর ওয়াসির স্থানে বসানো হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামেও কি এমন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? যার কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলছেনঃ

أَقْبَلَتِ الْفِتَنُ كَقِطَعِ‏ اللَّيْلِ‏ الْمُظْلِمِ يَتْبَعُ أَوَّلَهَا آخِرُهَا

      অতপর রাসুলুল্লাহ (সা.) আলি (আ.) কে বলেনঃ

إِنَّ جَبْرَئِيلَ كَانَ يَعْرِضُ عَلَيَّ الْقُرْآنَ كُلَّ سَنَةٍ مَرَّةً وَ قَدْ عَرَضَه‏ عَلَيَّ الْعَامَ مَرَّتَيْنِ وَ لَا أَرَاهُ إِلَّا لِحُضُورِ أَجَلِي

প্রত্যেক বছর জিবরাইল একবার আমার নিকট পূর্ণ কোরআন উপস্থাপন করে; কিন্তু এই বছর দুইবার উপস্থাপন করেছে। এর কারণ আমার ইন্তিকাল নিকটবর্তী হওয়া ব্যতিত আর আর কিছুই হতে পারে না। (আল এরশাদ ফি মারেফাতে হুজাজিল্লাহে আলাল এবাদ, খঃ ১, পৃঃ ১৮১।)

      উল্লেখ্য যে মহানবি (সা.) কি স্বাভাবিকভাবে ইন্তিকাল করেছেন না শাহাদত বরণ করেছেন; এই বিষয়টিও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর অসুস্থতার কারণ কি ছিল? অবশ্য কোরআন শরিফ এই দুইটি বিষয়ের প্রতিই ইশারা করেছে।

أَ فَإِنْ ماتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلى‏ أَعْقابِكُمْ

অর্থাৎ নবি যদি ইন্তিকাল করেন অথবা শাহাদত বরণ করেন তাহলে কি তোমরা পিছনে ফিরে যাবে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৪৪।)

      মহানবি (সা.) অত্যন্ত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর ইহজগত ত্যাগ করার সময় হয়েছে। ইসলাম রুমের সেনাবাহিনী দ্বারা হুমকির সম্মুখিন হয়েছে। সুতরাং তিনি তার মোকাবিলা করার জন্য সেনা প্রধান নিযুক্ত করেছেন এবং সাহাবাদেরকে সেই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার দির্দেশ দেন; অথচ তাঁর পরবর্তী ওয়াসি নির্ধানণ করেননি! যিনি তাঁর পর রাহবারী করবেন। গাদিরে খোমে নবি করিম (সা.) তাঁর পরবর্তী ওয়াসিকে পুরোপুরিভাবে পরিচিত করিয়েছেন।

      মহানবি (সা.) জীবনের শেষ দিকে মসজিদুননবিতে নামাজের পর বক্তব্যে বলেনঃ হে লোকসকল আমার প্রতি যদি কাউরো দাবি থাকে তাহলে সে যেন তা গ্রহণ করে। তিনি বলেনঃ আমি তোমাদের নিকট পূর্ণভাবে ইসলাম উপস্থাপন করেছি। আমি সববিছু তোমাদের নিকট বর্ণনা করেছি। আল্লাহ তায়ালা যাকিছু তোমাদের জন্য হালাল করেছন তা আমি তোদের জন্য হালাল করেছি; আর তিনি তোদের জন্য যা হারাম করেছেন তা আমি তোদের জন্য হারাম করেছি।

      নবি করিম (সা.) ২৩ বছর যাবত ইসলাম প্রচারের জন্য যে কষ্ট করেছন কোন নবি এত কষ্ট করেননি। এমন কি হজরত নুহ (আ.) যে ৯৫০ বছরেরও বেশি তাবলিগ করেছেন, তবুও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ২৩ বছরের কষ্ট তাঁর চেয়েও বেশী।

      ইবনে আবিল হাদিদ বর্ণনা করেনঃ নবি করিম (সা.) হজরত আয়েশার বাড়িতে ছিলেন। হজরত বেলালের আজানের শব্দ আসে। নবি করিম (সা.) বলেন যেঃ আমি অত্যন্ত দুর্বল। মসজিদে যেতে পারব না। একজনকে নামাজ পড়াতে বল। তাঁর নিকট খবর আসে যে, হজরত আবু বকর ও উমর মসজিদে আছেন। হজরত আবু বকর নামাজের ইমামতি করছেন। এই খবর শুনে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন; কেননা তাদের এ সময়ে মসজিদে থাকার কথা ছিল না। মহানবি (সা.) তাদেরকে হজরত উসামার নেতৃত্বে গঠিত বাহিনীতে গিয়ে যোগ দানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সময় মমজিদে থাকার অর্থ হচ্ছে তাঁর নির্দেশকে অমান্য করা। যারা উসামার বাহিনীকে অমান্য করেছে তাদের সম্পর্কে তিনি বলেনঃ

لَعَنَ اللَّهُ مَنْ تَخَلَّفَ عَنْ جَيْشِ أُسَامَة

যারা উসামার বাহিনীকে অমান্য করেছে তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। (শারহে নাজুল বালাগাহ, খঃ ৯, পৃঃ ১৯৭; খঃ ১৩, পৃঃ ৩৩।)

      মহানবি (সা.) আমিরুল মুমিনিন আলি (আ.) ও ফাজল ইবনে আব্বাসকে বলেনঃ আমাকে মসজিতে নিয়ে যাও। তারা তাঁকে মসজিদে নিয়ে যান। হজরত আবু বকরকে মেহরাব হতে সরিয়ে দিয়ে, তিনি নিজেই নামাজের ইমামতি করেন। তিনি অত্যন্ত দুর্বল থাকার কারণে বসে থেকে নামাজ পড়ান।

      রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের পর বক্তব্য দান করেন। তিনি সাহাবাগণকে তাঁর ইন্তিকালের পর ফেতনা সৃষ্টি হওয়া সম্পর্কে সাবধান করে দেন। তিনি সেখানে হাদিসে সাকালাইন পুনরায় নর্ণনা করেন।

إنّي تارك فيكم الثقلين‏ كتاب اللّه و عترتي لن تضلّوا ما إن تمسّكتم بهما

অর্থাৎ আমি তোদের মাঝে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে যাচ্ছি, একটি হচ্ছে আল্লার কিতাব (আল কোরআন) অপরটি হচ্ছে আমার ইতরাত (আহলুল বাইত)। এই দুইটিকে যদি দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধর তাহলে কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। (আল মুরশেদ ফি ইমামাতি আলি ইবনে আবি তালেব আলাইহিস সালাম, পৃঃ ১১৬।)

      অতপর তিনি আবু বকর, উমর ও উসমানসহ বার জন সাহাবাকে একত্রিত করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ আমি কি তোমাদেরকে উসামার দলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিইনি? কেন তোমরা যাওনি? কেন তোমরা মদিনায় রয়েছ? সকলেই বিভিন্ন ওযর দেখায়। হজরত আবু বকর বলেনঃ আমি পুনরায় আপনার হাতে বাইআত করতে চায়। হজরত উমর বলেনঃ আমি আপনার খবর কাফেলার নিকট হতে জানতে চাওয়াকে পছন্দ করিনি। (বুখারী, খঃ ১, পৃঃ ২২, কিতাবুল ইলম, ও খঃ ২, পৃঃ ১৪। মুসলিম, খঃ ২, পৃঃ ১৪।)

      বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, রাসুল (সা.) তিনবার বলেনঃ نفذوا جیش اسامه অর্থাৎ উসামার বাহিনীকে সুসজ্জিত কর। (আল মিলাল ওয়ান নেহাল, শাহরেস্থানী, খঃ ১, পৃঃ ২৩। তারিখে তাবারী, খঃ ৩, পৃঃ ৪২৯। মাগাজী, খঃ ২, পৃঃ ১১৭।)

      রাসুল (সা.) মসজিদ হতে বাড়িতে ফিরে আসেন। তাঁর অসুস্থতা আরো বেড়ে যায়। হজরত ফাতেমা জাহরা (আঃ) তাঁর পিতার পার্শ্বে বসে আছেন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পিতা ইহজগত ত্যাগ করছেন। তাঁর আদরের কন্যা পাশে বসে অঝর নয়নে কাঁদছেন। রাসুল (সা.) ফাতেমা (আ.) কে বলেনঃ ফাতেমা আমার নিকটে এসো। ফাতেমা তাঁর নিকট যান। তিনি তাঁকে বলেনঃ ফাতেমা কেঁদ না। আমার ইন্তিকালের পর আমার পরিবারের মধ্য হতে তুমি সর্বপ্রথম আমার নিকট আসবে। হজরত ফাতেমা (আ.) এই খবর শুনে খুশি হন এবং চেহারা হাস্যউজ্জল হয়।

      তাবাকাতে ইবনে সাদে বর্ণিত হয়েছে যে, রসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলি (আ.) এর কোলে মাথা রেখে ইন্তিকাল করেছেন। জেহনী দেলান বুখারীর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে, রসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশার কোলে মাথা রেখে ইন্তিকাল করেছেন। (তাবাকাতে ইবনে সাদ, খঃ ২, পৃঃ ২০৪।)

      হজরত ইবনে আব্বাস বলেনঃ সুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলি (আ.) এর কোলে মাথা রেখে ইন্তিকাল করেছেন। আলি (আ.) তাঁর ভাই। তিনি নবি করিম (সা.) কে গোসল দান করেছে। (আল ওয়াফাউল ওয়াফা, খঃ ১, পৃঃ ৩৩। আল খাসায়েস, খঃ ২, পৃঃ ২২৮। শারহে)

      ফাজল ইবনে অব্বাস রাসুল (সা.) কে প্রশ্ন করেনঃ ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি কি আপনাকে গোসল দানে অংশ গ্রহণ করতে পারি? উত্তরে তিনি বলেনঃ তুমি শুধু পানি নিয়ে এসো। নবিকে তাঁর ওয়াসি গোসল দিবে এবং দাফন করবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, খঃ ১, পৃঃ ১৩৮। কানজুল উম্মাল, খঃ ৬, পৃঃ ৪০০।)

      হজরত আলি (আ.) বলেনঃ রাসুল (সা.) আমার বুকের ওপর মাথা রেখে ইহজগত ত্যাগ করেছেন। আমি তাঁকে গোসল দিয়েছি একং দাফন করেছি। গোসল দানের সময় ফেরেশতারা আমাকে সহযোগিতা করেছে। তাঁর ওয়াসি হওয়ার জন্য আমার চেয়ে বেশী হকদার কে হতে পারে?!

      শিয়াদের গ্রন্থে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী রাসুল (সা.) ২৮ শে সফর ইন্তিকাল করেছেন।