কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে ইমাম মেহদি (আ.)

কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে ইমাম মেহদি (আ.)

 www.9ktenews.com

          ইমাম মেহদি (আ.) এর উপস্থিতি সম্পর্কিত আলোচনা আতীত কাল হতেই গুরুত্ব পেয়েছে এবং মনীষীগণ এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন ও তাদের লিখনি আমার আমাদের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে। শুধুমাত্র মুসলমানেরাই ইমাম মেহদি (আ.) এর আগমনের অপেক্ষায় নেয়; বরং অন্যান্য ধর্মের লোকরাও তাঁর আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিনন্তু উল্লেখ্য যে, তারা তাঁকে অন্য নামে নামকরন করে থাকে; যেমনঃ উদ্ধারক, মাউদ, শেষ জামানার মুক্তিদাতা ইত্যাদি। মুনজি বা উদ্ধারক সম্পর্কিত আলোচনা পবিত্র কোরআন ও হাদিসসহ অন্যান্য আসমানী কিতাবসমূহেও স্থান পেয়েছে। আমারা এখানে কোরআন ও হাদিসে দৃষ্টিতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং প্রমাণ করব যে ইমাম মেহদি (আ.) এর উপস্থিতি বর্তমান কালে অতিব জরুরী এবং তিনি আমাদের মাঝে অবশ্যই বিদ্যমান রয়েছেন।

 

সুরা কদর

          সুরা কদর হতে বুঝা যায় যে, ফেরেশতারা প্রত্যেক বছর শবে কদরে দির্ধারিত দায়িত্ব নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন।

بسْمِ اللَّهِ الرَّحْمنِ الرَّحيمِ

إِنَّا أَنْزَلْناهُ في‏ لَيْلَةِ الْقَدْرِ * وَ ما أَدْراكَ ما لَيْلَةُ الْقَدْرِ * لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ * تَنَزَّلُ الْمَلائِكَةُ وَ الرُّوحُ فيها بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ * سَلامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ*

সুরা দোখানেও এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছেঃ

حم * وَ الْكِتابِ الْمُبينِ * إِنَّا أَنْزَلْناهُ في‏ لَيْلَةٍ مُبارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرينَ * فيها يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكيمٍ*

হা-মীম; (২) সুস্পষ্ট গ্রন্থের শপথ, (৩) নিশ্চয়ই আমরা একে (কুরআন) প্রাচুর্যময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমরা সতর্ককারী।

          রমজান মাস কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, বিধায় শবে কদরও কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সুতারং প্রত্যেক শবে কদরে ফেরেশতা ও রুহ এর অবতরণ পুনরাবৃত্তি হয়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, রাসুলে আকরাম (সা.) এর জীবনদশায় প্রত্যেক শবে কদরে ফেরেশতা ও রুহ জমিনে অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুলে আকরাম (সা.) এর নিকট প্রবেশ করতেন; কিন্তু তাঁর পর প্রত্যেক শবে কদরে ফেরেশতা ও রুহ

 

জমিনে অবতীর্ণ হওয়ার পর কার নিকট প্রবেশ করেন? আমারা গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝতে পারি যে, মহানবি হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এর পর মাসুম ইমাম বিদ্যমান থাকার প্রয়োজন রয়েছে; যার নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হবেন।

          ইমাম বাকের (আ.) বলেনঃ

یا معشر الشیعة! خاصموا بسورة إِنَّا أَنْزَلْناهُ تفلجو، فوالله انها لحجَة الله تبارک و تعالی علی الخلق بعد رسول الله (ص) و انها لسیدة دینکم و انها لغایة علمنا. یا معشر الشیعة! خاصموا بـ্حم * وَ الْكِتابِ الْمُبينِ. فانها لو لاة الامرخاصة بعد رسول الله...

হে শিয়া সমাজ! তোমরা সুরা ইন্না আনজালনা সম্পর্কে গবেষণা করলে সফলকাম হবে। আল্লাহর কসম! এই সুরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পরবর্তী হুজ্জাতের বিষয়টিকে প্রমাণ করে। এই সুরা তোমাদের দ্বিনের দলিল ও আমাদের জ্ঞানের সর্বশেষ সিমানা। হে শিয়া সমাজ!

حم * وَ الْكِتابِ الْمُبينِ. এই আয়াতসমূহ সম্পর্কে গবেষণা কর। কেননা এই আয়াতসমূহ রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পরবর্তী আমিরগণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত...। তিনি আরো বলেনঃ

و ایم الله! ان من صدق بلیلة القدر، لیعلم انها لنا خاصّة...

আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি শবে কদরকে প্রকৃতভাবে অনুধাবন করবে, সে জ্ঞান অর্জন করবে যে এই রাত আমাদের জন্য নির্ধারিত।

          আমিরুল মোমিনিন ইমাম আলি (আ.) হজরত ইবনে আব্বাসকে বলেনঃ

 

 

ان لیلة القدر فی کل سنة، و انه ینزل فی تلک اللیلة أمر السنة و أن ذالک الأمر ولاة بعد رسول الله صلی الله علیه و آله. فقلت: من هم؟ فقال: أنا و أحد عشر من صلبی أئمة محدثون

নিশ্চয় প্রত্যেক বছর শবে কদর রয়েছে, ঐ রাতে এক বছরের নির্দেশ অবতীর্ণ হয়ে থাকে। এর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পর ওলিগণ রয়েছেন। হজরত ইবনে আব্বাস বলেন, আমি তাঁকে প্রশ্ন করলামঃ ঐ ওলিগণ কে? হজরত বললেনঃ আমি ও আমার ঔরশ হতে এগার জন; যারা সকলেই ইমাম ও মোহাদ্দেস।

          রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবাগণকে বলেনঃ

্রآمِنُوا بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ، أَنَّهَا تَكُونُ لِعَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، وَ لِوُلْدِهِ الْأَحَدَ عَشَرَ مِنْ بَعْدِي‏গ্ধ

শবে কদরে বিশ্বাস কর; কেননা তা আলি ইবনে আবি তালেব ও তাঁর পরবর্তী এগার জন ইমামের জন্য।

 

ইমাম সম্পর্কিত আয়াত

          আল্লাহ তায়ালা সুরা বনিইসরাইলে বলছেনঃ

يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ فَمَنْ أُوتِيَ كِتابَهُ بِيَمينِهِ فَأُولئِكَ يَقْرَؤُنَ كِتابَهُمْ وَ لا يُظْلَمُونَ فَتيلاً

(স্মরণ কর,) যেদিন আমরা প্রত্যেক জনগোষ্ঠীকে তাদের ইমাম সহ আহ্বান করব; এবং যাদের আমলনামা তাদের ডান হাতে প্রদান করা হবে, তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি ন্যূনতম পরিমাণও অবিচার করা হবে না।

 

 

          এই আয়াত হতে বুঝা যায় যে কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমাম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। যদি তারা ইমামতে বিশ্বাসী হয়, তাহলে তারা মুক্তি প্রাপ্ত হবে এবং আমল নামা তাদের ডান হাতে দেওয়া হবে। সুতরাং প্রত্যেক জামানায় এমন ইমাম থাকতে হবে, যার আনুগত্য করা আবশ্যকীয় হবে। তিনি এমন ইমাম হবেন যার পরিচিতি ও আনুগত্য ব্যাতিত কিয়ামতের দিন সফলকাম ও পরিত্রাণ প্রাপ্ত হওয়া যাবে না। আর এই বিষয়টি হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে।

مَنْ مَاتَ لَا يَعْرِفُ إِمَامَهُ مَاتَ‏ مِيتَةً جَاهِلِيَّة

যে ব্যক্তি তার ইমামকে না চিনে ইন্তিকাল করবে যে অজ্ঞ অবস্থায় মৃত বরণ করবে।

           যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব হচ্ছে ইমামে হক এর আনুগত্য করা, সেহেতু প্রত্যেক জামানায় ইমেমে হক বিদ্যমান থাকা আবশ্যকীয়। যাতে করে মানুষ স্বধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় তার ইমামকে নির্ধারণ করতে পারে এবং তাঁর আনুগত্য করে কিয়ামতের দিন ডান হাতে আমল নামা গ্রহণ করতে পারে।

          এই আয়াতে ইমাম শব্দ দ্বারা অবশ্যই প্রত্যেক জাতির কিতাবকে বুঝানো হয়নি; কেননা এই আয়াত দ্বারা সৃষ্টির প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত সব মানুষকে অন্তর্ভু করা হয়েছে। অথচ শরিয়ত সম্বলিত সর্বপ্রথম আসমানী কিতাব হজরত নুহ (আ.) এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁর পূর্বে এই ধরণের কোন কিতাব অবতীর্ণ হয়নি।

          সুয়ুতি উপরোক্ত আয়াতের নিচে রাসুলুল্লাহ (সা.) হতে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, যা নিম্নরূপ।

عن على رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ قال يدعو كل قوم بإمام زمانهم و كتاب ربهم و سنة نبيهم

 

 

হজরত আলি (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ তাফসিরে বলেছেনঃ প্রত্যেক জাতিকে তাদের জামানার ইমাম, তাদের প্রভুর কিতাব ও তাদের নবির সুন্নাতসহ হাশর নশর করা হবে।

عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ ع قَالَ قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ- يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ‏ قَالَ الْمُسْلِمُونَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَ لَسْتَ إِمَامَ النَّاسِ كُلِّهِمْ‏ أَجْمَعِينَ‏ قَالَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ص أَنَا رَسُولُ اللَّهِ إِلَى النَّاسِ أَجْمَعِينَ وَ لَكِنْ سَيَكُونُ مِنْ بَعْدِي أَئِمَّةٌ عَلَى النَّاسِ مِنَ اللَّهِ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يَقُومُونَ فِي النَّاسِ فَيُكَذَّبُونَ وَ يَظْلِمُهُمْ أَئِمَّةُ الْكُفْرِ وَ الضَّلَالِ وَ أَشْيَاعُهُمْ فَمَنْ وَالاهُمْ وَ اتَّبَعَهُمْ وَ صَدَّقَهُمْ فَهُوَ مِنِّي وَ مَعِي وَ سَيَلْقَانِي أَلَا وَ مَنْ ظَلَمَهُمْ وَ كَذَّبَهُمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَ لَا مَعِي وَ أَنَا مِنْهُ بَرِي‏ءٌ.

হজরত ইমাম বাকের (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেনঃ যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়; يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ‏ তখন মুসলমানরা বলে, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি কি সকল মানুষের জন্য ইমাম নন? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেনঃ আমি আল্লাহর পক্ষ হতে সকল মানুষের জন্য আল্লার রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি; কিন্তু অতি তাড়াতাড়ি আল্লাহ তায়ালার তরফ হতে আমার আহলে বাইতের মধ্য হতে সকল মানুষের জন্য ইমাম নির্ধতি হবে। তাঁরা মানুষের নিকট আগমন করবেন; কিন্তু তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে এবং তাঁদের প্রতি গোমরাহ লোকরা ও কাফেররা জুলুম করবে। সুতরাং যারা এই নিষ্পাপ ইমামগণকে তাদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে, তাঁদের অনুস্বরণ করবে ও তাঁদেরকে সত্যায়ন করবে; তারা আমার প্রকৃত অনুসারী। তারা আমার সাথে থাকবে এবং অতি তাড়াতাড়ি আমার সাতে মুলাকাত করবে। আর যারা তাঁদেরকে

 

 

হজরত আলি (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ তাফসিরে বলেছেনঃ প্রত্যেক জাতিকে তাদের জামানার ইমাম, তাদের প্রভুর কিতাব ও তাদের নবির সুন্নাতসহ হাশর নশর করা হবে।

عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ ع قَالَ قَالَ: لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ- يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ‏ قَالَ الْمُسْلِمُونَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَ لَسْتَ إِمَامَ النَّاسِ كُلِّهِمْ‏ أَجْمَعِينَ‏ قَالَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ص أَنَا رَسُولُ اللَّهِ إِلَى النَّاسِ أَجْمَعِينَ وَ لَكِنْ سَيَكُونُ مِنْ بَعْدِي أَئِمَّةٌ عَلَى النَّاسِ مِنَ اللَّهِ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يَقُومُونَ فِي النَّاسِ فَيُكَذَّبُونَ وَ يَظْلِمُهُمْ أَئِمَّةُ الْكُفْرِ وَ الضَّلَالِ وَ أَشْيَاعُهُمْ فَمَنْ وَالاهُمْ وَ اتَّبَعَهُمْ وَ صَدَّقَهُمْ فَهُوَ مِنِّي وَ مَعِي وَ سَيَلْقَانِي أَلَا وَ مَنْ ظَلَمَهُمْ وَ كَذَّبَهُمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَ لَا مَعِي وَ أَنَا مِنْهُ بَرِي‏ءٌ.

হজরত ইমাম বাকের (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেনঃ যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়; يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُناسٍ بِإِمامِهِمْ‏ তখন মুসলমানরা বলে, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি কি সকল মানুষের জন্য ইমাম নন? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেনঃ আমি আল্লাহর পক্ষ হতে সকল মানুষের জন্য আল্লার রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি; কিন্তু অতি তাড়াতাড়ি আল্লাহ তায়ালার তরফ হতে আমার আহলে বাইতের মধ্য হতে সকল মানুষের জন্য ইমাম নির্ধতি হবে। তাঁরা মানুষের নিকট আগমন করবেন; কিন্তু তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে এবং তাঁদের প্রতি গোমরাহ লোকরা ও কাফেররা জুলুম করবে। সুতরাং যারা এই নিষ্পাপ ইমামগণকে তাদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে, তাঁদের অনুস্বরণ করবে ও তাঁদেরকে সত্যায়ন করবে; তারা আমার প্রকৃত অনুসারী। তারা আমার সাথে থাকবে এবং অতি তাড়াতাড়ি আমার সাতে মুলাকাত করবে। আর যারা তাঁদেরকে

 

উপরোক্ত আয়াত হতে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, প্রত্যেক জামানায় প্রত্যেক জাতির জন্য হেদায়াতকারী বিদ্যমান থাকবে। আল্লাহ তায়ালার রুবুবিয়াতের দাবিও এটাই। আর এটাও প্রমাণিত হয় যে জমিন কখনোই হেদায়াতকারী হতে খালি থাকবে না। এই হেদায়াতকারী নবিও হতে পারে অথবা ইমামও হতে পারে। কেননা হেদায়াতকারী নবিই হতে হবে এমনটা আয়াত হতে বুঝা যায় না। এই বিষয়টির প্রতি বিশিষ্ট মোফাসসের জামাখশারীও ইঙ্গিত করেছেন। আর তা যদি না হয় তাহলে প্রমাণিত হবে যে, যে সময়গুলোতে নবি উপস্থিত ছিলন না সে সময়গুলোতে পৃথিবী আল্লাহর হুজ্জাত হতে খালি ছিল।

عن ابن عباس، قال: لما نزلت إِنَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ وَ لِكُلِّ قَوْمٍ هادٍ وضع صلى الله عليه و سلم يده على صدره، فقال:" أنا المنذر و لكل قوم هاد"، و أومأ بيده إلى منكب علي، فقال:" أنت الهادي يا علي، بك يهتدي المهتدون بعدي

হজরত ইবনে আব্বস হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেনঃ إِنَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ وَ لِكُلِّ قَوْمٍ هادٍ

যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলি আ.) এর বুকের ওপর হাত রাখেন এবং বলেনঃ আমি ভীতি প্রদর্শনকারী কিন্তু প্রত্যেক জাতির জন্য হেদায়াতকরী রয়েছে। অতপর তিনি হজরত (আ.) এর কাধের ওপর হাত রাখেন এবং বলেনঃ হে আলি তুমি হেদায়াতকারী। আমার পর তোর মাধ্যমে হেদায়াতের উপযোগী ব্যক্তিরা হেদায়াত পাবে।

          হাকেম নিশাবুরী সহিহ সনদে আমিরুল মোমিনিন ইমাম আলি (আ.) হতে উপরোক্ত আয়াতের ক্ষেত্রে বর্ণনা করেছেনঃ  رَسُولُ اللَّهِ ص الْمُنْذِرُ وَ انا الْهَادِي‏ রাসুলুল্লাহ (সা.) ভীতি প্রদর্শনকারী এবং আমি হেদায়াতকারী।

 

 

 

عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ ع‏ فِي قَوْلِ اللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ- إِنَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ وَ لِكُلِّ قَوْمٍ‏ هادٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ص الْمُنْذِرُ وَ لِكُلِّ زَمَانٍ مِنَّا هَادٍ يَهْدِيهِمْ‏ إِلَى مَا جَاءَ بِهِ- نَبِيُّ اللَّهِ ص ثُمَّ الْهُدَاةُ مِنْ بَعْدِهِ عَلِيٌّ ثُمَّ الْأَوْصِيَاءُ وَاحِدٌ بَعْدَ وَاحِدٍ.

ইমাম বাকের (আ.) হতে আল্লাহ তায়ালার ্রانَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ وَ لِكُلِّ قَوْمٍ هادগ্ধএই আয়াত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) ভীতি প্রদর্শনকারী আর প্রত্যেক যুগে আমাদের মধ্য হতে হেদায়াতকারী থাকবে, যারা নবি করিম (সা.) যে শরিয়ত নিয়ে এসেছেন সে শরিয়তের প্রতি মানুষকে হেদায়াত করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পর হেদায়াতকারী হচ্ছেন আলি (আ.), অতপর ইমামগণ একের পর এক আগমন করবেন।

عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ ع‏ فِي قَوْلِ اللَّهِ تَبَارَكَ وَ تَعَالَى- إِنَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ وَ لِكُلِّ قَوْمٍ هادٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ص الْمُنْذِرُ وَ عَلِيٌ‏ الْهَادِي‏ أَمَا وَ اللَّهِ مَا ذَهَبَتْ مِنَّا وَ مَا زَالَتْ فِينَا إِلَى السَّاعَةِ.

ইমাম বাকের (আ.) হতে আল্লাহ তায়ালার ্রانَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ وَ لِكُلِّ قَوْمٍ هادগ্ধএই আয়াত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) ভীতি প্রদর্শনকারী আর আলি (আ.) হচ্ছেন হোদায়াতকারী। কিন্তু জেনে রেখ, আল্লাহর কসম! কিয়ামত পর্যন্ত এই আয়াত আমাদের বাইরে যাবে না।

 

সাক্ষী সম্পর্কিত আয়াত

 

 

 

           কোরআন শরিফের বিভিন্ন আয়াতে এই বিষয়টির প্রতি ইশারা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক উম্মতের মাঝে কাউকে সাক্ষী হিসেবে রেখেছেন এবং কিয়ামতের দিন শুধুমাত্র তাঁদের নিকট হতে সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন। নিম্নে এ সম্পর্কিত কিছু সংখ্যক আয়াত উল্লেখ করা হলোঃ

فَكَيْفَ إِذا جِئْنا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهيدٍ وَ جِئْنا بِكَ عَلى‏ هؤُلاءِ شَهيداً

সে সময় কী দশা হবে যখন আমরা প্রত্যেক জাতি থেকে সাক্ষী উপস্থিত করব এবং (হে রাসূল!) তোমাকে তাদের সকলের ওপর সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত করব।

وَ يَوْمَ نَبْعَثُ مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ شَهيداً ثُمَّ لا يُؤْذَنُ لِلَّذينَ كَفَرُوا وَ لا هُمْ يُسْتَعْتَبُونَ

যেদিন আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায় হতে একজন সাক্ষী উপস্থাপিত করব, অতঃপর অবিশ্বাসীদের না অনুজ্ঞা প্রদান করা হবে, আর না তাদের আপত্তি গ্রহণ করা হবে।

وَ يَوْمَ نَبْعَثُ في‏ كُلِّ أُمَّةٍ شَهيداً عَلَيْهِمْ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَ جِئْنا بِكَ شَهيداً عَلى‏ هؤُلاءِ وَ نَزَّلْنا عَلَيْكَ الْكِتابَ تِبْياناً لِكُلِّ شَيْ‏ءٍ وَ هُدىً وَ رَحْمَةً وَ بُشْرى‏ لِلْمُسْلِمينَ

এবং (স্মরণ কর) সেদিন আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাদেরই মধ্য হতে একজন সাক্ষী উত্থিত করব এবং (হে রাসূল!) তোমাকে তাদের সকলের ওপর সাক্ষীস্বরূপ উপস্থাপিত করব; এবং আমরা তোমার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি যাতে রয়েছে সর্ব বিষয়ের বিশদ বিবরণ এবং আত্মসমর্পণকারীদের জন্য রয়েছে পথনির্দেশ, অনুগ্রহ ও সুসংবাদ।

এই আয়াতগুলো হতে খুব ভালভাবে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জামানায় প্রত্যেক উম্মতের মাঝে নিষ্পাপ ব্যক্তিসমূহকে কিয়ামত পর্যন্ত সাক্ষী হিসেবে রেখেছেন। তাঁরা কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির কর্ম সম্পর্কে সাক্ষী দান করবেন। উল্লেখ্য যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নিকট উম্মতের পক্ষ হতে সাক্ষ্য প্রদান করবেন

 

 

সে ব্যক্তি অবশ্যই নিষ্পাপ হতে হবে; যাতে করে সাক্ষ্য দানের ক্ষেত্রে ভুলের শিকার না হয়। আর তাছাড়াও তাঁর জ্ঞানের পরিধি এত বেশী হতে হবে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির আমল সম্পর্কে যেন অবগত থাকে। সুতরাং তাঁরা এমন ব্যক্তিবর্গ যারা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে জমিনে মানুষের হেদায়াতের ক্ষেত্রে তাঁর হুজ্জাত।

وَ نَزَعْنا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ شَهيدا

আর (কিয়ামতের দিন) প্রত্যেক উম্মত হতে সাক্ষ্য দানকারীকে উঠানো হবে।

ফখরে রাজী উপরোক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেনঃ "তারা এমন সাক্ষ্য দানকারী যে, প্রত্যেক যুগের উম্মতের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য দান করবেন; যেমন নবিগণ।"

وَ يَوْمَ نَبْعَثُ مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ شَهيدا عَلَيْهِمْ مِنْ أَنْفُسِهِمْ

এবং (স্মরণ কর) সেদিন আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাদেরই মধ্য হতে একজন সাক্ষী উত্থিত করব।

এই আয়াতের তাফসিরে তিনি বলেনঃ "যত মানুষ পৃথিবীতে সৃষ্টি হোক না কেন, তাদের মাঝে অবশ্যই কাউকে সাক্ষ্য দানকারী হিসেবে বিদ্যমান থাকতে হবে" রাসুলুল্লাহ (সা.) এর যুগে তিনি নিজেই সাক্ষ্য দানকারী ছিলেন; যার প্রমান হচ্ছে এই আয়াত।

وَ كَذلِكَ جَعَلْناكُمْ أُمَّةً وَسَطاً لِتَكُونُوا شُهَداءَ عَلَى النَّاسِ وَ يَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهيدا

এবং এভাবে আমরা তোমাদের মধ্যপন্থী উম্মত করেছি যাতে তোমরা মানবজাতির (কৃতকর্মের) ওপর সাক্ষী থাক এবং রাসূল তোমাদের (কৃতকর্মের) ওপর সাক্ষী হন।

 

 

 

          সুতরাং রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পর উম্মতের মাঝে প্রত্যেক যুগে অবশ্যই সাক্ষ্য দানকারী বিদ্যমান থাকতে হবে। উপরোক্ত আয়াতসমূহ হতে খুব ভালভাবে স্পষ্ট হয় যে কোন যুগই সাক্ষ্য দানকারী হতে খালি থাকবে না। আর ঐ সাক্ষ্য দারকারীকে অবশ্যই নিষ্পাপ হতে হবে। কেননা তাঁরা যদি পাপ শূন্য না হয় তাহলে ঐ সাক্ষ্য দান কারীর জন্যই আবার সাক্ষীর প্রয়োজন হবে না; যার কোন সীমা থাকবে। আর এটা বাতিল।

 

সাক্ষ্য দানকারীদের বৈশিষ্ট্য

          পবিত্র কোরআনের আয়াত হতে বুঝা যায় যে, উম্মতের সাক্ষ্য দাতাগণ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী; যা নিম্ন রূপঃ

১.  সাক্ষ্য দানকারী মানুষ হতে হবেঃ شَهيدا عَلَيْهِمْ مِنْ أَنْفُسِهِمْ

২.  প্রত্যেক যুগে একজন সাক্ষ্য দানকারী থাকবে, কেননা কোরআনে এক বচনের ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়েছেঃ شَهيدا

৩.  যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে।

৪.  কিতাবের জ্ঞান থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

وَ يَقُولُ الَّذينَ كَفَرُوا لَسْتَ مُرْسَلاً قُلْ كَفى‏ بِاللَّهِ شَهيداً بَيْني‏ وَ بَيْنَكُمْ وَ مَنْ عِنْدَهُ عِلْمُ الْكِتاب

যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে, তুমি আল্লাহর রাসূল নও। তুমি বল, আমার ও তোমাদের মধ্যে (রেসালাতের) সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সেই ব্যক্তি যার কাছে পূর্ণ গ্রন্থের জ্ঞান রয়েছে।

 

 

 

 

          হজরত আবু সাইদ খুদরী বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করেছি যে, وَ مَنْ عِنْدَهُ عِلْمُ الْكِتاب এই আয়াত দ্বারা কাকে বুঝানো হয়েছে? তিনি বলেছেনঃ এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমার ভাই আলি ইবনে আবি তালেব।

 

নাজির সম্পর্কিত আয়াত

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলছেনঃ

إِنَّا أَرْسَلْناكَ بِالْحَقِّ بَشيراً وَ نَذيراً وَ إِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلاَّ خَلا فيها نَذيرٌ

নিশ্চয় আমরা সত্যসত্যই তোমাকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। এবং এমন কোন সম্প্রদায় নেই যার মধ্যে সতর্ককারী আগমন করেনি।

          উপরোক্ত আয়াত হতে বুঝা যায় যে, প্রত্যেক যুগে মানুষের মাঝে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ হতে হেদায়াতকারী ছিল এবং থাকতে হবে।

          ইমাম বাকের (আ.) বলেনঃ

يَا مَعْشَرَ الشِّيعَةِ يَقُولُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَ تَعَالَى- وَ إِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلا فِيها نَذِيرٌ قِيلَ يَا أَبَا جَعْفَرٍ نَذِيرُهَا مُحَمَّدٌ ص قَالَ صَدَقْتَ فَهَلْ كَانَ نَذِيرٌ وَ هُوَ حَيٌ‏ مِنَ‏ الْبِعْثَةِ فِي أَقْطَارِ الْأَرْض‏

হে আমাদের অনুসারীরা আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَ إِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلا فِيها نَذِيرٌ (এবং এমন কোন সম্প্রদায় নেই যার মধ্যে সতর্ককারী আগমন করেনি।) প্রশ্ন করা হয়, হে আবু জাফার! এই উম্মতকে সতর্ককারী কি মুহাম্মাদ (সা.) নয়? হজরত বললেনঃ তুমি

 

 

 

সত্য বলেছ; তিনি কি তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর জীবিত থাকা অবস্থায় সারা পৃথিবীর জন্য সতর্ককারী ছিলেন না?

          তাফসিরে আলি ইবনে ইবরাহিম কুম্মিতে উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আমরা পড়ে থাকিঃ لکل زمان امام... প্রত্যেক যুগের জন্য ইমাম রয়েছে।

 

হেদায়াত সম্পর্কিত আয়াত

          আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

وَ مِمَّنْ خَلَقْنا أُمَّةٌ يَهْدُونَ بِالْحَقِّ وَ بِهِ يَعْدِلُونَ

এবং আমরা যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে এমন একদল আছে যারা সত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করে এবং সত্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার করে।

          ফাখরে রাজী তার তাফসিরে উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় জুব্বায়ী হতে বর্ণনা করেছেন যেঃ "এই আয়াত প্রমাণ করে যে, প্রত্যেক যুগে কিয়ামকারী ও সত্য পথে আমলকারী থাকবে এবং জনগণকে সে পথে হেদায়াত করবে।"

          মির্জা মুহাম্মাদ মাসহাদী তার তাফসিরে বলেছেনঃ এই আয়াত প্রমাণ করে যে, প্রত্যেক শতাব্দীতে একজন নিষ্পাপ ব্যক্তি বিদ্যমান থাকবে; কেননা এই আয়াতের বিষয়বস্তু হচ্ছে এই যে, হেদায়াতকারীগণ ও ন্যায়পরায়ণগণ সৃষ্টিকুলের একটি অংশ, সকলেই নয়। যে কোন ব্যক্তিই যদি নিষ্পাপ না হয় তাহলে পরিপূর্ণ ন্যায়পরায়ণ ও হেদায়াতকারী হতে পারবে না।

          আব্দুল্লাহ ইবনে সানান বলেন, ইমাম সাদিক (আ.) কে

 

 

 

وَ مِمَّنْ خَلَقْنا أُمَّةٌ يَهْدُونَ بِالْحَقِّ وَ بِهِ يَعْدِلُونَ (এবং আমরা যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে এমন একদল আছে যারা সত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করে এবং সত্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার করে।) এই আয়াতের মেসদাক সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেনঃ ্রهم الأئمهগ্ধ এই আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইমামগণ।

 

সাদেকিন সম্পর্কিত আয়াত

পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছেঃ

يا أَيُّهَا الَّذينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَ كُونُوا مَعَ الصَّادِقين

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হয়ে যাও।

          এই আয়াতে সাদেকিন শব্দ দ্বারা কিছুসংখ্যক মোমিনকে বুঝানো হয়েছে, সমস্ত মোমিনকে নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মোমিনগণ কি ধরণের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন?

          আয়াত হতে বুঝা যায় যে, সাদেকিনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্যবাদী মোমিনগণ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তাদের আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; যাতে করে মানুষ তাঁদের আনুগত্য করার মাধ্যমে বাস্তবতায় পৌছতে পারে ও সফলকাম হতে পারে। অতএব উপরোক্ত আয়াতে সাদিকিন হচ্ছেন, ওহির বাহকগণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ওয়াসিগণ, দ্বিনের বাহকগণ ও ইমামগণ। যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র করেছন এবং যে কোন প্রকার ক্রটি ও অপরিপূর্ণতা হতে দূরে রেখেছেন। আর এই পবিত্র ব্যক্তিগণ মহানবি (সা.) এর পবিত্র আহলে বাইত ব্যতিত অন্য কেউ হতে পারেন না; যাদের প্রথম ব্যক্তি হচ্ছেন আমিরুল মোমিনিন আলি (আ.) এবং সর্বশেষ ব্যক্তি হচ্ছেন ইমাম মেহদি (আ.)।

 

 

 

          জনাব ফাখরে রাজী উপরোক্ত আয়াত হতে নিষ্পাপ ব্যক্তি বিদ্যমান থাকার বিষয়টিকে প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেনঃ "এই আয়াত হতে প্রমাণিত হয় যে প্রত্যেক যুগে নিষ্পাপ সত্যবাদী ব্যক্তি উপস্থিত থাকতে হবে...।"

          জনাব কুলাইনী তার সনদে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া আজালি হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম বাকের (আ.) কে ্রيا أَيُّهَا الَّذينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَ كُونُوا مَعَ الصَّادِقينগ্ধ এই আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছি। হজরত উত্তরে বলেনঃ ্রإیاّنا عنیগ্ধ আমাদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

          ইমাম রেজা (আ.) হতে উপরোক্ত আয়াতের ক্ষেত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি বলেনঃ ্রالصادقون هم الأئمهগ্ধ সাদেকিন হচ্ছেন ইমামগণ...।

          এছাড়াও হাকেম হাসকানী হানাফী তার সনদে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার হতে উপরোক্ত আয়াতের তাফসিরে ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন যে, সাদেকিনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইত (আ.)।

          সাবতে ইবনে জাওজী উপরোক্ত আয়াতের ক্ষেত্রে আলেমগণের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন যে, এই আয়াত দ্বারা আলি (আ.) ও আহলে বাইকে বুঝানো হয়েছে।

 

উলিল আমর সম্পর্কিত আয়াত

          আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

يا أَيُّهَا الَّذينَ آمَنُوا أَطيعُوا اللَّهَ وَ أَطيعُوا الرَّسُولَ وَ أُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنازَعْتُمْ في‏ شَيْ‏ءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَ الرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَ الْيَوْمِ الْآخِرِ ذلِكَ خَيْرٌ وَ أَحْسَنُ تَأْويلاً

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আলস্নাহর আনুগত্য কর এবং রাসূল ও তোমাদের মধ্যে যারা নির্দেশের অধিকর্তা তাদের আনুগত্য কর অতঃপর যদি কোন বিষয়ে মতভেদ কর তবে তা আলস্নাহ ও রাসূলের প্রতি সমর্পণ কর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাসী হও, এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং পরিণামেও সর্বোত্তম।

          এই আয়াত হতে খুব ভালভাবে প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক যুগে নিষ্পাপ ইমাম বিদ্যমান থাকতে হবে; যাতে করে মানুষ তাঁর অনুস্বরণ করতে পারে। আর এই অনুস্বরণ আল্লাহর আনুগত্যের ন্যায় হতে হবে।

          এই আয়াতে উলিল আমর দ্বারা এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যারা আদেশ ও নির্দেশ করার অধিকার রাখেন। মানুষের সবকিছু তাঁর এখতিয়ারে থাকবে। সুতরাং এমন ব্যক্তি অবশ্যই মাসুম হতে হবে। কেননা আয়াত প্রমাণ করে যে, তাঁদের আনুগত্য কোন রূপ শর্ত ছাড়াই ওয়াজিব; বিধায় অবশ্যই এই ব্যক্তিগণ নিষ্পাপ হতে হবে। এর কারণ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কোন রূপ শর্ত ছাড়াই ওয়াজিব। আর যদি উলিল আমর নিষ্পাপ না হয় তাহলে কোন কোন ক্ষেত্রে অবশই ভুল করবে। সুতরাং ভুলে পতিত হওয়া ব্যক্তিকে সর্বজনীনভাবে কোন সীমাবদ্ধতা ছাড়াই আনুগত্য করা যেতে পারে না। আর এই বিষয়টি আয়াতের প্রথম অংশের বিরীতও বটেই। অতএব উপরোক্ত আয়াতে উলিল আমর দ্বারা নিষ্পাপ ইমামকে বুঝানো হয়েছে; যিনি প্রত্যেক যুগে উপস্থিত থাকবেন যাতে করে মানুষ তাঁর অনুস্বরণ করতে পারে। আর এই যুগের উলিল আমর, ইমাম মেহদি (আ.) ব্যাতিত আর কেউ হতে পারে না।

          উপরোক্ত আয়াত যে আহলে বইতের ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে এই বিষয়টিকে প্রচুর পরিমাণ মুতাওয়াতির হাদিস সমর্থন করে। যেমন হাদিসে সাকালাই এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেনঃ

إني‏ تارك‏ فيكم‏ الثقلين‏ ما ان تمسكم بهما لن تضلوا ابدا كتاب الله و عترتي أهل بيتي لن يفترقا حتى يردا علي الحوض.

আমি তোদের মাঝে দুইটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে যাচ্ছি; এই দুইটিকে যদি দৃঢ়ভাবে ধারণ কর, তাহলে কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হচ্ছে আল্লার কিতাব (আল কোরআন) আর অপরটি হচ্ছে আমার পরিবার। এই দুইটি হাউজে কাউসারে না পৌছা একটি অপরটি হতে আলদা হবে না।

          উপরোক্ত হাদিসে মহানবি (সা.) আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর আহলে বাইতের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর আহলে বাইতই হচ্ছেন, উলুল আমর। এছাড়াও নিম্নের আয়াত ও হাদিসও এই বিষয়টিকেই সমর্থন করে।

إِنَّما أَنْتَ مُنْذِرٌ وَ لِكُلِّ قَوْمٍ هادٍ

(হে রাসূল!) তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে এক পথ প্রদর্শক।

لا يزال اهل الاسلام بخير ما وليهم اثنا عشر خليفة كلهم من قريش‏

ইসলামের অনুসারীরা তত দিন পর্যন্ত কল্যাণে থাকবে, যত দিন কোরাইশ বংশের বার জন খলিফাকে অভিভাক হিসেবে গ্রহণ করবে।

          আর এই কারণেই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কিছু সংখ্যক আলেমগণ বলেছেন যে, উপরোক্ত আয়াত আহলে বইতের শানে অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন:

১.  ইবনে হাইয়ান আন্দোলোসী।

২.  নিশাবুরী।

৩.  মুহাম্মাদ সালেহ কাশফী তিমিজী।

৪.  কানদুজি হানাফী।

৫.  হামুইয়ানি শাফেয়ী।

৬.  হাকেম নিশাবুরী।

হাকেম হাসকানী তার সনদে মুজাহিদ হতে উপরোক্ত আয়াতের তাফসিরের ক্ষেত্রে বর্ণনা করেছেন যে, এই আয়াত আমিরুল মোমিনিন আলি (আ.) শানে অবতীর্ণ হয়েছে; যখন নবি করিম (সা.) মদিনায় তাঁকে নিজের স্থলাভিসিক্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

 

হাদিসে সাকালাইন

ইমাম মেহদি (আ.) যে আমাদের মাঝে বিদ্যমান রয়েছেন তা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব। এই মাধ্যমগুলোর মধ্য হতে একটি মাধ্যম হাদিস। নিম্নে এই সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলোঃ

নবি করিম (সা.) বলেনঃ

إني‏ تارك‏ فيكم‏ الثقلين‏ كتاب الله حبل ممدود ما بین السمآء و الارض أو ما بین السمآء إلی الأرض و عترتي أهل بيتي و إنهما لن يفترقا حتى يردا عليّ الحوض.

আমি তোদের মাঝে দুইটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে যাচ্ছি; একটি হচ্ছে আল্লার কিতাব যা আসমান ও জমিনে বিস্তৃত অথবা আসমান হতে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত। আর অপরটি হচ্ছে আমার এতরাত বা পরিবার। এই দুইটি হাউজে কাউসারে আমার নিকট না পৌছা পর্যন্ত একটি অপরটি হতে আলদা হবে না।

          এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিতাব ও এতরাত কিয়ামত পর্যন্ত একটি অপরটি হতে আলদা হবে না। এই হাদিস অনুযায়ী যদি কোন সময় এতরাত জমিনে বিদ্যমান না থাকে তাহলে বুঝা যাবে যে একটি অপরটি হতে আলাদা হয়েছে। আর এটা হাদিসের বীপরিত। সুতরাং আমাদের মাঝে এতরাত বা আহলে বাইত বিদ্যমান থকতে হবে। আহলে বাইতের সর্বশেষ ইমাম হচ্ছেন হজরত মেহদি (আ.); যিনি আমাদের মাঝে বিদ্যমান রয়েছেন।

          ইবনে হাজার মাক্কি বলেনঃ যে হাদিসসমূহে আহলে বাইতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, ঐ হাদিসসমূহে এই বিষয়টি স্থান পেয়েছে যে কিয়ামত পর্যন্ত জমিন আহলে বাইত হতে খালি হবে না; যেভাবে আল্লাহর কিতাব হতেও জমিন খালি থাকবে না। আর এই কারণেই আহলে বাইতকে জমিনের নিরাপত্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও হাদিসে এসেছে যে প্রত্যেক জাতির মাঝে আমার আহলে বাইতের একজন সদস্য বিদ্যমান থাকবে।

          হাফেজ সামহুদী বলেনঃ হাদিসে সাকালাইন হতে বুঝা যায়া যে, প্রত্যেক যুগে আহলে বাইতের মধ্য হতে আনুগত্যের উপযোগী একজন ব্যক্তি বিদ্যমান থাকা আবশ্যকীয়; যাতে করে হাদিসে যে তাঁদের অনুস্বরণ কারার প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা অর্থে পরিণত হয়, যেভাবে কিতাবুল্লাহর ক্ষেত্রে বাস্তবে পরিণত হয়ে থাকে। আর এই কারণেই আহলে বাইতকে জামিনের নিরাপত্তা হিসেবে নির্ধারন করা হয়েছে। আর যখনই আহলে বাইত জমিন হতে বিদায় নিবেন তখন জমিন ধবংস হয়ে যাবে।

          এই একই বিষয়বস্তু আল্লামা মানাভীও 'জামেউস সাগির' নামক কিতাবের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন। অতএব হাদিসে সাকালাই এমন এক হাদিস, যা সকল মাজহাবের নিকট গ্রহণীয় ও তাদের হাদিস গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। এছাড়াও এই হাদিস মুতাওয়াতির হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। এই হাদিস হতে খুব ভালভাবে প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক যুগে মহানবি (সা.) এর আহলে বাইত হতে নিষ্পাপ ইমাম বিদ্যমান থাকতে হবে, যাকে মানুষ অনুস্বরণের মাধ্যমে হেদায়াত প্রাপ্ত হবে। ইমাম এমন ব্যক্তিকে হতে হবে যে, তিনি কখনো কোন প্রকার গোনাহে লিপ্ত হননি। শুধুমাত্র এমন ইমামই মানুষকে গোমরাহি হতে মুক্তি দিতে পরেন। এই যুগে এমন বৈশিষ্টের অধিকারী একমাত্র হজরত ইমাম মেহদি ব্যতিত আর কেউ হতে পারে না।

 

ইমামের মারেফাত সম্পর্কিত হাদিস

          রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনঃ

مَنْ مَاتَ لَا يَعْرِفُ إِمَامَهُ مَاتَ‏ مِيتَةً جَاهِلِيَّة

যে ব্যক্তি তার ইমামকে না চিনে ইন্তিকাল করবে যে অজ্ঞ অবস্থায় মৃত বরণ করবে।

          আমরা এখানে একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারি যে, এই হাদিসে কোন ইমামের কথা বলা হয়েছে। এই ইমাম কোন ইমাম যার পরিচিতি অর্জন করা ব্যতিত মৃত্যু করণ করলে অজ্ঞতার মৃত্যু হবে? ইমামকে না চিনা ও অজ্ঞতার মৃত্যুর মাঝে কি সম্পর্ক রয়েছে? যদি আমার যুগের অত্যাচারী, ফাসেক ও ফাজেরকে না চিনে মৃত্যু বরণ করি, তাহলে কি আমি অজ্ঞ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছি? অবশ্যই এমনটি নয়, বরং এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যেক যুগে নিষ্পাপ ইমাম পরিচিতি অর্জন করা। আমরা যদি সেই নিষ্পাপ ইমামকে না চিনে ও তাঁর এতাআত বা আনগত্য না করে মৃত্যু বরণ করি তাহলে অবশ্যই অজ্ঞ অস্থায় মৃত্যু বরণ করব। বর্তমান যুগে এই ইমাম হচ্ছেন, হজরত মেহদি (আ.)।

 

নিরাপত্তা সম্পর্কিত হাদিস

قال رسول اللّه‏ صلى‏الله‏عليه‏و‏آله : النُّجومُ أمانٌ لِأَهلِ الأَرضِ مِنَ الغَرَقِ ، وأهلُ بَيتي أمانٌ لاُِمَّتي مِنَ الاِختِلافِ ، فَإِذا خالَفَتها قَبيلَةٌ مِنَ العَرَبِ ، اختَلَفوا فَصاروا حِزبَ إبليسَ .

রাসলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ তারকাসমূহ জমিনে বসবাসকারীদেরকে নিমর্জিত যাওয়া থেকে নিরাপত্তা দান করে থাকে, আর আমার আহলে বাইত আমার উম্মতকে এখতেলাফে পতিত হওয়া থেকে নিরাপত্তা দান করে থাকে। সুতরাং যখনই আরবের কোন গোত্র তাঁদের বিরোধিতা করবে ও উম্মত এখতেলাফে পতিত হবে, তখন তারা শয়তানের দলের অন্তর্ভুক্ত হবে।

          ইবনে হাজার নবি করিম (সা.) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমার আলে বাইত হচ্ছেন জমিনে বসবাসকারীদের জন্য নিরাপত্তার কারণ। সুতরাং যখনই তাঁরা জমিন থেকে বিদায় নিবেন, তখন জমিনে বসবাসকারীদেরকে আল্লাহ তায়ালা যা কিছু দেওয়ার ওয়াদা করেছেন তা দেওয়া হবে।

          এই হাদিস হতে খুব ভালভাবে প্রমাণিত হয় যে, অবশ্যই প্রত্যেক যুগে পবিত্র আহলে বাইত হতে এমন ব্যক্তি বিদ্যমান থাকতে হবে যিনি নিষ্পাপ হবেন এবং তাঁর আনুগত্য করা আবশ্যকীয় হবে। আর এই যুগে ইমাম মেহদি ব্যতিত এই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তি অন্য কেউ বিদ্যমান নেই। সুতরাং তিনি যদি বিদ্যান না থাকেন তাহলে জমিন ধবংশ হয়ে যাবে।

 

সাফিনা সম্পর্কিত হাদিস

          সকল মাজহাবের হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর আহলে বাইতকে হজরত নুহ (আ.) এর নৌকার সাথে তুলনা করেছেন।

          ইবনে হাজার মাক্কি রাসুলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেনঃ

 

 

 

 

قال رسول اللّه‏ صلى‏الله‏عليه‏و‏آله : إنَّما مَثَلُ أهلِ بَيتي كَسَفينَةِ نوحٍ ، مَن رَكِبَها نَجا، ومَن تَخَلَّفَ عَنها غَرِقَ

নিশ্চয় আমার আহলে বাইতের উদাহরণ হচ্ছে নুহ নবির নৌকার ন্যায়, যে কেউ তাতে আরোহণ করবে মুক্তি পাবে। আর যে তা বর্জন করবে সে ধবংস হবে।

          এই হাদিসটি বিভিন্ন পন্থায় বিভিন্নভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটির অর্থে গভীরভাবে চিন্তা করলে খুব ভালভাবে বুঝা যায় যে, কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে পবিত্র আহলে বাইত হতে নিষ্পাপ ইমাম বিদ্যমান থাকবেন। তাঁদের অনুস্বরণের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ধবংস হওয়া থেকে মুক্তি পাবে এবং বেহেশতে রেজওয়ানের পথ তাদের জন্য সুগম হবে।

 

কোন যুগ কোরাইশী ইমাম হতে খালি হবে না।

বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্যরা তাদের সনদে রাসুলে আকরাম (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেনঃ

لا یزال هذا الامر فی قریش ما بقی من الناس اثنان

যত দিন পর্যন্ত দুইজন ব্যক্তিও বিদ্যমান থাকবে, তত দিন খিলাফতের বিষয়টি কোরাইশের মাঝে স্থায়ী হয়ে থাকবে।

          এই হাদিসে এক বাহ্যিক বিষয় সম্পর্কে খবর দিচ্ছে যা অবশ্যই বাস্তবে পরিণত হবে। মুসমানদের দায়িত্ব হচ্ছে, প্রত্যেক যুগে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর খিলাফতকে কোরাইশ বংশের উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট অর্পন করা। এখানে هذا الامر দ্বারা ঐ বিষয়টিকেই বুঝানো হয়েছে, যা এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।

يا أَيُّهَا الَّذينَ آمَنُوا أَطيعُوا اللَّهَ وَ أَطيعُوا الرَّسُولَ وَ أُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنازَعْتُمْ في‏ شَيْ‏ءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَ الرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَ الْيَوْمِ الْآخِرِ ذلِكَ خَيْرٌ وَ أَحْسَنُ تَأْويلاً

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূল ও তোমাদের মধ্যে যারা নির্দেশের অধিকর্তা তাদের আনুগত্য কর অতঃপর যদি কোন বিষয়ে মতভেদ কর তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি সমর্পণ কর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাসী হও, এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং পরিণামেও সর্বোত্তম।

          এই আয়াতে ফাখরে রাজীর বর্ণনা অনুযায়ী উলিল আমর এর উদ্দেশ্য হচ্ছে নিষ্পাপ ব্যক্তিগণ

          সুতরাং যত দিন পর্যন্ত পৃথিবী বিদ্যামান থকবে তত দিন পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে কোরাইশ বংশ হতে নিষ্পাপ ইমাম বিদ্যমান থাকতে হবে। আর বর্তমান যুগে এই নিষ্পাপ ইমাম হজরত মেহদি (আ.) ব্যতিত আর কেউ হতে পারে না।

          কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে উলিল আমর এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব, অভিভাবকত্ব, রাহবারিত্ব ও মানুষকে সর্বজনীনভাবে সত্যের পথে পথপ্রদর্শন কারক। তিনি এমন ব্যক্তি হবেন যিনি সর্ব ক্ষেত্রে রাসুলে আকরাম (সা.) যে বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, সে বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবেন; শুধুমাত্র ওহি গ্রহণ ব্যতিত। অর্থাৎ রাসুলের প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে কিন্তু ইমামের প্রতি ওহি অবতীর্ণ হবে না। তাহলে তিনি সর্ব ক্ষেত্রে তাঁর খিলাফত ও স্থলাভিষিক্ত হতে পারবেন। আর এই ধরণের ব্যক্তি অবশ্যই প্রত্যেক যুগে বিদ্যমান থাকতে হবে। সুতরাং এই যুগে হজরত ইমাম মেহদি (আ.) ব্যতিত আর কেউ সেই ব্যক্তি হতে পারে না।

          ইবনে হাজার আসকালানী বলেনঃ "শেষ যুগে এই উম্মতের একজন ব্যক্তির পিছনে হজরত ইসা (আ.) এর নামাজ পড়া ও কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, জমিন কখনোই আল্লাহর হুজ্জাত হতে খালি হবে না।"

 

বার খলিফা সম্পর্কিত হাদিস

          শিয়া ও সুন্নি উভয় মাজহাবের নিকট মুতাওয়াতির হাদিসসমূহের মাঝে একটি হাদিস হচ্ছে, বার খলিফা সম্পর্কিত হাদিস। এটা এমন একটি হাদিস যাতে রাসুলে আকরাম (সা.) তাঁর পরবর্তী ইমাম ও স্থলাভিষিক্ত হিসেবে, বার জন ব্যক্তিকে নির্ধারণ করেছেন। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেনঃ

لا يزال‏ الإسلام‏ عزيزا إلى‏ اثني‏ عشر خليفة، ثم قال کلمۀ لم افهمها. فقلت لابی ما قال؟ فقال: کلهم من قریش

যত দিন পর্যন্ত বার জন খলিফা বিদ্যমান থাকবে তত দিন পর্যন্ত ইসলাম ধবংস হবে না। পতপর বর্ণনাকারী বলেনঃ এর পর একটি শব্দ বলেছেন কিন্তু আমি তা বুঝতে পারিনি। অতপর আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, কি বলেছেন? তিনি বললেনঃ সকলেই কোরাইশ বংশ হতে হবেন।

          এই হাদিসকে বিভিন্নভাবে ৩৬ জন সাহাবা বর্ণনা করেছেন; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাবের ইবনে সুমরা হতে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও অনেক আলেমগণ তাদের গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।

এখানে বার খলিফা দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?

          এই হাদিস বিদায় হজ্জে রাসুলে আকরাম (সা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে সাকালাইন ও হাদিসে গাদির যে ক্ষেত্রে দলিল হিসেবে ব্যাবহৃত হয়েছে এই হাদিসও সে ক্ষেত্রে ব্যাবহৃ হবে।

           কোরআনের আয়াত যেভাবে একে অপরকে তাফসির করে সেভাবে হাদিসও একে অপরকে ব্যাখ্যা করে থাকে। সুতরাং এই তিন প্রকার হাদিস হতে বুঝা যায় যে, এই বার জন ইমামও মহা নবি (সা.) এর আহলে বাইত হতে হবে। যাদের প্রথম হচ্ছেন আলি ইবনে আবি তালেব এবং সর্বশেষ হচ্ছেন ইমাম মেহদি (আ.)। কেননা রাসুলে আকরাম (সা.) হাদিসে সাকালাইনে বলছেনঃ "আমি তোমাদের মাঝে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে যাচ্ছি, এই দুইটিকে দৃঢ়ভাবে ধারন করলে কখনোই তোমরা গোমরাহ হবে না। একটি হচ্ছে আল্লার কিতাব যা আসমান ও জমিনে বিস্তৃত। আর অপরটি হচ্ছে আমার এতরাত বা পরিবার। এই দুইটি হাউজে কাউসারে আমার নিকট না পৌছা পর্যন্ত একটি অপরটি হতে আলদা হবে না।"

          এছাড়াও বার খলিফা সম্পর্কিত হাদিসে যে বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, তা নিষ্পাপ ইমাম ব্যতিত অন্য কাউরো ক্ষেত্রে প্রযোয্য হতে পারে না। যেমনঃ

১.  ইসলাম তাঁদের উপস্থিতিতে স্থায়িত্ব হবে।

২.  দ্বিন তাঁদের উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

৩.  তাঁদেরকে অবমাননা করার চেষ্টা করলেও তাঁদের কোন ক্ষতি হবে না, বরং তারা তাদের নিজেদেরই ক্ষতি করবে।

হামুইয়ানী ও কানদুজী হানাফী কর্তৃক বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, নবি করিম (সা.) তাঁর পবিত্র বংশ হতে বার জন খলিফার প্রত্যেকের নাম বর্ণনা করেছেন।

পরিশেষে আমরা কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা হতে এই ফলাফলে উপনিত হতে পারি যে, আমাদের এই যুগও অন্যান্য যুগের ন্যায় আল্লাহর হুজ্জাত বা ইমাম হতে খালি হতে পারে না। আমাদের এই যুগের ইমাম হচ্ছেন হজরত মেহদি (আ.)। তিনি আমাদের মাঝেই বিদ্যমান রয়েছেন; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শত্রুদের হাত থেকে নিরাপত্তার জন্য ও বিশেষ হেকমতের কারণে অদৃশ্যে রেখেছেন। তিনি থাকার কারণেই পৃথিবী টিকে আছে; কেননা পৃথিবী আল্লাহর হুজ্জাত ব্যতিত টিকে থাকতে পারে না। 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

তথ্য সূত্র

 

১.  কোরআন শরিফ।

২.  আল কাফি; মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক কুলাইনী, প্রকাশকঃ দারুল কুতুবিল ইসলামিয়াহ, তেহরান, ১৪০৭ হিঃ।

৩.  মানলা ইয়াহজুরুহুল ফাকিহ; মোহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে বাবেভেই, প্রকাশকঃ দাতারে এন্তেশারাতে ইসলামি, কোম।

৪.  তাফসিরে মাফতেহুল গাইব; ফাখরুদ্দিন রাজী, আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আমর, প্রকাশকঃ দারু এহইয়ায়িত তুরাসুল আরাবী, বৈরুত, ১৪২০ হিঃ।

৫.  আল মিজান ফি তাফসিরিল কোরআন; সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হুসাইন তাবাতাবায়ী, প্রকাশকঃ দাফতারে এন্তেশারাতে ইসলামীয়ে জামেয়ে মোদাররেসিনে হাউজায়ে ইলমিয়ায়ে কোম, ১৪১৭ হিঃ।

৬.  আদ দুররুল মানসুর ফি তাসসিরিল মাসুর; জালাল উদ্দিন সুয়ুতি, প্রকাশকঃ আয়াতুল্লাহ মারআশি নাজাফি লাইব্রেরী, কোম, ইরান।

৭.  জামেউল বায়ান ফি তাফসিলির কোরআন; আবু জাফার মোহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারী, প্রকাশকঃ দারুল মারেফাহ, বৈরুত।

৮.  তাফসিরে কুম্মী; আলি ইবনে ইবরাহিম কুম্মী, প্রকাশকঃ দারুল কুতুবিল ইসলামী, কোম।

৯.  তাফসিরে কানজুদ দাকায়েক; মোহাম্মাদ ইবনে মোহাম্মাদ রেজা মাশহাদী, প্রকাশকঃ সাজামানে চাপ ওয়া নাশরে বেজারাতে এরশাদে ইসলামী, তেহরান।

১০. তাফসিরে শাওয়াহেতুত তানজিল; আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ হাসকানী, প্রকাশকঃ সাজামানে চাপ ওয়া নাশরে বেজারাতে এরশাদে ইসলামী, তেহরান।

১১. তাফসিরে বাহরুল মোহিত; আবু হাইয়ান মোহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আন্দোলুসী, প্রাকাশকঃ দারুল ফেকর, বৈরুত।

১২.  সহিহ বুখারী, প্রকাশক: মাতালিউশ শুয়াব।

১৩. সহিহ মুসলিম, প্রকাশক: দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত।

১৪. তারিখে বাগদাদ।

১৫. ফারায়েদুস সামতাইন।

১৬. ফাতরুল বারী।

১৭.  আল মোস্তাদরাক।

১৮. তাজকোরাতুল খাওয়াস।

১৯. মোসনাদে আহমাদ।

২০. আস সাওয়াকেল মোহরেকাহ।

২১.  ফাইজুল কাদির।